ওয়াশিংটন সময় মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টা ৩২ মিনিটে ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট দেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি ‘চূড়ান্ত’ শান্তি চুক্তির পথে ‘অনেক দূর’ এগিয়েছে। আলোচনার সুযোগ দিতে তিনি দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মতি দিয়েছেন।
ট্রাম্পের দেওয়া সময়সীমা শেষ হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে এই ঘোষণা এল। ট্রাম্প হুমকি দিয়েছিলেন, রাত ৮টার মধ্যে চুক্তিতে না পৌঁছালে ইরানের জ্বালানি ও যোগাযোগ অবকাঠামোতে বড় ধরনের হামলা চালাবে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে বিষয়টি শেষ পর্যন্ত বেশ স্নায়ুচাপের সৃষ্টি করেছিল।
এই পুরো প্রক্রিয়াটি কিছু শর্তের ওপর নির্ভর করছে। ইরানকেও সব ধরনের সংঘাত বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দিতে হবে। ইরান সরকার এই শর্ত মানার কথা জানিয়েছে। তবে তারা বলছে, এই জলপথের ওপর এখনো তাদের ‘কর্তৃত্ব’ বজায় আছে।
এই চুক্তির ফলে ট্রাম্প কঠিন এক সংকট থেকে রেহাই পেলেন। এর আগে তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘আজ রাতে একটি আস্ত সভ্যতা বিলীন হয়ে যাবে’। ফলে হয় তাকে যুদ্ধ শুরু করতে হতো, না হয় নিজের বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে পিছিয়ে আসতে হতো। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হয়তো সাময়িক সময়ের জন্য স্বস্তি পেয়েছেন।

আগামী দুই সপ্তাহ দুপক্ষ আলোচনায় বসবে। এ সময় তারা একটি স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা করবে। এই আলোচনার পথ সহজ হবে না। তবে এরই মধ্যে বিশ্ববাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারের নিচে নেমেছে। মার্কিন শেয়ারবাজারে সূচকও বেড়েছে। সবার মধ্যে একটি আশা তৈরি হয়েছে, সবচেয়ে খারাপ সময় হয়তো শেষ হয়েছে।
গত মঙ্গলবার সকালেও এমন অগ্রগতির কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। ওই সময় ট্রাম্প ইরানি সভ্যতাকে চিরতরে ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, এই সভ্যতাকে আর ‘কখনোই ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না’।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমন নজিরবিহীন হুমকি ইরানকে যুদ্ধবিরতিতে বাধ্য করেছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। এর আগে ইরান এমন প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিল। তবে ট্রাম্পের এই উসকানিমূলক ঘোষণা এর আগে আধুনিক যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে আর দেখা যায়নি। তিনি ট্রুথ সোশ্যালে অত্যন্ত কড়া ভাষায় এই দাবি জানিয়েছিলেন। সেখানে তিনি অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করেছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্র এক সময় নিজেকে বিশ্ব শান্তির রক্ষক হিসেবে পরিচয় দিত। কিন্তু এখন তারা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভিত্তি নাড়িয়ে দিচ্ছে। ট্রাম্প দেশের রাজনীতিতে যেভাবে প্রচলিত প্রথাগুলো ভাঙতেন, এখন বিশ্ব মঞ্চেও তিনি সেই একই কাজ করছেন।

যদি এই যুদ্ধবিরতি শেষ পর্যন্ত স্থায়ী শান্তিও আনে, তবু ইরান যুদ্ধ ও ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য বিশ্ববাসীর কাছে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বদলে দিতে পারে।
মঙ্গলবার ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করেছেন। এমনকি কিছু নেতা ট্রাম্পকে প্রেসিডেন্ট পদ থেকে সরানোর দাবিও তুলেছেন। কংগ্রেস সদস্য জোয়াকিন কাস্ত্রো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ লিখেছেন, ‘এটা পরিষ্কার, প্রেসিডেন্টের মানসিক অবস্থার অবনতি ঘটছে। তিনি দেশ চালানোর যোগ্য নন।’
মার্কিন সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের শীর্ষ নেতা চাক শুমার বলেন, রিপাবলিকানদের মধ্যে যাঁরা এই যুদ্ধ বন্ধের পক্ষে দাঁড়াবেন না, তাঁদের চরম মূল্য দিতে হবে। উদ্ভূত পরিস্থিতির সব পরিণতির দায় তাঁদেরই নিতে হবে।
রিপাবলিকান দলের অনেক সদস্য তাদের প্রেসিডেন্টের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তবে সাধারণত তিনি যেমন একচেটিয়া সমর্থন পান, এবার সেটা দেখা যায়নি। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সতর্ক করে বলেছেন, যেকোনো মূল্যে হোক হরমুজ প্রণালি খোলা রাখা হবে
জর্জিয়ার রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য অস্টিন স্কট ট্রাম্পের ওই হুমকির কড়া সমালোচনা করেছেন। তিনি প্রতিনিধি পরিষদের সশস্ত্র সেবা কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য। একটি আস্ত সভ্যতা ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকির বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন তিনি।
অস্টিন স্কট বিবিসিকে বলেন, ‘প্রেসিডেন্টের মন্তব্যে হিতে বিপরীত হতে পারে। আমি তাঁর এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত নই।’
উইসকনসিনের সিনেটর রন জনসন সাধারণত ট্রাম্পের অনুগত হিসেবে পরিচিত। তবে তিনি বলেন, ট্রাম্প যদি এই বোমা হামলা চালিয়ে যেতেন, সেটি হতো এক ‘বিরাট ভুল’। অন্যদিকে টেক্সাসের কংগ্রেস সদস্য নাথানিয়েল মোরান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, তিনি একটি ‘পুরো সভ্যতা ধ্বংসের’ বিষয়টি সমর্থন করেন না।

মোরান আরও লিখেছেন, ‘আমরা এমন জাতি নই। দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকা যেসব নীতি মেনে চলে, এই হুমকি তার সঙ্গে যায় না।’
আলাস্কার সিনেটর লিসা মুরকোস্কি বরাবরই প্রেসিডেন্টের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন। তিনি সরাসরি লিখেছেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনায় সুবিধা পাওয়ার অজুহাতে এমন হুমকি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর তেহরানের রেভোল্যুশন স্কয়ারে সমবেত মানুষের ভিড়ে ইরানের পতাকা নাড়ছেন এক ব্যক্তি। ৮ এপ্রিল ২০২৬
তবে হোয়াইট হাউস হয়তো দাবি করবে, ট্রাম্পের এই কৌশল কাজ করেছে। ট্রাম্প বর্তমানে নানামুখী চাপে আছেন। জনমত জরিপে তার জনপ্রিয়তা কমছে এবং নিজ দলেও সমালোচনা বাড়ছে। পাশাপাশি চড়া জ্বালানি মূল্যের কারণে মার্কিন অর্থনীতিও ধুঁকছে। এমন অবস্থায় এই যুদ্ধবিরতি তাঁর জন্য বড় স্বস্তি হয়ে এসেছে।
ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া যুদ্ধবিরতির ঘোষণায় ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্র সব সামরিক লক্ষ্য অর্জন করেছে বলে দাবি করেন।। এমনকি লক্ষ্যের চেয়েও বেশি কিছু পাওয়া গেছে বলে তিনি দাবি করেন। সাম্প্রতিক হামলায় ইরানের সামরিক শক্তি অনেক কমেছে। দেশটিতে বর্তমান শাসনব্যবস্থা টিকে থাকলেও অনেক শীর্ষ নেতা বিমান হামলায় নিহত হয়েছেন।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক লক্ষ্য এখনো অর্জিত হয়নি। ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বর্তমান অবস্থা কী, তা এখনো অজানা। অথচ এটিই তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির মূল ভিত্তি। এ ছাড়া ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের মতো আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর ইরানের প্রভাব এখনো কমেনি।
ইরান বিনা শর্তে হরমুজ প্রণালি খুলে দিলেও এই জলপথের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি এখন আগের চেয়ে স্পষ্ট। বিশ্ব এখন বুঝতে পারছে, এই গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক পয়েন্টটি ইরান কতটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
ট্রাম্পের বার্তার পর ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাগচি একটি বিবৃতি দেন। তিনি জানান, ইরান এখন ‘প্রতিরক্ষামূলক অভিযান’ বন্ধ রাখবে। তবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল করতে হবে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে। আরাগচি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ১০ দফার মূল রূপরেখা মেনে নিয়েছে।
ইরানের ১০ দফার মধ্যে রয়েছে অঞ্চলটি থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহার, নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে রাখা। ট্রাম্প এসব শর্ত মানবেন কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। ফলে আগামী দুই সপ্তাহের আলোচনা অত্যন্ত জটিল হতে পারে।
আপাতত এটি ট্রাম্পের জন্য একটি রাজনৈতিক বিজয়। তিনি কড়া হুমকি দিয়ে নিজের উদ্দেশ্য সফল করেছেন। তবে এই যুদ্ধবিরতি কেবল একটি সাময়িক স্বস্তি, কোনো স্থায়ী সমাধান নয়।
প্রেসিডেন্টের এই আগ্রাসী আচরণ ও যুদ্ধের কারণে দীর্ঘ মেয়াদে কী ক্ষতি হলো, তা মূল্যায়ন করার সময় এখনো আসেনি। পুরো বিষয়টি নিয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে গভীর পর্যবেক্ষণ চলছে।
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats