ইরানের বিরুদ্ধে তিনি নিজে যে যুদ্ধ শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তার দুই সপ্তাহ পর প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এখন এক কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি কি নিজের নির্ধারিত অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য পূরণে যুদ্ধ চালিয়ে যাবেন, নাকি ক্রমে বিস্তৃত ও তীব্র হয়ে ওঠা সংঘাত থেকে নিজেকে বের করে আনার চেষ্টা করবেন, যে সংঘাত ইতোমধ্যে সামরিক, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিকর অভিঘাত তৈরি করছে। নিউ ইয়র্ক টাইমস দীর্ঘ এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে এসব কথা লিখেছে।
এতে আরও বলা হয় তিনি খুব দ্রুতই বুঝে গেছেন, দুই পথের যেকোনোটিই গভীর সমস্যায় পরিপূর্ণ এবং দুটোর সঙ্গেই এমন সব পরিণতি জড়িয়ে আছে, যেগুলো তিনি ও তার টিম যুক্তরাষ্ট্রকে ইসরাইলের পাশে দাঁড় করিয়ে প্রায় এক-চতুর্থাংশ শতাব্দীর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় যুদ্ধে ঠেলে দেয়ার সময় খাটো করে দেখিয়েছিলেন।
তিনি যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারেন এমন এক দুর্বল হয়ে পড়া শত্রুর বিরুদ্ধে, যে তবু যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের কাছ থেকে দ্রুত বাড়তে থাকা অর্থনৈতিক মূল্য আদায় করতে সক্ষম হয়েছে, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে জটিলতায় ফেলে দিয়েছে এবং পুরো অঞ্চলে এক ডজন দেশের ওপর আঘাত হেনেছে।
যুদ্ধ চালিয়ে গেলে আরও বেশি মার্কিন প্রাণহানির ঝুঁকি তৈরি হবে, আর্থিক ব্যয় আরও ত্বরান্বিত হবে এবং জোটগুলোতে আরও ফাটল ধরার আশঙ্কা বাড়বে। আরও যুদ্ধের জালে দেশকে না জড়ানোর যে অঙ্গীকার ট্রাম্প করেছিলেন, সেখান থেকে তার এই তীব্র বিচ্যুতি নিয়ে তার রাজনৈতিক ভিত্তির ভেতরেও অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।Politics
অথবা তিনি পিছু হটার প্রক্রিয়া শুরু করতে পারেন, যদিও তার বেশিরভাগ লক্ষ্য- এর মধ্যে রয়েছে ইরান যেন আর কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে না পারে তা নিশ্চিত করা। সেটা এখনো পূরণ হয়নি। কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যৌথ অভিযানের সবচেয়ে বড় সামরিক সাফল্য এখন পর্যন্ত ছিল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারের বড় অংশ ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করা এবং তাদের নৌবাহিনীকে পঙ্গু করে দেয়া। প্রায় ৪০ বছর ধরে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে থাকা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হয়েছেন।
কিন্তু আরও দুঃসাহসী হয়ে ওঠা ধর্মভিত্তিক শাসনব্যবস্থা এখনো ক্ষমতায় আছে; দৃশ্যত সেটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন নিহত আয়াতুল্লাহর ছেলে। তিনি ইতোমধ্যে শপথ করেছেন যে ইরানের সক্ষমতাগুলো- সাইবার হামলা থেকে শুরু করে সমুদ্রে মাইন পেতে রাখা এবং আঞ্চলিক লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, চালিয়ে যাওয়া হবে। শক্তিশালী ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড কর্পসের আধাসামরিক বাহিনী এবং জানুয়ারিতে রাস্তায় হাজারো বিক্ষোভকারী ইরানিকে হত্যা করা মিলিশিয়াগুলোও এখনো অক্ষত আছে।
তার ওপর, ট্রাম্প যদি এখনই সরে যান, তাহলে প্রায় বোমা-মানের সমৃদ্ধ পারমাণবিক জ্বালানির মজুত- যা নিয়ে আশঙ্কা যে ইরান ১০টি বা তার বেশি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারে। তা ইরানের ভূখণ্ডের ভেতরেই থেকে যাবে, এমন এক আহত ইরানি সরকারের নাগালের মধ্যে থাকবে। যারা হয়তো আগের চেয়ে আরও বেশি উৎসাহ নিয়ে সেই জ্বালানিকে অস্ত্রে পরিণত করতে চাইবে। যুদ্ধ শুরুর ঠিক সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছিলেন, ‘মানুষকে গিয়ে এটা আনতে হবে।’ তিনি ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন ইরানের গভীর ভূগর্ভস্থ ভান্ডার থেকে এই উপাদান উদ্ধারে স্থল অভিযানের দিকে- একটি ভয়ংকর ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান, যা বিবেচনা করছেন বলে ট্রাম্প জানিয়েছেন। যদিও এখনো নির্দেশ দিতে প্রস্তুত নন।
যুদ্ধ তৃতীয় সপ্তাহে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে এর পরিণতিও বিস্তৃত হচ্ছে। যুদ্ধে ১৩ জন মার্কিন নিহত হয়েছেন। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ২১০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই ইরানে। জাতিসংঘে ইরানের প্রতিনিধি জানিয়েছেন, বুধবার পর্যন্ত সেখানে ১,৩৪৮ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে আরও ২,৫০০ মেরিন মোতায়েন করছে, যা সেখানে আগে থেকেই থাকা ৫০,০০০ সেনার সঙ্গে যুক্ত হবে। এর আগে মার্কিন বাহিনী খার্গ দ্বীপে হামলা চালায়, যেটি ইরানের বিশাল তেল রপ্তানির প্রধান শিপিং বন্দর। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ দাবি করেছেন, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলকে হুমকির মুখে ফেলার ক্ষেত্রে ইরানের সাফল্য নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। তবু এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ প্রায় পুরোপুরি বন্ধই রয়ে গেছে। ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্যের বড় একটি অংশ, বিশেষ করে তেল বাণিজ্য, চাপে পড়ে গেছে। শনিবার নাগাদ ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে চীন, ফ্রান্স, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং বৃটেনকে নৌবাহিনী পাঠানোর আহ্বান জানান, যাতে প্রণালিটি নিরাপদ রাখা যায়। এটাই ছিল তার প্রথম প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি যে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ খোলা রাখতে বর্তমানে অঞ্চলে থাকা মার্কিন সম্পদের চেয়ে বেশি সহায়তা ও সক্ষমতা লাগতে পারে।
শনিবার নাগাদ সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি বড় তেলবাণিজ্য বন্দরে ড্রোন হামলার পর ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠতে দেখা যায়। মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র এমনকি কিছু রুশ তেল বিক্রির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞাও স্থগিত করেছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইরাকে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসে দুই দফা হামলা হয়েছে।
ট্রাম্প প্রকাশ্যেই থাকা-না-থাকার এই বিকল্পগুলো নিয়ে লড়াই করছেন; কখনো তিনি ইঙ্গিত দেন যুদ্ধ প্রায় জিতে গেছেন। আবার কখনো স্বীকার করেন সামনে এখনো কঠিন লড়াই বাকি। প্রেসিডেন্ট বলেছেন তিনি হামলার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কারণ তার ভালো অনুভূতি হয়েছিল যে ইরান অঞ্চলে থাকা মার্কিন বাহিনীর ওপর আগাম হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সেদিন আরও বলেন, কখন সরে আসতে হবে সে ব্যাপারেও তিনি নিজের প্রবৃত্তির ওপর নির্ভর করবেন। তিনি ফক্স নিউজকে বলেন, তিনি তা ‘হাড়ে হাড়ে টের পাবেন’।
যুদ্ধের দ্বিতীয় সপ্তাহে ট্রাম্প প্রশাসন বুঝতে পারে, হরমুজ প্রণালি আটকে দিয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে অস্থির করার ক্ষেত্রে ইরানের ইচ্ছা ও সক্ষমতা কর্মকর্তাদের ধারণার চেয়ে বেশি ছিল; একই সঙ্গে পুরো অঞ্চলে যুদ্ধ ছড়িয়ে দেওয়ার তেহরানের ক্ষমতাও প্রত্যাশার চেয়ে বড় ছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে এই তথ্য উঠে এসেছে; জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক আলোচনা হওয়ায় তাদের অনেকেই নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেছেন।
ট্রাম্প বারবার যুদ্ধ প্রায় শেষ বলে ইঙ্গিত দিলেও, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল তাদের অভিযান আরও জোরদার করে গেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র অঞ্চলটিতে আরও বেশি সামরিক সম্পদ পাঠাতে থেকেছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল অংশীদারিত্বেও চাপ তৈরি হওয়ার লক্ষণ দেখা গেছে। আর কিছু রিপাবলিকান উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন যে, বিদেশি হস্তক্ষেপ নিয়ে গভীর সন্দিহান ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভিত্তি ভেঙে যেতে পারে, যদি মার্কিন অঙ্গীকার আরও বাড়ে এবং প্রাণহানি বেড়ে যায়। ট্রাম্পের সহযোগীরা বলছেন, এত জটিল সামরিক অভিযানের মাত্র ১৪ দিন পর ফলাফল বিচার করা খুব তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে। তাদের দাবি, ট্রাম্প দীর্ঘ লড়াইয়ের জন্যও প্রস্তুত আছেন।
প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলাইন লেভিট শনিবার বলেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য যে হুমকি তৈরি করে, তা নিশ্চিহ্ন করার দীর্ঘমেয়াদি লাভের জন্য তিনি তেলের দামের স্বল্পমেয়াদি ঝুঁকি নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, এ ধরনের অভিযানকে ফলাফলের ভিত্তিতেই বিচার করা হয়- এ কথা বোঝার মতো প্রজ্ঞা তার আছে। আর যদি যুক্তরাষ্ট্র বলতে পারে যে ইরানের সামরিক সক্ষমতা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, তাহলে প্রেসিডেন্ট জানেন, আধুনিক কালের যেকোনো প্রেসিডেন্টের সবচেয়ে বড় অর্জনগুলোর একটি হবে এটি। তিনি উপসংহারে বলেন, অপারেশন এপিক ফিউরির লক্ষ্যগুলো পুরোপুরি অর্জিত হয়েছে তা নিশ্চিত করতে প্রেসিডেন্ট দৃঢ়ভাবে অবস্থান নিয়েছেন।
(নিউইয়র্ক টাইমস থেকে সংক্ষেপিত)
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats