ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের শুরুতে ডনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, তেহরানের আর পারমাণবিক বা প্রচলিত সামরিক হুমকি তৈরি করা উচিত নয় এবং সেখানে দুর্বল হয়ে পড়া মোল্লাতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার অবসান হওয়া উচিত৷
তারপর থেকে অবশ্য ট্রাম্প এবং যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তারা ইরানে মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলার জন্য নানা ধরনের কারণ উল্লেখ করেছেন৷ প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সোমবার এমনকি এ কথাও বলেছেন যে, বর্তমান সংঘাত ‘‘তথাকথিত শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের যুদ্ধ নয়৷''
যুক্তরাষ্ট্রের অতীত বিশ্লেষণ করলে অবশ্য কোনো দেশের শাসনব্যবস্থা বা শাসক পরিবর্তনে সামরিক অভিযানের অনেক দৃষ্টান্ত পাওয়া যাবে৷
২০১৯ সালের এক গবেষণাপত্র অনুযায়ী, শুধুমাত্র শীতল যুদ্ধের সময় (১৯৪৭-১৯৮৯) যুক্তরাষ্ট্র বিদেশে ক্ষমতার ভারসাম্যকে পক্ষে রাখতে ৭২টি প্রচেষ্টা চালিয়েছে৷ সেগুলোর মধ্যে ৬৪টিই ছিল গোয়েন্দা বিভাগের গোপন অভিযান, যার সাফল্যের হার ছিল প্রায় ৪০%৷ বিভিন্ন দেশে শাসনব্যবস্থা বা শাসক পরিবর্তনে যুক্তরাষ্ট্রের বড় কয়েকটি অভিযান একটু ফিরে দেখা যাক৷
লিবিয়া (২০১১)
২০১১ সালে ‘আরব বসন্ত' নামে পরিচিতি পাওয়া বিদ্রোহ সমগ্র উত্তর আফ্রিকা জুড়ে পরিবর্তনের আশা জাগিয়ে তোলে৷ তখন লিবিয়ায়ও দীর্ঘ দিনের শাসক মোয়াম্মার গাদ্দাফির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তীব্রতা পায়৷ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট তখন বারাক ওবামা৷ তার সরকার তখন গাদ্দাফি-বিরোধী বিক্ষোভের নেতৃত্বে থাকা তথাকথিত ন্যাশনাল ট্র্যানজিশনাল কাউন্সিল, অর্থাৎ জাতীয় অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদকে সমর্থন দেয়৷
তারপর এক পর্যায়ে ন্যাটোর ‘অপারেশন ইউনিফাইড প্রোটেক্টর'-এর অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স এবং যুক্তরাজ্য বিমান হামলা শুরু করে লিবিয়ায়৷ অক্টোবরে একটি মার্কিন ড্রোন এবং একটি ফরাসি যুদ্ধবিমান গাদ্দাফির কনভয়ে হামলা চালায়৷ পরে ন্যাশনাল ট্র্যানজিশনাল কাউন্সিলের যোদ্ধাদের হাতে তিনি নিহত হন৷ তার মৃত্যুর পর ১৫ বছর পেরিয়ে গেছে, কিন্তু লিবিয়ায় এতদিনেও রাজনৈতিক ঐক্য এবং স্থিতিশীলতা আসেনি৷

ইরাক (২০০৩)
১ মে, ২০০৩৷ তার কয়েক সপ্তাহ আগে ইরাকের স্বৈরশাসক সাদ্দাম হোসেনের পতন হয়৷ মে মাসের প্রথম দিনে যুক্তরাষ্ট্রের তখনকার প্রেসিডেন্ট জর্জ ডাব্লিউ. বুশ ইরাক যুদ্ধের সমাপ্তি ঘোষণা করেন৷ সেদিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের ডেকের ওপর এক ব্যানারে লেখা হয়েছিল, ‘মিশন অ্যাকমপ্লিশড' (মিশন সম্পন্ন)৷ প্রেসিডেন্ট জর্জ ডাব্লিউ. বুশ নিজের বক্তব্যে বলেন, ‘‘একনায়কতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে রূপান্তরিত হতে সময় লাগবে, তবে (সেই লক্ষ্যপূরণ) সর্বাত্মক প্রচেষ্টার যোগ্য৷ কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমাদের জোট থাকবে৷ তারপর আমরা চলে যাবো, আমরা চলে যাবো একটি স্বাধীন ইরাককে রেখে৷''
কিন্তু ন্যোটোর নেতৃত্বাধীন জোট বাহিনী ইরাক ছাড়লেও ইরাকে এখনো শান্তি বা স্থিতিশীলতা আসেনি৷ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছিল৷ প্রতিবেশী ইরানের সমর্থনপুষ্ট স্থানীয় শিয়া মিলিশিয়ারা বিভিন্ন সুন্নি গোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়৷ ক্ষমতার শূন্যতার মধ্যে ইরাকে তথাকথিত সন্ত্রাসী সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএসআইএস) শক্তিশালী হয়ে উঠলো৷ এর ফলে ইরাক তো বটেই সঙ্গে সিরিয়াসহ প্রায় পুরো অঞ্চলই আরো অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে৷ মার্কিন ইতিহাসবিদ জোসেফ স্টিব মনে করেন, আসলে সেই সময় সেই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র যে ভেবেছিল সাদ্দামের পতন হলেই ইরাকে উদার গণতন্ত্রের মূল্যবোধ প্রাধান্য পাবে সেটা ছিল মস্ত বড় ভুল৷

আফগানিস্তান (২০০১)
জর্জ ডাব্লিুউ বুশের আমলে যুক্তরাষ্ট্র শুধু ইরাকেই ‘শাসক পরিবর্তন'-এর জন্য যুদ্ধে নামেনি৷ ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর টুইন টাওয়ারে সন্ত্রাসী হামলার চার সপ্তাহ পর মার্কিন সেনাবাহিনী আফগানিস্তানে ‘অপারেশন এন্ডিউরিং ফ্রিডম' শুরু করে৷ তালেবান শাসন দ্রুত উৎখাত হলেও, নতুন মার্কিন-সমর্থিত সরকার সীমিত সময়ের জন্য তাদের অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়৷
২০১৪ সালে জার্মানিসহ আন্তর্জাতিক বাহিনীর দেশগুলো আফগানিস্তানে সৈন্য সংখ্যা কমিয়ে আনার পর তালেবানের শক্তি ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে৷ তীব্র আক্রমণে দৃশ্যত খুব অল্প সময়েই ক্ষমতাসীন ঐক্যজোট সরকারকে কোণঠাসা করে ফেলে৷ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজের প্রথম মেয়াদের শেষ বছরে তালেবানের সঙ্গে আলোচনায় আর আক্রমণ করা হবে না- এমন শর্তে আফগানিস্তান থেকে সব সৈন্য প্রত্যাহারে রাজি হন ডনাল্ড ট্রাম্প৷ তারপর তালেবানের ক্ষমতায় ফিরতে এবং আফগানিস্তানকে সেই ‘অপারেশন এন্ডিউরিং ফ্রিডম'-এর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে সময় লাগেনি৷

পানামা (১৯৮৯)
১৯৮০-র দশকে পানামা শাসন করেছেন স্বৈরশাসক মানুয়েল নোরিয়েগা৷ বছরের পর বছর সিআইএ-র মদতে দেশ শাসন করা নোরিয়েগাই এক পর্যয়ে যেন মার্কিন সরকারের কাছে বোঝা হয়ে গেলেন৷ কারণ, তার শাসনামলে মাদক পাচারকারীদের কেন্দ্রস্থল হয়ে যায় পানামা৷ এর ফলে পানামা খালে বেকায়দায় পড়ার শঙ্কা জাগে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের মনে৷
১৯৮৯ সালের মে মাসে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হন বিরোধী রাজনীতিবিদ গুইলেরমো এন্ডারা৷ কিন্তু নোরিয়েগা নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানান৷ ফলে দেশের পরিস্থিতি খারাপ হতে থাকে৷ ১৯৮৯ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের তখনকার রাষ্ট্রপতি জর্জ এইচ. ডাব্লিউ. বুশ নোরিয়েগাকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য পানামায় সামরিক অভিযানের নির্দেশ দেন৷
২০ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন এন্ডারা৷ দুই সপ্তাহ পরে আত্মসমর্পণ করেন নোরিয়েগা৷ তারপর আর মুক্তজীবনে ফিরতে পারেননি৷ যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স এবং পানামার বিভিন্ন কারাগারে দীর্ঘদিন সাজা ভোগ করতে হয় তাকে৷ ২০১৭ সালে মারা যান নোরিয়েগা৷
গ্রেনাডা (১৯৮৩)
১৯৭৯ সালের পর থেকে ক্যারিবীয় অঞ্চলের দেশ গ্রেনাডা ক্রমশ সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকে ঝুঁকছিল৷ কিন্তু প্রধানমন্ত্রী মরিস বিশপ সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিপক্ষ যুক্তরাষ্ট্র-বান্ধব নীতি অবলম্বন শুরু করেন৷ পরিণামে সামরিক বাহিনীর হাতে প্রাণ দিতে হয় তাকে৷ যুক্তরাষ্ট্রও বসে থাকেনি৷ তখনকার প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান বেশ কয়েকটি ক্যারিবীয় রাষ্ট্রের সমর্থন নিয়ে অচিরেই গ্রেনাডায় শুরু করেন সামরিক অভিযান৷ সেই অভিযানের বিরোধিতা করেছিল ব্রিটেন৷ কমনওয়েলথের সদস্য গ্রেনাডার পাশে এভাবে থাকতে চাইলেও অভিযান অবশ্য রুখতে পারেনি ব্রিটেন৷
ডোমিনিকান রিপাবলিক (১৯৬৫)
কয়েকটি অভ্যুত্থানের পর ডোমিনিকান রিপাবলিক তখন এক গৃহযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে৷ ভোটের মাধ্যমে অর্গ্যানাইজেশন অব আমেরিকান স্টেট-এর সমর্থন নিয়ে তখনই ডোমিনিকান রিপাবলিকে সামরিক অভিযানের নির্দেশ দেন যুক্তরাষ্ট্রের তখনকার প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি. জনসন৷ অভিযানের প্রাথমিক লক্ষ্য হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের সুরক্ষার কথা বলা হলেও আসলে তা ছিল ‘দ্বিতীয় কিউবা' হতে না দেয়ার প্রয়াস৷ ৪৪ হাজার ৪০০ জন সৈন্য নিয়ে হামলা চালিয়ে ডোমিনিকান রিপাবলিকের সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হওয়া ঠেকিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র৷

ভেনেজুয়েলা (২০২৬)
‘শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন'-এর লক্ষ্যে সর্বশেষ অভিযানটি এত সাম্প্রতিক যে এর চূড়ান্ত মূল্যায়ন এখনই করা অসম্ভব৷ ২০২৬ সালের জানুয়ারির প্রথম দিকে ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণের ব্যবস্থা করেছিলেন৷ ‘মাদক সন্ত্রাসবাদ'-এ জড়িত থাকার অভিযোগে নিউ ইয়র্কে তার বিচার হওয়ার কথা৷ মাদুরোর অনুপস্থিতিতে এই মুহূর্তে রাষ্ট্র ক্ষমতার শীর্ষে রয়েছেন মাদুরোর সাবেক ডেপুটি ডেলসি রদ্রিগেজ৷ ডেলসি মাদুরোর শাসনের অংশ হলেও ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন তাকে তিনি সহযোগিতা করবেন৷ বিনিময়ে সাউথ অ্যামেরিকার বিশাল তেলের ভাণ্ডারে প্রবেশাধিকার দিতে হবে যুক্তরাষ্ট্রকে৷
২০২৫ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী, ট্রাম্প সমর্থক মারিয়া করিনা মাচাদো অবশ্য ইতিমধ্যে ভেনেজুয়েলায় ফিরে দেশকে গণতন্ত্রের পথে উত্তরণে নেতৃত্ব দেয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন৷
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats