প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বকে এটা বিশ্বাস করাতে আপ্রাণ চেষ্টা করছেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান এখন যুদ্ধ শেষ করতে প্রস্তুত। কিন্তু তেহরানের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত এমন কোনো প্রকাশ্য লক্ষণ দেখা যায়নি, তারা ট্রাম্পকে এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করবে। ট্রাম্প নিজেই প্রায় চার সপ্তাহ আগে তাঁর আগের সব কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ধ্বংস করার মাধ্যমে এই সংকট শুরু করেছিলেন।
গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় কংগ্রেস সদস্যদের ট্রাম্প বলেন, তারা চুক্তি করতে এতটাই মরিয়া যে বলার মতো নয়। কিন্তু তারা এটা বলতে ভয় পাচ্ছে। কারণ, তারা ভাবছে, তারা নিজেদের জনগণের হাতেই মারা পড়বে। এরপর তাঁর রহস্যময় মন্তব্য ছিল, ‘তারা আমাদের হাতে মারা পড়ার ভয়ও পাচ্ছে।’
সেনা মোতায়েন বা যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া ট্রাম্পের জন্য এক বিশাল ঝুঁকি। কারণ, এতে প্রচুর মার্কিন সৈন্যের প্রাণহানি হতে পারে। এ ছাড়া ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় যে অর্থনৈতিক ধাক্কা লেগেছে, যুদ্ধ শুরু হলে তা আরও ভয়াবহ হবে।
ট্রাম্পের এই দাবি ও বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে এক বিশাল ফারাক দেখা যাচ্ছে। একদিকে তিনি বলছেন সমঝোতা আসন্ন, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে হাজার হাজার মার্কিন সেনা পাঠাচ্ছেন। এতে সংঘাত বিপজ্জনকভাবে বৃদ্ধির দিকেই যাচ্ছে।
সেনা মোতায়েন বা যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া ট্রাম্পের জন্য এক বিশাল ঝুঁকি। কারণ, এতে প্রচুর মার্কিন সৈন্যের প্রাণহানি হতে পারে। এ ছাড়া ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় যে অর্থনৈতিক ধাক্কা লেগেছে, যুদ্ধ শুরু হলে তা আরও ভয়াবহ হবে। দীর্ঘস্থায়ী এক যুদ্ধ ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের পুরো অর্জন ও তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়কে গ্রাস করে নিতে পারে। কারণ, তিনি ক্ষমতায় এসেছিলেন যুদ্ধ শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে, শুরু করার জন্য নয়।
আলোচনার গুরুত্ব ও বর্তমান চ্যালেঞ্জ
এই মুহূর্তে আলোচনার প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি। কিন্তু একটি প্রশ্ন কূটনীতির আশাকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে দিচ্ছে। যুদ্ধের প্রায় চার সপ্তাহ পার হয়ে যাওয়ার পর সমঝোতার মাধ্যমে বেরিয়ে আসার সময় কি এখনো আছে?
ট্রাম্প বরাবরই বাস্তবতাকে নিজের মতো করে উপস্থাপন করে সফল হয়েছেন। কিন্তু এবার তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখতে ও ইরানের কাছে পুরোপুরি নতি স্বীকার না করে ‘সম্মানজনক প্রস্থান’ তৈরি করতে বাস্তবধর্মী উদ্যোগ প্রয়োজন। বর্তমান পরিস্থিতি ট্রাম্পের স্বভাবজাত দর্শনের (শত্রুর আত্মসমর্পণ নিশ্চিত করা) বাইরে গিয়ে সম্মান বাঁচিয়ে বেরিয়ে আসার সুযোগ দেওয়ার দাবি জানাচ্ছে।
ট্রাম্পের হাতে সময় খুব কম। যুদ্ধের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক চাপ প্রতিদিন বাড়ছে। তিনি এখন সেই দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ছেন, যা ভিয়েতনাম থেকে ইরাক পর্যন্ত আগের অনেক প্রেসিডেন্টকে ভুল পথে পরিচালিত করেছিল—যুদ্ধ থেকে বের হতে গিয়ে কি যুদ্ধকে আরও তীব্র করতে হবে?
ইরান তাদের অনেক নেতা ও সামরিক সরঞ্জাম হারিয়েছে ঠিকই। কিন্তু মার্কিন সামরিক শক্তির সামনে ধ্বংস হওয়ার ঝুঁকি থাকলেও তারা হয়তো একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টকে আরও রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ে টেনে আনার সুযোগ লুফে নিতে পারে।
ট্রাম্পের ‘ইচ্ছাকৃত যুদ্ধ’ ও কঠিন পছন্দ
চলতি সপ্তাহে যুদ্ধের প্রতি ট্রাম্পের খামখেয়ালি আচরণ দেখা গেছে। কখনো তিনি ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন, আবার কখনো বলছেন বড় কোনো সমঝোতা হতে যাচ্ছে। এটি চরমপন্থার ওপর ভিত্তি করে গড়া তাঁর রাজনৈতিক পদ্ধতিরই অংশ। তবে কূটনীতির কথা বলার আগে সামরিক শক্তি ব্যবহারের দিকে তাঁর এই ঝুঁকে পড়া একটি রূঢ় বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তুলেছে—শান্তি চুক্তির লক্ষণ আসলে খুব দুর্বল।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক মধ্যপ্রাচ্য শান্তি আলোচক অ্যারন ডেভিড মিলার বলেন, ইরানিরা এমন মূল্য দাবি করবে, যা দিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রস্তুত নন। ফলে ট্রাম্পকে কেবল হরমুজ প্রণালি খোলার জন্য নয়, বরং তা খোলা রাখতে বড় সামরিক অভিযান চালাতে হবে।
মিলার সিএনএনকে বলেন, ট্রাম্পের শুরু করা এই ‘ইচ্ছাকৃত যুদ্ধ’ এখন একটি ‘অপরিহার্য যুদ্ধে’ পরিণত হয়েছে।
বর্তমান প্রশাসনের কাছ থেকে খুব দক্ষ কূটনৈতিক চাল আশা করা কঠিন। কারণ, এই যুদ্ধের পেছনে তারা কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ বা বের হওয়ার পথ নিশ্চিত করতে পারেনি। যুদ্ধের আগে ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার ও বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের আলোচনা ব্যর্থ হয়েছেন। ইউক্রেন বা গাজায় তাঁদের অন্যান্য উদ্যোগও দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য পায়নি।
গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, শান্তি আলোচনা শুরু হলে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স মূল ভূমিকা পালন করতে পারেন। সম্ভবত পাকিস্তান বা তুরস্কের মধ্যস্থতায় সেই আলোচনা হবে। অতীতে হস্তক্ষেপবিরোধী অবস্থানের কারণে ইরানিদের কাছে ভ্যান্স গ্রহণযোগ্য হতে পারেন। তবে এটি ২০২৮ সালের সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ভ্যান্সকে রাজনৈতিক চাপে ফেলে দেবে। এ ছাড়া আলোচনার মধ্যেই মার্কিন হামলার কারণে যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে, তা সহজে মিটবে না।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের বিপরীতমুখী অবস্থান
ইরানিদের তুলনায় ট্রাম্পই আলোচনার জন্য বেশি আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে। এর কারণ, সম্ভবত তাঁর ওপর জনমতের চাপ। তিনি দেশকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করেননি এবং জনমত জরিপগুলোতে তাঁকে ব্যাপক অজনপ্রিয় দেখা যাচ্ছে।
ট্রাম্প বরাবরই বাস্তবতাকে নিজের মতো করে উপস্থাপন করে সফল হয়েছেন। কিন্তু এবার তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখতে ও ইরানের কাছে পুরোপুরি নতি স্বীকার না করে ‘সম্মানজনক প্রস্থান’ তৈরি করতে বাস্তবধর্মী উদ্যোগ প্রয়োজন।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র তেহরানে অনেক বার্তা পাঠিয়েছে। কিন্তু কোনো আলোচনার কথা তিনি অস্বীকার করেন। তবে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলাইন লেভিট ফলপ্রসূ আলোচনার দিকে ইঙ্গিত করেছেন।
শান্তি আলোচনার আগে সাধারণত উভয় পক্ষই নিজেদের শক্ত অবস্থানের জানান দেয়। কিন্তু এখানে পার্থক্য বিশাল ও বাস্তব। ইরানি এক কর্মকর্তা প্রেস টিভিকে বলেন, ইরান চায় আগ্রাসন ও হত্যাকাণ্ড পুরোপুরি বন্ধ হোক, যুদ্ধ আর শুরু হবে না এমন নিশ্চয়তা এবং যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ। এ ছাড়া তারা লেবাননে হিজবুল্লাহর ওপর ইসরায়েলি হামলা বন্ধের দাবিও করেছে।
ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইদ বদর বিন হামাদ আল বুসাইদির (ডানে) সঙ্গে বৈঠকে ট্রাম্পের মেয়ে জামাই জ্যারেড কুশনার (বাঁয়ে) ও হোয়াইট হাউসের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ (মাঝে)। ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, জেনেভা
ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইদ বদর বিন হামাদ আল বুসাইদির (ডানে) সঙ্গে বৈঠকে ট্রাম্পের মেয়ে জামাই জ্যারেড কুশনার (বাঁয়ে) ও হোয়াইট হাউসের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ (মাঝে)। ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, জেনেভাছবি: ওমানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
ট্রাম্পের পক্ষে মেনে নেওয়া অসম্ভব এমন একটি দাবিও তারা করেছে—হরমুজ প্রণালির ওপর সার্বভৌমত্ব। এটি মেনে নিলে বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল সরবরাহের নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে চলে যাবে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ১৫ দফা পরিকল্পনায় রয়েছে—ইরানের পরমাণু অস্ত্র নিষিদ্ধ করা, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত হস্তান্তর করা, আঞ্চলিক প্রক্সি গ্রুপগুলোর সহায়তা বন্ধ করা এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া। যুদ্ধ যে ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে তার প্রমাণ হলো, এখন হরমুজ খুলে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান দাবিতে পরিণত হয়েছে। এই হরমুজ প্রণালি যুদ্ধের শুরুতে সবার জন্য উম্মুক্ত ছিল।
জয়ের ভ্রান্তি ও সংলাপের আশা
আলোচনার প্রধান বাধা কেবল শর্তাবলি নয়, বরং দুই পক্ষের মানসিকতা। দুই পক্ষই মনে করছে তারা জিতছে। ক্যারোলাইন লেভিট ইরানকে তিরস্কার করে বলেছেন, তারা বুঝতে পারছে না যে তারা সামরিকভাবে পরাজিত হয়েছে।
হাজার হাজার মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের সামরিক শক্তি ও নেতৃত্ব বিধ্বস্ত হয়েছে—এটি সম্ভবত সত্য। কিন্তু ট্রাম্পের বারবার জয়ের দাবি করার অর্থ হলো তিনি শত্রুর দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে পারছেন না। এটি তাঁর আলোচনার অবস্থানকে দুর্বল করতে পারে।
ইরানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর জন্য যেকোনোভাবে টিকে থাকাটাই হলো বিজয়। তারা প্রচলিত যুদ্ধে জিততে পারবে না। তাই, তারা যুক্তরাষ্ট্রকে যন্ত্রণায় ফেলে ট্রাম্পকে পিছু হটতে বাধ্য করার কৌশল নিয়েছে।
ট্রাম্পের বক্তব্যে এখানে একটি অসংগতি রয়েছে। যদি যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে জিতেই গিয়ে থাকে, তবে কেন তারা এখনো যুদ্ধ করছে এবং কেন মধ্যপ্রাচ্যে হাজার হাজার মার্কিন মেরিন সেনা পাঠানো হচ্ছে?
কূটনীতি শুরু হওয়ার আগে সব যুদ্ধই সমাধানহীন মনে হয়। সমঝোতার জন্য এমন একটি সরু জায়গা খুঁজে বের করতে হয়, যেখানে দুই শত্রুপক্ষ মিলিত হতে পারে। মার্কিন স্থলবাহিনী মোতায়েন শেষ হওয়ার আগে হয়তো হাতে মাত্র কয়েক সপ্তাহ সময় আছে।
এ ছাড়া সময় ফুরিয়ে আসছে। কারণ, যুদ্ধ শুরুর আগে পারস্য উপসাগর ত্যাগ করা শেষ তেলের ট্যাংকারগুলো শিগগিরই তাদের গন্তব্যে পৌঁছে যাবে। এর পর থেকে সরবরাহের ঘাটতি জ্বালানি সংকট ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়কে আরও বাড়িয়ে তুলবে।
কুইন্সি ইনস্টিটিউটের গবেষক ত্রিতা পারসি বিশ্বাস করেন, ট্রাম্পের মতো ইরানেরও যুদ্ধ শেষ করার তাগিদ আছে। তাই কূটনীতির সুযোগ আছে। তবে তিনি বলেন, এই যুদ্ধ শেষ করতে ট্রাম্পকে ইরানকে কিছু না কিছু দিতেই হবে, যা তার শুরুর অবস্থানের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পরিস্থিতি।
পারসি উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে বড় এক ছাড় দিয়েছে—সমুদ্রে থাকা ইরানের তেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে, যাতে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট কমে। যুদ্ধের আগে এটি ছিল অকল্পনীয়। কিন্তু এটিই এখন ভবিষ্যৎ শান্তি আলোচনার ভিত্তি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তারা শিগগিরই যদি কোনো প্রকৃত সংযোগ তৈরি করতে না পারেন, তবে এই যুদ্ধ বিপর্যয়কর রূপ নেবে। কূটনীতি যদি কাজ না করার পর্যায়ে চলে যায়, তবে তার ফলাফল হবে অভাবনীয় ও ভয়াবহ।
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats