দুই পুলিশ সদস্যের মৃত্যুদণ্ডসহ ৩০ আসামীর বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ‘প্রতীক’ হয়ে ওঠা রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যা মামলায় দুই পুলিশ সদস্যের মৃত্যুদণ্ড ও তিনজনকে যাবজ্জীবন সাজা দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। বৃহস্পতিবার দুপুর সোয়া ১২টার দিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণার পর রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার বাবনপুর এলাকার জাফর পাড়া গ্রামের বাড়িতে সাংবাদিকদের সামনে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন ও মা মনোয়ারা বেগম।
হত্যাকাণ্ডে ‘মাত্র দুজনকে’ মৃত্যুদণ্ড দেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে মকবুল হোসেন বলেন, “ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি পোমেল বড়ুয়া আমার ছেলের গলা টিপে ধরেছিল, তার সর্বোচ্চ শাস্তি হল না। আরও কঠোর সাজা দেওয়া দরকার ছিল। আরও অনেককে ফাঁসি দেওয়া দরকার।”

রায়ে পুলিশের বড় কর্মকর্তাদের বাঁচিয়ে দিয়ে ছোটদের সাজা দেওয়া হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, “অনেক অপরাধী পালিয়ে গেছে। বড় অপরাধীদের এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। সরকারের কাছে আমার দাবি, যারা পালিয়ে গেছে, তাদের ধরে এনে ফাঁসি দিতে হবে।”আইনজীবীদের সঙ্গে পরামর্শ করে পরবর্তীতে পরিবারের পক্ষে থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান মকবুল হোসেন।
আবু সাঈদের মা মনোয়ারা বেগম বলেন, “আরও বেশি আসামির ফাঁসি দিলে খুশি হতাম। এ রায়ে আমরা খুশি নই। আমার ছেলে অনেক অত্যাচারের শিকার।”
মৃত্যুদণ্ড পাওয়ারা হলেন- এএসআই (সশস্ত্র) আমির হোসেন ও কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়। তারা দুজনই গ্রেপ্তার রয়েছেন। আর যাবজ্জীবন সাজা পাওয়া তিনজন হলেন- তখনকার সহকারী পুলিশ কমিশনার (কোতোয়ালি জোন) আরিফুজ্জামান ওরফে জীবন, তাজহাট থানার তৎকালীন পুলিশ পরিদর্শক (নিরস্ত্র) রবিউল ইসলাম ওরফে নয়ন ও এসআই বিভূতি ভূষণ রায় ওরফে মাধব। পৃথক ধারায় এ তিনজনের ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয়েছে।
এ মামলায় মোট ৩০ আসামির সবাই দণ্ডিত হয়েছেন। বাকি ২৫ আসামির মধ্যে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয়েছে ৫ জনের, পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয়েছে ৮ জনের এবং ১১ জনের হয়েছে ৩ বছরের সাজা। অপর একজনের হাজতবাসের সময়কে দণ্ড হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। দণ্ডিতদের মধ্যে গ্রেপ্তার হয়ে ছয়জন কারাগারে আছেন। রায় ঘোষণার সময় তাদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।

কার কী সাজা দেয়া হলো
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ২ জন
মো. আমির হোসেন, সাবেক এএসআই (সশস্ত্র)/১৭৪ আরপিএমপি রংপুর। সুজন চন্দ্র রায়, সাবেক কনস্টেবল/১১৭৫ আরপিএমপি, রংপুর।
যাবজ্জীবন কারাদণ্ডসহ ১০ বছরের সাজা হয়েছে ৩ জন আসামির
১)আরিফুজ্জামান ওরফে জীবন, সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার, কোতোয়ালী জোন, আরপিএমপি, রংপুর। ২) রবিউল ইসলাম ওরফে নয়ন, সাবেক পুলিশ পরিদর্শক (নিরস্ত্র), সাবেক অফিসার ইনচার্জ, তাজহাট থানা, আরপিএমপি, রংপুর। ৩)বিভূতি ভূষণ রায় ওরফে মাধব, এসআই (নিরস্ত্র), সাবেক ক্যাম্প ইনচার্জ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, আরপিএমপি, রংপুর।
১০ বছরের সাজা হয়েছে ৫ জন আসামির
১)ড. হাসিবুর রশিদ ওরফে বাচ্চু, সাবেক ভিসি, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়। ২) মনিরুজ্জামান ওরফে বেল্টু, সাবেক পুলিশ কমিশনার, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ, রংপুর। ৩) মশিউর রহমান, সহযোগী অধ্যাপক, গণিত বিভাগ, বেরোবি। ৪) আসাদুজ্জামান মন্ডল ওরফে আসাদ, সহযোগী অধ্যাপক, লোক প্রশাসন বিভাগ, বেরোবি, রংপুর। ৫) পোমেল বড়ুয়া, ছাত্রলীগ সভাপতি, বেরোবি ছাত্রলীগ।
৫ বছরের সাজা হয়েছে ৮ জনের
১) আবু মারুফ হোসেন ওরফে টিটু, সাবেক উপ-পুলিশ কমিশনার, আরপিএমপি, রংপুর।
২) শাহ নূর আলম পাটোয়ারী ওরফে সুমন, সাবেক অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার, আরপিএমপি, রংপুর।
৩) রাফিউল হাসান রাসেল, সহকারী রেজিস্ট্রার, বেরোবি, রংপুর। ৪) এমরান চৌধুরী ওরফে আকাশ ওরফে দিশা, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বেরোবি ছাত্রলীগ।
৫) মাসুদুল হাসান ওরফে মাসুদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বেরোবি ছাত্রলীগ।
৬) মাহাবুবার রহমান ওরফে বাবু, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর, বেরোবি, রংপুর।
৭) ডা. সারোয়ার হোসেন ওরফে চন্দন, সভাপতি, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ, রংপুর।
৮) শরীফুল ইসলাম, সাবেক প্রক্টর, বেরোবি, রংপুর।
৩ বছরের সাজা হয়েছে ১১ জন আসামির
১) হাফিজুর রহমান ওরফে তুফান, সহকারী রেজিষ্ট্রার, বেরোবি। ২) মনিরুজ্জামান পলাশ, সেকশন অফিসার, বেরোবি। ৩) মাহাফুজুর রহমান শামীম, সাধারণ সম্পাদক, বেরোবি ছাত্রলীগ। ৪) ফজলে রাব্বী ওরফে গ্লোরিয়াস ফজলে রাব্বী, সহ-সভাপতি, বেরোবি ছাত্রলীগ।
৫) আখতার হোসেন, সহসভাপতি, বেরোবি ছাত্রলীগ। ৬) সেজান আহম্মেদ ওরফে আরিফ, সাংগঠনিক সম্পাদক, বেরোবি ছাত্রলীগ।
৭) ধনঞ্জয় কুমার ওরফে টগর, সাংগঠনিক সম্পাদক, বেরোবি ছাত্রলীগ। ৮) বাবুল হোসেন, দপ্তর সম্পাদক, বেরোবি ছাত্রলীগ। ৯) মোহাম্মদ নুরুন্নবী মন্ডল, এমএলএসএস, বেরোবি, রংপুর।
১০) নূর আলম মিয়া, সিকিউরিটি গার্ড, বেরোবি, রংপুর। ১১) একেএম আমির হোসেন ওরফে আমু, এমএলএসএস, বেরোবি, রংপুর।
এদিকে, আনোয়ার পারভেজ ওরফে আপেল, প্রক্টর অফিসের চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী, বেরোবি, তারা যতদিন কারাগারে ছিলেন ততোদিনই সাজা দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ তিনি এখন কারামুক্তি লাভ করবেন।
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই দুপুরে কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে পার্ক মোড়ে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী ও আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আবু সাঈদ।
সেদিন দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকা আবু সাঈদকে পুলিশের গুলি করার ভিডিও সংবাদ মাধ্যমে প্রচার হলে ছাত্র-জনতা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। পরদিন থেকে সারা দেশে ডাকা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি পালন করা হয়।

সাজা ঘোষণা শোনার পর আসামিরা বললেন ‘জয় বাংলা’
আবু সাঈদ হত্যার দায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় রায় ঘোষণার পর ট্রাইব্যুনালের এজলাস থেকে বেরিয়ে আসেন গ্রেপ্তার ৬ আসামি। এ সময় মৃত্যু দণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামির পেছনে থাকা কয়েকজন আসামি ‘জয় বাংলা’ বলে শ্লোগান দিতে থাকেন। এসময় ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে হট্টগোলের সৃষ্টি হয়। তবে মৃত্যু দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি আমির হোসেনের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটেছে।
এ সময় সাজাপ্রাপ্ত আসামিরা জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে বলেন, ‘আমরা এ রায় মানি না। আমাদের ফাঁসানো হয়েছে, আমরা নির্দোষ।’
বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এই রায় ঘোষণা করেন। এই ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন-বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats