২০১৭ সালের ১৩ অক্টোবর রাতে বাধ্য হয়ে ঢাকা ছাড়েন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা।
আমি তো রিফিউজি হিসেবেই আছি এখন। কারণ হলো শেখ হাসিনার সরকার আমাকে একটা কনভিকশন (দোষী সাব্যস্ত করা) দিয়েছিল, একটা সাজানো মামলায়। …যার পরিপ্রেক্ষিতে আমি স্ট্যাটাসবিহীন একেবারে ফ্লোটিংম্যান, যাকে বলে ভাসমান লোক হিসেবে আছি।’
নিজের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বলতে গিয়ে এ কথাগুলো বলেছেন ৯ বছর ধরে দেশের বাইরে থাকা সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। তিনি বিচারপতি এস কে সিনহা নামেও পরিচিত। সাবেক এই প্রধান বিচারপতি বর্তমানে কানাডার টরন্টোতে আছেন। তাঁর দেশত্যাগ ও পদত্যাগের প্রেক্ষাপট ও পেনশন সুবিধা না পাওয়া নিয়ে গত ২৭ আগস্ট, ২ সেপ্টেম্বর ও গতকাল সোমবার কথা বলেছেন প্রথম আলোর সঙ্গে।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৫ সালের ১৭ জানুয়ারি দেশের ২১তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে সুরেন্দ্র কুমার সিনহা শপথ নেন। তিনি ছিলেন দেশের ইতিহাসে প্রথম কোনো অমুসলিম প্রধান বিচারপতি। তাঁর চাকরির মেয়াদ ছিল ২০১৮ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত। মেয়াদ শেষের ৮২ দিন আগেই পদত্যাগ করেন তিনি।
২০১৭ সালের ২ অক্টোবর বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার ছুটির কথা জানানো, তারপর ছুটিতে যাওয়া ও ছুটিতে থাকা অবস্থায় তাঁর বিদেশ যাওয়া এবং বিদেশ থেকে পদত্যাগপত্র (১০ নভেম্বর) পাঠানোর মতো ঘটনা ঘটে।
অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশে ২০১৭ সালের ১৩ অক্টোবর রাতে ঢাকা ছাড়েন সাবেক এই প্রধান বিচারপতি। সেই থেকে দেশের বাইরে আছেন তিনি।
প্রথমে অস্ট্রেলিয়া, তারপর কানাডা, সেখান থেকে আমেরিকায়, তারপরে আবার কানাডায় ফেরেন বলে জানান সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। তিনি বলেন, ‘কানাডায় ছোট মেয়ের সঙ্গে আছি। আমি তো রিফিউজি হিসেবেই আছি এখন। আমার স্ত্রীর স্ট্যাটাস হয়ে গিয়েছে, পিআর (পারমানেন্ট রেসিডেন্সি বা স্থায়ী বাস) হয়ে গিয়েছে। তবে আমাকে দিচ্ছে না।’
স্ট্যাটাস না পাওয়ার কারণ হিসেবে সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বাংলাদেশে সাজানো মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়াকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, ‘আমার পিআর অ্যাপ্রুভ হয়েছে। তবে পুলিশ রিপোর্ট পাইনি, কার্ড ইস্যু হয়নি।’ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পরপরই দেশে ফেরার জন্য পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেন বলে জানান সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। তিনি বলেন, পাসপোর্টের জন্য কানাডার টরন্টোতে বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল কার্যালয়ে সর্বশেষ ৪ আগস্ট রিমাইন্ডার (মনে করিয়ে দেওয়া) দিয়ে মেইল করা হয়েছে। কোনো রিপ্লাই (উত্তর) দিচ্ছে না।

সিনহার নিয়োগ
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে টানা দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতা নেয় আওয়ামী লীগ। ওই নির্বাচনে ভোট গ্রহণের আগেই ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হন আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা। নির্বাচনটি বর্জন করেছিল বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দল।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা মামলায় আসামিদের ফাঁসির রায় পুনর্বিবেচনার আবেদনের শুনানি হয়েছিল আপিল বিভাগের চার সদস্যের বেঞ্চে। একজন সদস্য ছিলেন সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। মুক্তিযুদ্ধের সময়কার মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আপিল বিভাগের রায়ে বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং জামায়াতে ইসলামীর কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতার মৃত্যুদণ্ড যখন চূড়ান্ত হয়, তখন সুরেন্দ্র কুমার সিনহা প্রধান বিচারপতি ছিলেন।
প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে পদত্যাগের আগপর্যন্ত ২ বছর ৯ মাস ২৫ দিনের দায়িত্ব পালনকালে নানা কারণে আলোচনায় আসেন সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। শেষ বিতর্ক তৈরি হয় ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে দেওয়া বিচারপতি সিনহার লেখা রায় নিয়ে। তবে বিচারপতি সিনহার সঙ্গে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের দূরত্ব আরও কিছু আগে থেকেই স্পষ্ট হতে শুরু করে।
বিশেষ করে, অধস্তন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলা-সংক্রান্ত বিধিমালা নিয়ে সরকারের সঙ্গে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার কথা–চালাচালিতে বিষয়টি প্রকটভাবে দৃশ্যমান হয়।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা জাতীয় সংসদের কাছে ফিরিয়ে নিতে ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী পাস হয়। এ নিয়ে রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্টের রায় হয়। এর বিরুদ্ধে আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ।
তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ ২০১৭ সালের ৩ জুলাই সর্বসম্মতিতে আপিল খারিজ করে রায় দেন। ফলে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে বিচারপতিদের অপসারণের বিধান ফিরে। ২০১৭ সালের ১ আগস্ট পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। শেষ বিতর্ক তৈরি হয় ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে দেওয়া বিচারপতি সিনহার লেখা রায় নিয়ে।
সুরেন্দ্র কুমার সিনহার দেশত্যাগ ব্যাপক আলোচনা তৈরি করে। সে সময় (১৪ অক্টোবর, ২০১৭) বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেন, প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে যা ঘটেছে, তা সরাসরি বিচার বিভাগের ওপর সরকারের হস্তক্ষেপ।
সর্বোচ্চ আদালতের ওই রায় পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) চেয়ে ২০১৭ সালে আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ। এই আবেদন পর্যবেক্ষণসহ নিষ্পত্তি করে ২০২৪ সালের ২০ অক্টোবর রায় দেন আপিল বিভাগ।
এতে বিচারপতিদের অপসারণের বিষয়টি জাতীয় সংসদের পরিবর্তে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে ফেরার বিধানগুলো পুনর্বহাল হয়।
ডাকা হয়েছিল বঙ্গভবনে
ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের ওপর শুনানি শেষ হয়েছিল ২০১৭ সালের ১ জুন। সেদিন আপিল বিভাগ মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন। ওই বছরের ৩ জুলাই রায় ঘোষণা করেন বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন সাত সদস্যের আপিল বিভাগ।
রায় ঘোষণার আগে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাকে আলোচনার জন্য বঙ্গভবনে চায়ের নিমন্ত্রণে ডাকা হয়েছিল বলে ‘আ ব্রোকেন ড্রিম: রুল অব ল, হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি’ শিরোনামে নিজের লেখা আত্মজীবনীমূলক বইয়ে উল্লেখ করেছেন তিনি।
সুরেন্দ্র কুমার সিনহা প্রথম আলোকে বলেন, ২০১৭ সালের ১ জুলাই সকালে তাঁর ব্যক্তিগত মুঠোফোনে একটি ফোন আসে। যিনি ফোন করেন তিনি নিজেকে রাষ্ট্রপতির (তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ) সামরিক সচিব হিসেবে পরিচয় দিয়ে রাষ্ট্রপতির ইচ্ছা অনুযায়ী সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় তাঁর সঙ্গে চায়ের নিমন্ত্রণে বঙ্গভবনে যাওয়ার অনুরোধ জানান। সামরিক সচিবের কাছ থেকে একটি খুদে বার্তাও পান। সে অনুসারে ২ জুলাই সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে যান। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ছাড়াও সেখানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক (বর্তমানে কারাবন্দী) এবং অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম (প্রয়াত) উপস্থিত ছিলেন।
প্রধান বিচারপতির পদত্যাগ
‘প্রধানমন্ত্রী ষোড়শ সংশোধনীর রায় সংক্রান্ত বিষয়টি উত্থাপন করেন। প্রধানমন্ত্রী অনুরোধ করেছিলেন যেন সরকারের পক্ষে রায় দেওয়া হয়। আমি বলেছিলাম যে আমি সরকারের পক্ষে মতামত দিলেও হাইকোর্টের রায় বাতিল হবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই; কারণ বিষয়টি নিয়ে তাঁরা (নিজে ও আপিল বিভাগের অপর বিচারপতিরা) তখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেননি। রায় ঘোষণার ঠিক আগমুহূর্তেই মতামত প্রকাশ করা হয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী ও অ্যাটর্নি জেনারেল বারবার তাঁর ওপর চাপ সৃষ্টি করছিলেন অন্য বিচারকেরা যদি বিপক্ষে মতামত দিলেও তিনি যেন সরকারের পক্ষে মতামত দেন। তিনি অনড় থাকায় প্রধানমন্ত্রী মেজাজ হারিয়ে ফেলেন’, বলেন সুরেন্দ্র কুমার সিনহা।
বিষয়টি এক পর্যায়ে উত্তপ্ত বিতর্ক পর্যায়ে পৌঁছে বলে উল্লেখ করে এই সাবেক বিচারপতি বলেন, ‘তখন আমি পদত্যাগ করব বলেছিলাম। এ সময় প্রধানমন্ত্রীসহ সবাই পদত্যাগ না করতে অনুরোধ জানান। প্রধানমন্ত্রী বললেন, “ষোড়শ সংশোধনীর বিষয়ে রায়ের আগে পদত্যাগ করলে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে।” অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে পদত্যাগের যে ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলাম, তা থেকে সরে আসি।’

‘ছুটিতে যাওয়া’ ও আলোচনা
২০১৭ সালে অবকাশকালীন ছুটি শেষে সুপ্রিম কোর্টের নিয়মিত কার্যক্রম শুরুর তারিখ ছিল ৩ অক্টোবর। এর ঠিক এক দিন আগে ২ অক্টোবর তিনি এক মাসের ছুটির কথা জানিয়ে রাষ্ট্রপতিকে চিঠি দেন। তাঁর ছুটিকে কেন্দ্র করে তখন পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।
তৎকালীন সরকারের মন্ত্রী বলেন, প্রধান বিচারপতি ছুটি নিয়েছেন শারীরিক সমস্যার কারণ দেখিয়ে। তখন বিএনপি অভিযোগ করে, তাঁকে ‘গৃহবন্দী’ করে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ৫ অক্টোবর ছুটিতে থাকা প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা জনসমক্ষে বের হন।
অসমাপ্ত কাজ শেষ করার জন্য ২০১৭ সালের ২ অক্টোবর সকালে আদালতে যান বলে ‘আ ব্রোকেন ড্রিম: রুল অব ল’ বইয়ে উল্লেখ করেছেন তিনি।
সুরেন্দ্র কুমার সিনহা প্রথম আলোকে বলেন, ‘সেদিন সকাল সাড়ে ১১টার দিকে তাঁর ব্যক্তিগত সচিব তাঁকে জানান ডিজিএফআইয়ের তৎকালীন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. সাইফুল আবেদীন দুপুর ১২টায় তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চান। তিনি তাঁকে আসার অনুমতি দেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ পালন করছেন বলে জানান তিনি (ডিজিএফআইয়ের তৎকালীন মহাপরিচালক)। তিনি (সাইফুল) ২০১৮ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত চার মাসের ছুটিতে যাওয়ার কথা বলেন। তা প্রত্যাখ্যান করি।’
সেদিন বাসায় ফেরার পর গৃহবন্দী হয়ে পড়েন বলে উল্লেখ করেন এই সাবেক প্রধান বিচারপতি।
সে সময় আইন মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল, ‘রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ৯৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার শারীরিক অসুস্থতাজনিত কারণে আগামী ৩ অক্টোবর থেকে ১ নভেম্বর পর্যন্ত ৩০ দিন ছুটি মঞ্জুরের বিষয়ে সানুগ্রহ অনুমোদন প্রদান করেছেন। প্রধান বিচারপতির অসুস্থতাজনিত ছুটি ভোগকালীন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের প্রবীণতম বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞাকে দেশের প্রধান বিচারপতির কার্যভার পালনের দায়িত্ব দিয়েছেন।’

দেশ ছাড়ার সময় বিবৃতি
সরকারের পক্ষ থেকে ‘অসুস্থতাজনিত ছুটির’ কথা বলা হলেও বিদেশ যাওয়ার প্রাক্কালে ২০১৭ সালের ১৩ অক্টোবর রাতে সুরেন্দ্র কুমার সিনহা গণমাধ্যমকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, ‘তিনি অসুস্থ নন, তিনি ভালো আছেন। তিনি একটু বিব্রত।…বিচার বিভাগের স্বার্থে, বিচার বিভাগ যাতে কোনোভাবে কলুষিত না হয়, এ জন্য তিনি সাময়িকভাবে যাচ্ছেন।’
এরপর লিখিত বিবৃতি উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের হস্তান্তর করেন। লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন, তিনি সুস্থ আছেন। ইদানীং একটা রায় নিয়ে রাজনৈতিক মহল, আইনজীবী ও বিশেষভাবে সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী যেভাবে তাঁর সমালোচনা করেছেন, এতে তিনি সত্যিই বিব্রত।
সুরেন্দ্র কুমার সিনহার দেশত্যাগ ব্যাপক আলোচনা তৈরি করে। সে সময় (১৪ অক্টোবর, ২০১৭) বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেন, প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে যা ঘটেছে, তা সরাসরি বিচার বিভাগের ওপর সরকারের হস্তক্ষেপ।
এদিকে সুরেন্দ্র কুমার উল্লেখ করেন, তৎকালীন সরকার দেশত্যাগ করতে তাঁকে বাধ্য করেছিল। তিনি বলেন, ‘মানে এটাকে বলে কন্সপিরেসি (ষড়যন্ত্র), একেবারে কন্সপিরেসি। প্রথমত, ডিজিএফআইকে ব্যবহার করা হয়েছিল।…বিচারক হওয়ার কারণে হয়তো আমাকে আয়না ঘরে নিতে পারেনি। আপিল বিভাগের সহকর্মী বিচারকেরা বঙ্গভবন থেকে ফিরে এসে রাতারাতি আমার সঙ্গে বসবেন (আদালতে) না বলে বললেন।’
যদি না বসেন (তাঁর সঙ্গে একই বেঞ্চে) তাহলে একজন প্রধান বিচারপতির কী আর থাকতে পারে, এমন প্রশ্ন রেখে সাবেক বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেন, ‘অথচ এর কিছুদিন আগে রায় (ষোড়শ সংশোধনী) দিলাম, একসঙ্গে দিলাম। রায়ের পর কী হয়ে গেল?’
সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেন, ‘ডিজিএফআইয়ের তৎকালীন প্রধান বলেছিলেন, “স্যার আপনি থাকতে পারবেন না, আপনাকে দেশের বাইরে যেতে হবে।” ডিজিএফআই ও শেখ হাসিনার চোখ রাঙানি আমি ভয় পাইনি।...ভয় পেয়েছিলাম সহকর্মীদের ভূমিকায়। সহকর্মী বিচারকেরা যেহেতু সহযোগিতা করলেন না, আমি কী আর করব?’
‘নিশ্বাস নিতে পারছিলাম না, একপর্যায়ে দেশের বাইরে এলাম। ১৩ অক্টোবর (২০১৭) দেশ থেকে বের হই’, বলেন সুরেন্দ্র কুমার সিনহা।
মূলত ষোড়শ সংশোধনীর রায়ের প্রেক্ষাপটে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। তিনি বলেন, ‘অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ সরকারের অধীনে। মাসদার হোসেন মামলার রায় হয়েছে, রায় (অধস্তন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলা-সংক্রান্ত বিধিমালা) বাস্তবায়ন হচ্ছিল না। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের নিয়ন্ত্রণ জাতীয় সংসদের অধীনে, মানে নির্বাহীর অধীনে ফিরিয়ে নিতে ষোড়শ সংশোধনী আনা হয়। আমি প্রতিবাদ করলাম। রায় দিয়ে বললাম ষোড়শ সংশোধনী যেটা করেছিল, তা অবৈধ। ওই আমার প্রতি ক্ষোভ—এটাই।’

চাকরির সুবিধাদি পেয়েছেন কি
অর্জিত ছুটি নগদায়ন (ল্যাম্প গ্রান্ট অর্থাৎ ১৮ মাসের মূল্য বেতনের সমপরিমাণ অর্থ) পেয়েছেন বলে জানান সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। তিনি বলেন, ‘১৮ মাসের মধ্যে আগে ১২ মাসের পাওনা অর্থ দিয়েছিল। বাকি ছয় মাস (ল্যাম্প গ্রান্ট) ও পেনশনের জন্য এখান (কানাডা থেকে) থেকে আবেদন করি। ছয় মাসের টাকা দিয়েছে।’
তবে পেনশন দিচ্ছে না অভিযোগ করে সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেন, ‘বলছে কনসাল জেনারেলের কাছ থেকে আমার দস্তখত কাউন্টার সাইন করা লাগবে। আই এম দ্য লাস্ট পারসন, একজন জয়েন্ট সেক্রেটারি পর্যায়ের বা অফিসারের কাছে গিয়ে আমার সিগনেচার কাউন্টার সাইন করব, এটা অপমানজনক।…আমি না খেয়ে মরছি কিন্তু আমি কোনো দিনই ‘বো ডাউন’ (নত হওয়া) করি নাই।’
‘কোনো রেসপন্স পাইনি’
দেশত্যাগের পর সুরেন্দ্র কুমার সিনহার বিরুদ্ধে তিনটি মামলা হয়। এর মধ্যে প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে ফারমার্স ব্যাংকের (বর্তমানে পদ্মা ব্যাংক) চার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা এক মামলায় ২০২১ সালের ৯ নভেম্বর রায় দেন ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৪-এর বিচারক। রায়ে দুটি ধারায় সুরেন্দ্র কুমার সিনহাকে ৭ ও ৪ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
সাবেক বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেন, ‘তিনটি কি না, জানি না। তবে একটি মামলা পড়েছি, যে মামলায় দণ্ড দেওয়া হয়েছে। উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের বাড়ি বিক্রি করে, বিক্রি করা টাকা থেকে চার নম্বর সেক্টরের অ্যাপার্টমেন্ট কিনেছি, যা আয়কর রিটার্নে উল্লেখ করেছি। সম্পূর্ণ সত্য আড়াল করে মনগড়া ওই মামলা সাজানো হয়েছে।’
সাবেক এই প্রধান বিচারপতি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি দেশে ফিরতে চাই। পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেছি, দুই বছরের বেশি হয়ে গেল। কনসাল জেনারেলের কার্যালয়ে রিমাইন্ডার দিয়ে সর্বশেষ ৪ আগস্ট মেইল পাঠিয়ে বললাম—এর কী অবস্থা? কোনো রেসপন্স পাইনি।’
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats