05 August 2026
The News Diplomats
আরাফাত সেতু :
Publish : 02:32 PM, 05 August 2026.
Digital Solutions Ltd

জুলাইয়ের প্রাণ ছিল গান, তার ওপরে আঘাত অশনি সংকেত

জুলাইয়ের প্রাণ ছিল গান, তার ওপরে আঘাত অশনি সংকেত

Publish : 02:32 PM, 05 August 2026.
আরাফাত সেতু :

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে শুধু রাজনৈতিক আন্দোলন হিসেবে দেখলে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আড়ালে থেকে যায়, এর সাংস্কৃতিক শক্তি। কোনো গণআন্দোলন শুধু স্লোগান, মিছিল কিংবা রাজনৈতিক দাবির ওপর ভর করেই চলে না। মানুষের আবেগ, স্বপ্ন এবং আত্মপরিচয়বোধও একে শক্তি জোগায়। জুলাই আন্দোলনও এর ব্যতিক্রম ছিল না। রাজপথে যেমন ছিল জ্বালাময়ী স্লোগান, তেমনি ছিল প্রতিবাদী গান। নতুন প্রজন্মের র‍্যাপ, পুরোনো গণসংগীত এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবাহী গান, সব মিলিয়ে সংগীত হয়ে উঠেছিল আন্দোলনের প্রাণ।

জুলাইয়ের উত্তাল দিনগুলোতে গান কোনো বিনোদনের মাধ্যম ছিল না। এটি ছিল সাহস, ক্ষোভ এবং শোক প্রকাশের ভাষা। যে কথাগুলো সরাসরি বলা কঠিন ছিল, সেগুলোই মানুষ গানের মাধ্যমে আরও শক্তভাবে বলেছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে গানগুলো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কিছু গান ছিল স্লোগানের চেয়েও শক্তিশালী, কেননা সেগুলো মানুষের ব্যক্তিগত অনুভূতিকে সম্মিলিত আবেগের সুতোয় বেঁধে ফেলেছিল।

শহীদ মিনারে হাজারো মানুষের গণসমাবেশের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। সেই ভিডিওতে বাজছিল ‘সকল দেশের রাণী সে যে আমার জন্মভূমি’। এটি শুধু একটি সমাবেশের ভিডিও ছিল না, এটি হয়ে ওঠে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা ও সাংস্কৃতিক জাগরণের এক অনন্য প্রতীক।

একইভাবে সেজানের র‍্যাপ গান ‘কথা ক’ জুলাই আন্দোলনের অনানুষ্ঠানিক থিমসং হয়ে ওঠে। প্রচলিত রাজনৈতিক ভাষার বাইরে গিয়ে এটি তরুণদের ক্ষোভ, হতাশা ও প্রশ্নকে সুরে সুরে তুলে ধরে। হান্নানের ‘আওয়াজ উডা’ও ডিজিটাল প্রজন্মের প্রতিবাদের অন্যতম সাউন্ডট্র্যাকে পরিণত হয়। এসব গান দেখিয়ে দেয়, নতুন প্রজন্মের প্রতিবাদের ভাষা শুধু স্লোগানেই সীমাবদ্ধ নয়, গান, ভিডিও এবং অনলাইন সংস্কৃতিও তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

জুলাইয়ের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল পুরোনো গানগুলোর নতুন করে ফিরে আসা। ‘কারার ওই লৌহকবাট’, ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু দুস্তর পারাবার’ এবং ‘মুক্তির মন্দির সোপান তলে’ নতুন প্রজন্মের কণ্ঠে আবারও জীবন্ত হয়ে ওঠে। একসময় এসব গান ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং নানা ঐতিহাসিক সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত ছিল। জুলাইয়ে এসে তারা নতুন অর্থ পায়। অতীতের ইতিহাস আর বর্তমানের আকাঙ্ক্ষা যেন এক সুতোয় গাঁথা হয়ে যায়।

বিশেষ করে ‘মুক্তির মন্দির সোপান তলে’ গানটির ফিরে আসা ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। এটি শুধু একটি দেশাত্মবোধক গান নয়, স্বাধীনতা, আত্মত্যাগ এবং মুক্তির আকাঙ্ক্ষার সাংস্কৃতিক স্মারকও। জুলাই আন্দোলনে এর পুনরাবির্ভাব দেখিয়েছে, একটি জাতির ঐতিহাসিক গান কখনো হারিয়ে যায় না। প্রয়োজনের সময় সেগুলো নতুন প্রজন্মের কণ্ঠে বারবার ফিরে আসে।

কিন্তু এখানেই তৈরি হয় সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য। যে গান একটি আন্দোলনকে শক্তি দিয়েছিল, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেই গান, সেই শিল্পী এবং সেই সাংস্কৃতিক ধারাগুলোই নানা ধরনের চাপের মুখে পড়েছে, এমন অভিযোগ উঠেছে। ফলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, জুলাইয়ের সাংস্কৃতিক জাগরণ কি ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে?

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের সাংস্কৃতিক পরিসরে বেশ কিছু ঘটনা নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়। মাজার ও খানকায় হামলা, বাউল শিল্পীদের ঘিরে বিতর্ক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বাধা এবং শিল্পীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ, এসব ঘটনা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।

২০২৫ সালের নভেম্বরে রাজধানীর শাহবাগে ‘গানের আর্তনাদ’ নামে একটি কর্মসূচিতে বাউল শিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা অংশ নেন। সেই কর্মসূচিতে বাধা ও ধস্তাধস্তির অভিযোগ ওঠে।

এই সংকটকে শুধু একটি সংগীতধারার সংকট হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রশ্নও। কেননা এই ভূখণ্ডে সংস্কৃতি কখনোই শুধু বিনোদনের বিষয় ছিল না। ভাষা আন্দোলনের গান, মুক্তিযুদ্ধের সংগীত, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পীদের ভূমিকা এবং স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ, সবই প্রমাণ করে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস একে অপরের সঙ্গে কতটা গভীর।

এই কারণেই মুক্তিযুদ্ধের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার নিয়ে যেকোনো টানাপোড়েন গুরুত্বপূর্ণ। মুক্তিযুদ্ধ শুধু একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতার ইতিহাস নয়, এটি সাংস্কৃতিক মুক্তিরও ইতিহাস। যুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গান, কবিতা ও নাটক মানুষের মনোবল জুগিয়েছিল। সেই ঐতিহ্য আজও বাংলাদেশের জাতীয় স্মৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।

৫ আগস্টের পর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, এর প্রতীক, স্মৃতিচিহ্ন এবং সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার নিয়ে যে বিতর্ক ও সংঘাত তৈরি হয়েছে, তা অনেকের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযুদ্ধসংশ্লিষ্ট স্থাপনা, ভাস্কর্য, প্রতীক ও সাংস্কৃতিক উপাদানের ওপর আঘাতের ঘটনাকে অনেকে এই ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারের ওপর চাপ হিসেবে দেখছেন। একটি জাতির ইতিহাস নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে। কিন্তু ইতিহাস ও সংস্কৃতির ওপর আক্রমণ কোনো সমাজের জন্যই ইতিবাচক বার্তা বহন করে না।

সংগীতাঙ্গনের ঘটনাগুলোও একই পরিবর্তিত বাস্তবতার প্রতিফলন। নগরবাউল জেমসের মতো জনপ্রিয় শিল্পীর কয়েকটি কনসার্ট নিরাপত্তা, অনুমতি বা বিশৃঙ্খলার কারণে বাতিল বা স্থগিত হওয়ায় সংগীতপ্রেমীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করে। কারণ জেমস শুধু একজন শিল্পী নন, তিনি বাংলাদেশের রকসংগীতের কয়েক প্রজন্মের কাণ্ডারি। তার গান বহু মানুষের কৈশোর, তারুণ্য ও আবেগের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

বিপরীতে দেশে কাওয়ালি ও সুফি সংগীতের রমরমা আয়োজন নতুন করে দৃশ্যমান হয়েছে। কাওয়ালি উপমহাদেশের সমৃদ্ধ সংগীত ঐতিহ্যেরই অংশ। তাই এর বিকাশ সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের স্বাভাবিক প্রকাশ বটে। কিন্তু উদ্বেগ তৈরি হয় তখনই, যখন একটি সাংস্কৃতিক ধারার উত্থান অন্য একটি ধারার সংকোচনের সঙ্গে মিলে যায়। একটি সুস্থ সমাজে নতুন সংস্কৃতির বিকাশ কখনো অন্য সংস্কৃতির জন্য হুমকি হয়ে ওঠা উচিত নয়।

বাউল সংস্কৃতির ওপর চাপের অভিযোগ এই সংকটকে আরও স্পষ্ট করে। বাউল দর্শনের মূল শক্তি প্রশ্ন করার স্বাধীনতা, মানুষের প্রতি আস্থা এবং সংকীর্ণ পরিচয়ের গণ্ডি অতিক্রম করার চেষ্টা। বাউল শিল্পী আবুল সরকারের গ্রেপ্তার ও মামলা এই বিতর্ককে আরও সামনে নিয়ে আসে। ২০২৫ সালে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তিনি জামিনে মুক্তি পান। এই ঘটনা দেখিয়েছে, লোকজ সংস্কৃতি, ধর্মীয় অনুভূতি এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সীমারেখা নিয়ে বাংলাদেশের সমাজে এখনো গভীর টানাপোড়েন রয়েছে।

মাজার ও খানকার ওপর হামলার ঘটনাগুলোও একই প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। এসব স্থান শুধু ধর্মীয় চর্চার কেন্দ্র নয়, এগুলো আবহমান বাংলার লোকঐতিহ্য, সংগীত এবং সামাজিক মিলনেরও অংশ। বিভিন্ন গবেষণা ও সংবাদ প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের আগস্টের পর বহু স্থানে একাধিক মাজারে হামলার তথ্য উঠে এসেছে। এসব ঘটনা বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সাংস্কৃতিক চরিত্র নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।এগুলো কি কেবল কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনার সমষ্টি, নাকি সংস্কৃতির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার একটি বৃহত্তর প্রবণতার ইঙ্গিত? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আবেগের পাশাপাশি তথ্যের দিকেও তাকাতে হবে। সব ঘটনার পেছনে একই শক্তি কাজ করেছে, এমন প্রমাণ নেই। তবে যদি ধারাবাহিকভাবে শিল্পী, সংগীত, লোকঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলো ভয়ের মুখে পড়ে, তাহলে সেটি অবশ্যই সমাজের জন্য অশনি সংকেত।

সবকিছুর কেন্দ্রে একটি প্রশ্নই বারবার ঘুরপাক খায়, বাংলাদেশ কি তার সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে ধারণ করতে পারবে? নাকি সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও তৈরি হবে গ্রহণযোগ্য ও অগ্রহণযোগ্যতার নতুন দেয়াল?

একটি গণতান্ত্রিক সমাজে ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি সম্মান যেমন জরুরি, তেমনি শিল্পীর স্বাধীনতা, ইতিহাসের বহুমাত্রিক চর্চা এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের সুরক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ গানকে থামিয়ে দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু মানুষের স্মৃতিকে থামানো যায় না। জুলাইয়ের রাজপথে যে গান মানুষকে সাহস দিয়েছিল, মুক্তিযুদ্ধের সময় যে গান মানুষকে লড়াইয়ের শক্তি জুগিয়েছিল, সেই গানগুলো এই জাতির আত্মপরিচয়েরই অংশ।

ইতিহাস বলে, ক্ষমতার পরিবর্তনের পর প্রথম লড়াই অনেক সময় শুরু হয় স্মৃতি ও সংস্কৃতিকে ঘিরে। একটি সমাজ কী গান শুনবে, কোন ইতিহাস মনে রাখবে এবং কোন শিল্পকে সম্মান করবে, এসব প্রশ্নই শেষ পর্যন্ত তার ভবিষ্যৎ পরিচয় নির্ধারণ করে।

আজকের বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা শুধু রাজনৈতিক নয়, সাংস্কৃতিকও। প্রশ্ন হলো, আমরা কি এমন একটি দেশ গড়ে তুলতে পারব, যেখানে ‘মুক্তির মন্দির সোপান তলে’, ‘আওয়াজ উডা’, ‘কথা ক’ এবং বাউলের মানবদরদী গান, সবকিছুই নিজ নিজ জায়গা থেকে সমান মর্যাদায় বেঁচে থাকতে পারবে?

কারণ একটি জাতির স্বাধীনতা শুধু তার ভূখণ্ডে নয়, তার গানেও বেঁচে থাকে।

আরাফাত সেতু: সাংবাদিক, দ্য ডেইলি স্টার

OPINION বিভাগের অন্যান্য খবর

News Diplomats Icon

Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com

The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.

©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats

Develop by _ DigitalSolutions.Ltd
শিরোনাম বিমানবন্দর থেকে সাবেক যুগ্ম সচিব জগলুল পাশা গ্রেপ্তার শিরোনাম মাগুরায় সাকিব আল হাসানের বাড়িতে হামলা শিরোনাম নিয়ন্ত্রণ হারালেন নেইমার: চিৎকার, উসকানি, ব্যঙ্গ শিরোনাম অহেতুক ইস্যু তৈরি করে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে কেউ কেউ: প্রধানমন্ত্রী শিরোনাম জুলাইয়ের প্রাণ ছিল গান, তার ওপরে আঘাত অশনি সংকেত শিরোনাম দেশের বারোটা বাজলে আঙুল চুষবেন না জামায়াত আমির