21 September 2026
The News Diplomats
দুলাল আহমদ চৌধুরী :
Publish : 09:39 AM, 20 September 2026.
Digital Solutions Ltd

ভূ-রাজনীতির নতুন সমীকরণ - ০১

মিলিশিয়া থেকে আঞ্চলিক পরাশক্তি, হুথিদের এক দশকের বিস্ময়কর উত্থান

মিলিশিয়া থেকে আঞ্চলিক পরাশক্তি, হুথিদের এক দশকের বিস্ময়কর উত্থান

Publish : 09:39 AM, 20 September 2026.
দুলাল আহমদ চৌধুরী :

২০১৪ সালে হুথিরা যখন ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করে, তখন তারা ছিল অত্যন্ত অনুপ্রাণিত ও সুসংগঠিত, কিন্তু প্রযুক্তিগত দিক থেকে সাধারণ মানের একটি মিলিশিয়া বাহিনী। তাদের কাছে থাকা সবচেয়ে উন্নত অস্ত্র ছিল রকেট—চালিত গ্রেনেড এবং ট্যাংক—বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র। পরবর্তী এক দশকে হুথিরা ব্যাপক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে উত্তর—পশ্চিম ইয়েমেনে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ সুদৃঢ় করেছে। পাশাপাশি, তারা ক্রমশ আরও উন্নত ও দূরপাল্লার অস্ত্র ব্যবহার করে আঞ্চলিক শক্তি এবং এমনকি যুক্তরাষ্ট্রকেও ধারাবাহিক আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হতে বাধ্য করেছে। বর্তমানে লোহিত সাগরের নৌ—চলাচল পথ ও বিশ্ববাণিজ্যের ওপর হুথিরা অভূতপূর্ব নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে | সম্প্রতি হুথিরা বাব আল—মান্দাব এলাকা ও মায়ুন দ্বীপর নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে | ইয়েমেনের প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রসুলভ ক্ষমতার চর্চা করছে।

হুথিদের ক্রমবর্ধমান সক্ষমতার জবাবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বা বহি:শক্তিগুলো তাদের দীর্ঘদিনের কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে অকার্যকর নীতিগুলোর ওপরই জোর দিয়ে চলেছে: যেমন বিমান হামলার মাধ্যমে গোষ্ঠীটিকে লক্ষ্যবস্তু করা, হুথি ও তাদের সহযোগীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা এবং হুথিদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ইরানের কাছ থেকে অস্ত্র চোরাচালানের (স্মাগলিং) সন্দেহে জাহাজ আটকের অভিযান চালানো।

ইয়েমেনের নিরাপত্তা বাহিনীগুলো মাঝেমধ্যে তাদের আটক অভিযান জোরদার করেছে এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও সম্পদের তীব্র ঘাটতি সত্ত্বেও বেশ কিছু চালান জব্দ করতে সক্ষম হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত হুথিরা এসব পদক্ষেপের মুখে অত্যন্ত দৃঢ় প্রতিরোধ ক্ষমতা দেখিয়েছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বোমাবর্ষণ; হুথি ও ইরানের ওপর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা; হুথি—নিয়ন্ত্রিত বন্দরে প্রবেশকারী বড় জাহাজগুলোর জন্য জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে পর্যবেক্ষণ ও যাচাইকরণ প্রক্রিয়া; আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্থল ও নৌপথে আটক অভিযান; এবং হুথি কর্মকর্তা ও সংগ্রহকারী নেটওয়ার্কগুলোর ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার পাহাড়—এসব সত্ত্বেও গত এক দশকের বেশিরভাগ সময় ধরে ইয়েমেনে বিশাল পরিসরে (শিল্প—কারখানার মতো ব্যাপক মাত্রায়) বিভিন্ন সামগ্রী ও অস্ত্রের সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে। লোহিত সাগর ও ইয়েমেনের এডেন বন্দরে সাম্প্রতিক জব্দ করা চালানগুলো প্রমাণ করে যে, গোষ্ঠীটি বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, কাঁচামাল ও উৎপাদন—সরঞ্জাম আমদানি করছে—অর্থাৎ তারা তাদের কার্যক্রম সংকুচিত করছে না, বরং আরও সম্প্রসারিত করছে।

গণমাধ্যম, নিরাপত্তা বিশ্লেষণ এবং গবেষণা প্রবন্ধ থেকে হুথিদের টিকে থাকার ক্ষমতা, তাদের অস্ত্রভান্ডার এবং স্মাগলিং থেকে সুশৃঙ্খল সরবরাহ ব্যবস্থা সম্পর্কে চমকপ্রদ তথ্য জানা যাচ্ছে প্রতিনিয়ত।

হুথিদের এই টিকে থাকার পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, হুথিরা যেভাবে উন্নত অস্ত্রশস্ত্রের ব্যবস্থা করে, তাকে কেবল ‘অস্ত্র চোরাচালান’ বললে সঠিক বর্ণনা দেওয়া হয় না। ‘কুদ্স ফোর্স’ (ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোর বা আইআরজিসি—র বৈদেশিক শাখা) এবং ‘অ্যাক্সিস অফ রেজিস্ট্যান্স’ বা ‘প্রতিরোধ অক্ষ’—এর অন্যান্য পক্ষের সহায়তায় হুথিরা ইয়েমেনের অভ্যন্তরে একটি ক্রমবর্ধমান দেশীয় সামরিক—শিল্প কাঠামো পরিচালনা করছে। এই গোষ্ঠীটি আমদানিকৃত যন্ত্রাংশ ও কাঁচামাল ব্যবহার করে দূরপাল্লার ড্রোনসহ বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র ব্যবস্থা তৈরি ও মোতায়েন করতে সক্ষম। যদিও হুথিদের সক্ষমতা অর্জনে ইরানের কাছ থেকে পাওয়া কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা ও যন্ত্রাংশ অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে, তবুও তাদের অস্ত্র কর্মসূচিটি মূলত একটি মিশ্র ও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে টিকে আছে। এই ব্যবস্থায় ইয়েমেন জুড়ে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন গোত্রের যোগসাজশে চোরাকারবারি থেকে শুরু করে পূর্ব চীনের রপ্তানি কেন্দ্রগুলোতে কর্মরত ব্যবসায়ীদের মতো নানা ধরনের পক্ষ জড়িত। নানাবিধ চোরাচালান পথ এবং বৈধ বাণিজ্যিক চ্যানেলের মাধ্যমে হুথিদের কাছে অস্ত্র, যন্ত্রাংশ ও কাঁচামাল পৌঁছানো হয়। স্থানীয় বা আন্তর্জাতিক কর্তৃপক্ষ যখন কোনো একটি সরবরাহ পথ বন্ধ করতে সফল হয়, তখন হুথি দ্রুত অন্য পথ ব্যবহার করে সরবরাহ সচল রাখেন; এ সময় তারা জাহাজের মধ্যে পণ্য স্থানান্তর বা স্থলপথের মতো বিষয়গুলোতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনেন। সুযোগ পাওয়া মাত্রই—যেমন ২০২৩ সালে হুথি—নিয়ন্ত্রিত লোহিত সাগরের বন্দরগুলোতে জাহাজ চলাচলের ওপর সৌদি আরব যখন বিধিনিষেধ শিথিল করেছিল—হুথি ও তাদের সমর্থকরা সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে খোলা পথ দিয়ে আরও বেশি পরিমাণে সামরিক সরঞ্জাম পাঠাতে শুরু করে। যেহেতু হুথিরা ক্রমশ 'দ্বৈত—ব্যবহারযোগ্য' (সামরিক ও বেসামরিক উভয় ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতে পারে এমন) সামগ্রী ও কাঁচামাল দিয়ে অস্ত্র তৈরি করছে, তাই তারা তাদের অস্ত্র কর্মসূচির জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামগুলোকে সাধারণ পণ্যবাহী জাহাজ ও কন্টেইনার শিপিং নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিবাহিত বৈধ পণ্যের সাথে মিশিয়ে আনার সুযোগও পায়।

হুথিরা এক জ্ঞান—ভিত্তিক কাঠামোর সক্রিয় অংশীদার হয়ে উঠছে।  প্রচলিত ‘অস্ত্র বিস্তার রোধ’ নীতির যুক্তিকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। ইয়েমেনের ভেতরে ও বাইরে যাতায়াতের মাধ্যমে হুথি কর্মীরা ‘অ্যাক্সিস অফ রেজিস্ট্যান্স’ বা প্রতিরোধ অক্ষের অন্যান্য গোষ্ঠীর সাথে সহযোগিতা করছে। তারা ইরান ও লেবাননে—এবং ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বাশার আল—আসাদের সরকারের পতনের আগে সিরিয়াতেও—প্রশিক্ষণ ও জ্ঞান বিনিময়ের কার্যক্রমে অংশ নেয়। অন্যদিকে, আইআরজিসি (IRGC) ও হিজবুল্লাহর উপদেষ্টারা ইয়েমেনে গিয়ে হুথিদের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও হামলার তদারকি করেন বলে অনেকে দাবি করেন। তাদের সরবরাহ ব্যবস্থার বৈশ্বিক প্রকৃতি এবং হুথি আন্দোলন ও বৃহত্তর ‘অ্যাক্সিস’—এর মধ্যে জ্ঞান ও দক্ষতার বিস্তারের ফলে, কেবল কয়েকজন শীর্ষ নেতা বা উৎপাদন কেন্দ্র ধ্বংস করলেই যে দীর্ঘমেয়াদে এই গোষ্ঠীর সক্ষমতা কমে যাবে—এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা কম। হুথিদের অস্ত্র কর্মসূচি ব্যাহত করার প্রচেষ্টায় তিনটি নিজস্ব সীমাবদ্ধতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। এই সমস্যাগুলো প্রতিটি স্তরেই দৃশ্যমান: আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক অভিযানগুলো মূলত ইরান থেকে সরাসরি অস্ত্র স্থানান্তরের ওপরই সীমাবদ্ধভাবে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে। ইয়েমেন ইস্যুতে আঞ্চলিক শক্তি সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে মতপার্থক্য ও বিরোধ ক্রমশ বাড়ছে। রিয়াদ ও আবুধাবির সহায়তার ওপর নির্ভরশীল ইয়েমেনের নিরাপত্তা বাহিনী প্রায়শই বেতন বকেয়া থাকা এবং সীমিত ও বিতর্কিত কর্তৃত্বের মতো সমস্যার সম্মুখীন হয়। আরেকটি বিষয় হলো ইয়েমেন বিষয়ক নীতি প্রণয়ন কার্যত বন্ধ রাখার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত। হুথিদের সাথে সংক্ষিপ্ত সামরিক সংঘাত ও পরবর্তী যুদ্ধবিরতির (যার শর্তাবলি কখনোই প্রকাশ করা হয়নি) পর, যুক্তরাষ্ট্রের কিছু কর্মকর্তার মতে ট্রাম্প প্রশাসন মনে করে যে চাপের মুখে হুথিরা নতি স্বীকার করেছে এবং তারা আর কোনো হুমকি নয়। এই মূল্যায়নের ভিত্তি হলো একটি আশাবাদী ধারণা—যেখানে মনে করা হচ্ছে যে যুক্তরাষ্ট্র—হুথি যুদ্ধবিরতি, ‘বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন’ (FTO) হিসেবে তালিকাভুক্তকরণ এবং ইসরায়েলি বিমান হামলার হুমকি—আমেরিকার দীর্ঘমেয়াদী সম্পৃক্ততা ছাড়াই হুথিদের নিয়ন্ত্রণে রাখবে। ইউরোপীয় ও আঞ্চলিক শক্তিগুলো হুথিদের কর্মকাণ্ড ও গতিপথ নিয়ে গভীর উদ্বেগ পোষণ করলেও যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা ছাড়া স্বাধীনভাবে কোনো পদক্ষেপ নিতে অক্ষম বোধ করছে।

‘আনসারুল্লাহ’ হলো একটি ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সামরিক আন্দোলন। প্রতিষ্ঠাতা পরিবারের নামানুসারে তারা ‘হুথি’ নামে পরিচিত। ২০০৪ সালে সরকারি বাহিনীর সাথে সংঘর্ষে নিজের ভাই হুসেইন আল—হুথি নিহত হওয়ার পর আব্দুল—মালিক আল—হুথি এই গোষ্ঠীর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। দেশের প্রত্যন্ত উত্তরাঞ্চলে সরকারের সাথে এক দশকের সংঘাতের পর, ২০১৪ সালে হুথিরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করে নেয়। ২০১৪ সালের শেষ ও ২০১৫ সালের শুরুর দিকে তাদের ক্ষমতা দখলের প্রক্রিয়াকে সুসংহত করার প্রচেষ্টা একটি গৃহযুদ্ধের সূত্রপাত ঘটায়; এই যুদ্ধে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের পক্ষে সামরিক হস্তক্ষেপ করে। এক দশকের দীর্ঘ সংঘাতের মধ্য দিয়ে হুথিরা ইয়েমেনের উত্তর—পশ্চিমাঞ্চলে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ সুদৃঢ় করে এবং একটি ক্রমবর্ধমান দমনমূলক ও ধর্মীয় আদর্শ—ভিত্তিক ‘আধা—রাষ্ট্র’  গড়ে তোলে।

পরবর্তি অংশ পড়ুন : ভূ-রাজনীতির নতুন সমীকরণ - ০২

 দুলাল আহমদ চৌধুরী, সম্পাদক প্রকাশক, News Diplomats

www.newsdiplomats.com

ইমেইল: [email protected]

OPINION বিভাগের অন্যান্য খবর

News Diplomats Icon

Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com

The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.

©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats

Develop by _ DigitalSolutions.Ltd
শিরোনাম চুরির দায়ে অভিযুক্ত এম সি একাডেমির শিক্ষক উজ্জল এখনও বরখাস্ত হয়নি! শিরোনাম গাজী নজরুলের কথিত স্ত্রীকে হত্যা না আত্মহত্যা, পুলিশ হেফাজতে প্রথম স্ত্রীসহ এমপি শিরোনাম অপ্রতিম হত্যা: আদালতে ৩ আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি শিরোনাম জাতিসংঘে শান্তিপ্রিয় ও সম্ভাবনাময় বাংলাদেশের বার্তা দেবেন তারেক রহমান শিরোনাম অবরুদ্ধ ইয়েমেন থেকে লোহিত সাগরের নিয়ন্ত্রণ: হুথিদের শক্তির রহস্য কী? শিরোনাম মিলিশিয়া থেকে আঞ্চলিক পরাশক্তি, হুথিদের এক দশকের বিস্ময়কর উত্থান