তাইওয়ান ইস্যুকে প্রায়শই তাইওয়ান প্রণালীতে মর্যাদা ও সার্বভৌমত্ব কেন্দ্রিক আলোচনা হিসেবে তুলে ধরা হয়। কিন্তু বাস্তবে এটি বিশ্বব্যবস্থার ভবিষ্যৎ।
তাইওয়ান বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য করিডোরের ওপর অবস্থিত। এটি উত্তর—পূর্ব এশিয়া এবং বৃহত্তর ইন্দো—প্যাসিফিক অঞ্চলের মধ্যকার সামুদ্রিক প্রবেশদ্বার। হরমুজ প্রণালীর মতোই তাইওয়ান প্রণালী হলো বিশ্ব বাণিজ্যের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক সংযোগস্থল (choke-point)। এর মধ্য দিয়ে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ কন্টেইনারবাহী জাহাজ, জ্বালানি ও উৎপাদিত পণ্য পরিবাহিত হয়। এখানে সামান্য অবরোধ বা সংকট দেখা দিলেও তার প্রভাব বিশ্বের প্রতিটি প্রধান অর্থনীতির ওপর পড়বে। বিষয়টি কেবল চীনের সাথে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি বিশ্ব বাণিজ্যের একটি অপরিহার্য ধমনী বা প্রধান পথ ব্যাহত হওয়ার বিষয়।
তাইওয়ান প্রণালীতে কোনো অবরোধ বা যুদ্ধ কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতিই মন্থর করবে না। এটি সরবরাহ ব্যবস্থাকে (supply chains) খণ্ডিত করবে, কৌশলগত খাতগুলোতে পারস্পরিক বিচ্ছিন্নকরণ বা ‘ডিকাপলিং’—এর প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করবে এবং এমন মুদ্রাস্ফীতিজনিত চাপ সৃষ্টি করবে যা ঋণ ও জনমিতিক পরিবর্তনের কারণে আগে থেকেই চাপে থাকা রাজস্ব ও মুদ্রানীতি ব্যবস্থাকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলবে। বিরোধপূর্ণ জলসীমা থেকে জাহাজ চলাচল ভিন্ন পথে নিতে বাধ্য হলে বা বাধাগ্রস্ত হলে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম আকাশচুম্বী হয়ে উঠবে। একইসাথে, নিষেধাজ্ঞা ও পাল্টা—নিষেধাজ্ঞার ফলে চীন, উন্নত অর্থনীতি এবং ‘গ্লোবাল সাউথ’—এর মধ্যে গড়ে ওঠা নিবিড় বাণিজ্য ও আর্থিক সম্পর্কগুলো ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়বে। কোনো বড় অর্থনীতির দেশই এর প্রভাব থেকে রেহাই পাবে না; এর সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা এশিয়াকেই সামলাতে হবে। তবে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা এবং চীনের চাহিদা ও ঋণের ওপর নির্ভরশীল উন্নয়নশীল দেশগুলোও এর আঁচ পাবে।
বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে তাইওয়ানের ভূমিকা সামষ্টিক অর্থনৈতিক ঝুঁকিগুলোকে আরও বাড়িয়ে তোলে। এটি বিশ্বের শীর্ষ ২০টি বাণিজ্য—প্রধান অর্থনীতির একটি। এর রপ্তানি পণ্যের বড় অংশজুড়ে রয়েছে এমন সব উপাদান যা ডিজিটাল অবকাঠামো, উন্নত উৎপাদন ব্যবস্থা এবং আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে কাজ করে—যেমন সেমিকন্ডাক্টর, ইলেকট্রনিক্স এবং সূক্ষ্ম যন্ত্রাংশ (precision machinery)।
এই দ্বীপের প্রধান প্রতিষ্ঠান 'তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি' (TSMC) বিশ্বের অধিকাংশ সেমিকন্ডাক্টর এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), টেলিযোগাযোগ, যানবাহন, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও অস্ত্রশস্ত্রের মতো ক্ষেত্রে ব্যবহৃত অত্যন্ত উন্নত মানের চিপগুলোর সিংহভাগ উৎপাদন করে থাকে। তাইওয়ানের চিপ উৎপাদনে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটলে তার প্রভাব গাড়ি নির্মাণ থেকে শুরু করে ক্লাউড কম্পিউটিং—বিভিন্ন শিল্পখাতে ছড়িয়ে পড়বে। ফলে আপাতদৃষ্টিতে আঞ্চলিক মনে হওয়া একটি সংকট শেষ পর্যন্ত সামগ্রিক বৈশ্বিক ধাক্কায় রূপ নেবে।
তাইওয়ানের গুরুত্ব কেবল অর্থনৈতিক নয়। তাইওয়ান নিয়ে কোনো সংঘাত কেবল সামরিক দৃঢ়তা বা অর্থনৈতিক সহনশীলতার পরীক্ষাই নেবে না; বরং এটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার আদর্শগত বা নীতিগত ভিত্তির বিষয়টিকেই নতুন করে পর্যালোচনার মুখে ঠেলে দেবে। এখানে একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের প্রশ্ন জড়িত: আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা থেকে তাইওয়ানের চূড়ান্ত বিলুপ্তি, নাকি সার্বভৌমত্বের অধিকারী একটি রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে তার স্বীকৃতি। প্রথম পথটি এমন এক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ধারণাকে সুদৃঢ় করবে যেখানে ক্ষমতার জোরেই বৈধতা নির্ধারিত হয়, যেখানে গণতান্ত্রিক সমাজের রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তির চেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর পছন্দই প্রাধান্য পায় এবং যেখানে ভূখণ্ড ও পরিচিতি—সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির উপায় হিসেবে বলপ্রয়োগ বা জবরদস্তিকে স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে গণ্য করা হয়। অন্যদিকে, দ্বিতীয় পথটি এমন এক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে প্রতিষ্ঠিত করবে যা রাষ্ট্রত্ব ও মানবতার অগ্রগতির ভিত্তি হিসেবে গণতান্ত্রিক সম্মতিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। তাইওয়ানের প্রতি কেমন আচরণ করা হবে, তা কেবল আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রতিফলনই হবে না; বরং তা সক্রিয়ভাবে সেই ব্যবস্থাকে গড়ে তুলবে এবং বিতর্কিত রাজনৈতিক সত্তার মর্যাদা, কর্তৃত্ববাদী সম্প্রসারণের সীমা ও একবিংশ শতাব্দীতে সার্বভৌমত্বের নৈতিক তাৎপর্যের ক্ষেত্রে নতুন নজির স্থাপন করবে।
চীন যদি জোরপূর্বক, সামরিক অভিযানের মাধ্যমে কিংবা কূটনৈতিক কৌশলে তাইওয়ানকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়, তবে ইন্দো—প্যাসিফিক অঞ্চলের কৌশলগত দৃশ্যপট আমূল বদলে যাবে। এর ফলে সামরিক অবস্থান ও আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন আসবে এবং রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ধারাবাহিক নানা প্রভাব বা প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে। এই একত্রীকরণ বেইজিংকে যেমন আরও সাহসী করে তুলতে পারে, তেমনি এর ফলে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নানাবিধ চ্যালেঞ্জও তৈরি হতে পারে।
তাইওয়ানকে দীর্ঘকাল ধরে ‘First Island Chain’ বা দ্বীপপুঞ্জের প্রথম সারির মূল কেন্দ্রবিন্দু এবং বেইজিং ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়ে একটি সম্মুখ ঘাঁটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে আসছে। মার্কিন জেনারেল ডগলাস ম্যাকআর্থার একসময় তাইওয়ানকে ‘ডুববে না এমন এক বিমানবাহী রণতরী ও সাবমেরিন সহায়তা কেন্দ্র’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। এই উক্তিটি দ্বীপটির দীর্ঘস্থায়ী ভৌগোলিক গুরুত্বকেই তুলে ধরে।
তাইওয়ানের নিয়ন্ত্রণ পেলে চীনের কৌশলগত অবস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী হবে। এই দ্বীপে সাবমেরিন, ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এবং নজরদারি অবকাঠামোর জন্য ‘ফরোয়ার্ড বেস’ বা অগ্রবর্তী ঘাঁটি স্থাপন করা সম্ভব হবে, যা বেইজিংয়ের সামরিক কার্যক্রমের আওতা পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের অনেক গভীরে প্রসারিত করবে। গভীর জলের বন্দরে প্রবেশাধিকারের ফলে চীনা সাবমেরিনগুলো সরাসরি ফিলিপাইন সাগরে যেতে পারবে। এতে তাদের চলাচলের পথে আগে যেসব সংকীর্ণ ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পথ (চোক—পয়েন্ট) বাধা সৃষ্টি করত, সেগুলো এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। এছাড়া পানির নিচে সেন্সর এবং ক্ষেপণাস্ত্র ব্যাটারি মোতায়েন করা হলে প্রতিপক্ষের নৌ ও বিমান কার্যক্রমের ওপর নজরদারি চালানোর এবং প্রয়োজনে তা সীমিত করার ক্ষেত্রে চীনের সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।
দ্বীপটির উত্তর, পূর্ব ও দক্ষিণ দিক থেকে আকাশ ও সমুদ্রপথ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আসার ফলে, আঞ্চলিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রধান সামুদ্রিক পথগুলোর ওপর বেইজিং বাড়তি সুবিধা বা নিয়ন্ত্রণ লাভ করবে। এই দখলের ফলে ‘First Island Chain’ বা দ্বীপশৃঙ্খলের যে অংশে তাইওয়ান অবস্থিত, তা চীনের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে সীমাবদ্ধকারী একটি বাধা থেকে পরিবর্তিত হয়ে প্রশান্ত মহাসাগর জুড়ে চীনা শক্তি প্রদর্শনের একটি ঘাঁটিতে পরিণত হবে।
এর তাৎক্ষণিক একটি ফলাফল হবে এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোট ব্যবস্থার ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি হওয়া। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ফিলিপাইনের প্রতি ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়বে। যুক্তরাষ্ট্র হয়তো তাদের গুরুত্বপূর্ণ বিমান ও নৌ—শক্তিকে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ ‘সেকেন্ড আইল্যান্ড চেইন’—এ সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এতে মিত্রদের সন্দেহ আরও বাড়বে এবং আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়বে। দীর্ঘকাল ধরে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামোটি স্নায়ুযুদ্ধের সমাপ্তির পর সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হবে।
জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া—উভয় দেশই যুক্তরাষ্ট্রের ‘এক্সটেন্ডেড ডিটারেন্স’ বা বর্ধিত প্রতিরোধ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। তাই তারা নিজেদের সক্ষমতা জোরদার করার প্রচেষ্টা ত্বরান্বিত করতে পারে। ওয়াশিংটনের অনিশ্চয়তা কীভাবে মিত্র দেশগুলোর ওপর প্রভাব ফেলেছে এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ও পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জনের বিষয়ে বিতর্ককে তীব্র করেছে, তা এক্ষেত্রে লক্ষণীয়।
জাপানের ক্ষেত্রে, গত দুই দশকে আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন দেশটির অবস্থানকে যুদ্ধ—পরবর্তী কঠোর শান্তিবাদী নীতি থেকে সরে এসে আরও ‘স্বাভাবিক’ নিরাপত্তা ভূমিকার দিকে ধাবিত করেছে। প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে, সংবিধানের ব্যাখ্যা আরও বিস্তৃত করা হয়েছে এবং অংশীদার দেশগুলোর সাথে নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার হয়েছে। পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি দক্ষতা ও শিল্প সক্ষমতা জাপানের রয়েছে। তারা চাইলে তা বাস্তবায়ন করতে পারে। যদিও রাজনৈতিক বাধা এখনো বিদ্যমান, তবে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্রমাগত হ্রাস পেলে এ বিষয়ে অভ্যন্তরীণ বিতর্ক আরও তীব্র হতে পারে।
উত্তর কোরিয়ার সুপ্রতিষ্ঠিত পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডারের কারণে দক্ষিণ কোরিয়া আরও তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা সংকটের মুখোমুখি। যুক্তরাষ্ট্রের দৃঢ়তা নিয়ে সন্দেহের জেরে দেশটিতে নিজস্ব পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জনের পক্ষে জনসমর্থন মাঝেমধ্যে প্রবল হয়ে উঠেছে। যদি যুক্তরাষ্ট্রের বর্ধিত প্রতিরোধ ব্যবস্থার নিশ্চয়তা কমে যায়, তবে নিজস্ব পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জনের জন্য সিউলকে ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে পড়তে হতে পারে।
এশিয়ার ছোট রাষ্ট্রগুলোকেও কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে হবে। আসিয়ান (ASEAN)—এর অনেক সদস্য রাষ্ট্রই ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা এবং বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক প্রভাবের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করে আসছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি যদি দুর্বল বলে মনে হয়, তবে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলো নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় চীনের সাথে সমঝোতার পথে ঝুঁকতে পারে। ভৌগোলিকভাবে অরক্ষিত এবং যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হওয়ায় ফিলিপাইন এক্ষেত্রে বিশেষ ঝুঁকির মুখে পড়বে। যুক্তরাষ্ট্র তাদের পরিত্যাগ করছে—এমন ধারণা থেকে দেশগুলো সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে ঝুঁকতে পারে অথবা পুরো অঞ্চলটি চীন—কেন্দ্রিক ব্যবস্থার অধীনে চলে যাওয়ার মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।
বেইজিংয়ের জন্য তাইওয়ানকে নিজেদের অন্তর্ভুক্ত করা মানে হলো পুন:একত্রীকরণের মাধ্যমে শি জিনপিংয়ের ‘জাতীয় পুনরুজ্জীবন’—এর প্রতিশ্রুতি পূরণ করা। একইসাথে এটি এমন এক ধারণাকে শক্তিশালী করবে যে, পশ্চিমা বিশ্বের পতনের বিপরীতে প্রাচ্যের উত্থান ঘটছে। তবে এর জন্য চড়া মূল্যও দিতে হতে পারে। তাইওয়ানের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ একত্রীকরণের ঘোর বিরোধী। ফলে সেখানে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা ও প্রতিরোধের আশঙ্কা থেকে যায়। একটি বিরূপ মনোভাবাপন্ন সমাজকে শাসন করতে বিপুল নিরাপত্তা—সংক্রান্ত সম্পদের প্রয়োজন হবে। বিশেষ করে যদি এই অন্তর্ভুক্তি কোনো ধ্বংসাত্মক সামরিক অভিযানের মাধ্যমে ঘটে, তবে দ্বীপটির গুরুত্বপূর্ণ সেমিকন্ডাক্টর শিল্পসহ অবকাঠামোকে বিধ্বস্ত করে দিতে পারে।
পুনর্গঠন ও নিরাপত্তার পেছনে ব্যয় চীনের আর্থিক সক্ষমতার ওপর চাপ সৃষ্টি করবে; এছাড়া দখলদারিত্ব ও পুনর্গঠনের কাজে সম্পদ সরিয়ে নিলে মূল ভূখণ্ডের জনগণের মনোভাবও বদলে যেতে পারে। শুরুতে জাতীয়তাবাদী উদ্দীপনা প্রবল থাকলেও, দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক ও সামাজিক বোঝা চীনের ওপর জনগণের আস্থাকে ক্ষুণ্ণ করতে পারে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জোরপূর্বক অন্তর্ভুক্তিকরণ বা 'অ্যানেক্সেশন'—এর ফলে চীনকে গুরুতর কূটনৈতিক ও ভাবমূর্তিসংক্রান্ত মাশুল গুনতে হতে পারে। উন্নত অর্থনীতির দেশগুলো—বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র—কর্তৃক আরোপিত নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মুখে পড়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে চীনের। এতে চীনের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক নমনীয়তা বা কৌশলগত স্বাধীনতাকে সংকুচিত করবে। যদিও আঞ্চলিক কোনো কোনো রাষ্ট্র বেইজিংয়ের এই নতুন অবস্থান মেনে নিতে পারে, তবে অন্য দেশগুলো বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে চীনের দীর্ঘমেয়াদী উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে সামাল দিতে নতুন অংশীদারিত্ব ও কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করবে।
রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, জোরপূর্বক তাইওয়ানকে অন্তর্ভুক্ত করাটা পরিস্থিতিকে চরম অস্থিতিশীল করে তুলবে। এটি বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ভূখণ্ড পরিবর্তনের বিরুদ্ধে বিদ্যমান আন্তর্জাতিক রীতিনীতিকে দুর্বল করবে এবং বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থাকে আরও সাহসী করে তুলবে। এই নজিরটি 'রিভিশনিস্ট' বা বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ্য অর্জনে চীন ও রাশিয়ার মধ্যকার সহযোগিতাকে আরও জোরদার করতে পারে—বিশেষ করে যদি পূর্ব ও দক্ষিণ—পূর্ব এশিয়া এবং পূর্ব ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রজোটগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে মনে করা হয়।
সামরিক দিক থেকে, তাইওয়ানের পতন এশিয়ায় চীনের আধিপত্য সুনিশ্চিত করবে; বিশেষ করে যদি তারা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপ প্রতিহত বা পরাজিত করতে সক্ষম হয়। দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ বেইজিংকে দক্ষিণ ও পূর্ব চীন সাগরে চাপ আরও বাড়ানোর সুযোগ করে দেবে, যার ফলে সেনকাকু দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাবে এবং ফিলিপাইনের জন্য সৃষ্ট চ্যালেঞ্জ আরও ঘনীভূত হবে। তাইওয়ানের নিয়ন্ত্রণ হারানো পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সামুদ্রিক ভূ—রাজনীতিকে আমূল বদলে দেবে; এর ফলে বেইজিং 'গ্রে—জোন অপারেশন' (সরাসরি যুদ্ধ নয় এমন কৌশলগত তৎপরতা) পরিচালনা এবং নিজেদের নিকটবর্তী সমুদ্রসীমার বাইরেও প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে নতুন সুবিধা পাবে।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, জোরপূর্বক অন্তর্ভুক্তিকরণ চীনকে তাৎক্ষণিক কৌশলগত ও সামরিক সুবিধা দিলেও, এর জন্য তাদের বিপুল অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মূল্য দিতে হবে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ণ করবে, আঞ্চলিক সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রতিযোগিতাকে উসকে দেবে এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোকে তাদের নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি পুনর্বিন্যাস করতে বাধ্য করবে। এর ফলে ইন্দো—প্যাসিফিক অঞ্চলের ভারসাম্য বেইজিংয়ের অনুকূলে ঝুঁকে পড়বে ঠিকই, কিন্তু তা দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতার বিনিময়ে এবং সম্ভবত খোদ চীনের জন্যই বড় কোনো ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
তাইওয়ান প্রণালীতে স্থিতাবস্থা বজায় রাখা অপরিহার্য। কেবল তাইওয়ানের স্বায়ত্তশাসন রক্ষার জন্যই নয়, বরং ইন্দো—প্যাসিফিক অঞ্চলের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং সেই আন্তর্জাতিক রীতিনীতিগুলো সমুন্নত রাখার জন্যও, যা কয়েক দশক ধরে এই অঞ্চলে শান্তি ও সমৃদ্ধির ভিত্তি হিসেবে কাজ করে আসছে।
দুলাল আহমদ চৌধুরী, সম্পাদক ও প্রকাশক, News Diplomats
www.newsdiplomats.com
ইমেইল: [email protected]
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats