(ভূ-রাজনীতির নতুন সমীকরণ – ০১ এর পরবর্তি অংশ)
হুথিদের ক্ষমতার উত্থানের মূলে রয়েছে তাদের বিশাল এক অস্ত্রভাণ্ডার। শুরুতে অভ্যন্তরীণ শক্তি অর্জনের ক্ষেত্রে তারা ছোট ও হালকা অস্ত্রের এমন এক নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের ওপর নির্ভর করেছিল, যা দিয়ে ইউরোপের কোনো কোনো দেশের সেনাবাহিনীর প্রয়োজনও মেটানো সম্ভব হতো। বর্তমানে গোষ্ঠীটি দাবি করে যে তাদের ১১ লাখেরও বেশি সশস্ত্র সদস্য রয়েছে; যদিও পশ্চিমা সামরিক পর্যবেক্ষকদের মতে, তারা বড়জোর এর এক—তৃতীয়াংশ থেকে অর্ধেক সংখ্যক সদস্যকে যুদ্ধের জন্য মাঠে নামাতে সক্ষম। ২০১৫ সাল থেকে আন্তর্জাতিক নৌ—বাহিনী হুথিদের উদ্দেশ্যে পাঠানো প্রায় ৪০,০০০ থেকে ৫০,০০০ অ্যাসল্ট রাইফেল, রকেট লঞ্চার ও অন্যান্য অস্ত্রের পাশাপাশি ২০ লাখেরও বেশি রাউন্ড গোলাবারুদ জব্দ করেছে। বস্তুত, হুথি—নিয়ন্ত্রিত এলাকায় এখন বন্দুক ও গোলাবারুদ এতটাই সহজলভ্য যে, গোষ্ঠীটি ও তাদের সহযোগীরা মুনাফার আশায় সোমালিয়া এবং ইয়েমেন সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় অস্ত্র পাচার করছে বলে জানা গেছে। হুথিদের আন্ত:সীমান্ত শক্তি প্রদর্শনের ক্ষেত্রে অত্যাধুনিক অস্ত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ২০২৩ সালের শেষভাগে লোহিত সাগরে চলাচলকারী জাহাজ ও ইসরায়েলের ওপর হামলা শুরুর অনেক আগে থেকেই সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভূখণ্ডে হুথিদের চালানো আন্ত:সীমান্ত হামলাগুলো উপসাগরীয় এই দুটি রাষ্ট্রকে ইয়েমেন যুদ্ধ থেকে সরে আসার পথ খুঁজতে বাধ্য করেছিল। এরপর ২০২৫ সালে লোহিত সাগরে গোষ্ঠীটি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সংঘাতে জড়ায়—যেখানে তারা এই পরাশক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কার্যত এক অচলাবস্থা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল—এবং মার্কিন যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশপথ ও জলপথের ড্রোন দিয়ে হামলা চালায়। হুথিদের হামলার মুখে মার্কিন নৌবাহিনীর কৌশলী ও দ্রুত সরে যাওয়ার প্রচেষ্টার সময় দুটি এফ—১৮ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়ে হারিয়ে যায়। এই ক্ষয়ক্ষতিগুলো মার্কিন অভিযানের বস্তুগত ও আর্থিক ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালের মে মাসে যুদ্ধবিরতির পথ প্রশস্ত করে। ২০১৫ সাল থেকে হুথিরা তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা থেকে ২,০০০ কিলোমিটার (ক্ষেপণাস্ত্রের ক্ষেত্রে) থেকে ২,৬০০ কিলোমিটার (আকাশপথে চালিত ড্রোনের ক্ষেত্রে) দূরত্বের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার জন্য বিভিন্ন ধরনের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, ভূমি—থেকে—আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র, রকেট, ড্রোন (চালকবিহীন আকাশযান বা ইউএভি) এবং সমুদ্র—ভিত্তিক ড্রোন (চালকবিহীন নৌকা বা ইউএসভি) ব্যবহার করে আসছে। রক্ষণশীল হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধের পুরো সময়কালে গোষ্ঠীটি মোট ১,৮০০—এরও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
হুথিরা বিপুল পরিমাণ ল্যান্ডমাইন বা স্থলমাইনও মজুদ করেছে, যা তাদের তুলনামূলকভাবে কম সংখ্যক সৈন্য দিয়ে বিশাল এলাকা রক্ষা করতে সহায়তা করে। তারা বিপুল পরিমাণে ল্যান্ডমাইন এবং ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) বা হাতে তৈরি বিস্ফোরক যন্ত্র সংযোজন, উৎপাদন ও মোতায়েন করে থাকে। ২০১৫ সাল থেকে, একটিমাত্র মাইন অপসারণকারী সংস্থা ইয়েমেন জুড়ে বিভিন্ন স্থান থেকে প্রায় ৪,৬০,০০০ ল্যান্ডমাইন, আইইডি এবং অবিস্ফোরিত বিস্ফোরক সামগ্রী অপসারণ করেছে। এই সংখ্যাটি যুদ্ধের আগে ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর কাছে থাকা মজুদের চেয়ে অনেক বেশি এবং ধারণা করা হয় যে, হুথিরা যেসব বিস্ফোরক পুঁতে রেখেছে, এটি তার সামান্য একটি অংশ মাত্র। ২০২২ সালে সিরিয়া ও ইউক্রেনের পর ল্যান্ডমাইনের কারণে হতাহতের ঘটনায় ইয়েমেন বিশ্বে তৃতীয় স্থানে ছিল। হুথিরা যেসব অস্ত্র ব্যবস্থা ব্যবহার করে, তার অধিকাংশই যুদ্ধের আগে ইয়েমেনে ছিল না।
ল্যান্ডমাইন, ছোট আগ্নেয়াস্ত্র এবং অত্যাধুনিক অস্ত্রের বিশাল মজুদ গোষ্ঠীটিকে দেশের ভেতরে ভূখণ্ড দখল করতে এবং দেশের বাইরে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করতে সক্ষম করেছে।
২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর এক ভাষণে হুথি নেতা আব্দুল—মালিক আল—হুথি ঘোষণা করেন যে, ইয়েমেন "সামরিক সক্ষমতার ক্ষেত্রে এক অভূতপূর্ব পর্যায়ে" পৌঁছেছে। তিনি দাবি করেন, যুদ্ধ—সরঞ্জাম উৎপাদন ও সামরিক শিল্পের ক্ষেত্রে—পিস্তল থেকে শুরু করে কালাশনিকভ রাইফেল, কামান, স্নাইপার রাইফেল, চালকবিহীন বিমান (ড্রোন) এবং বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র—আরব রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ইয়েমেন এখন শীর্ষস্থানে রয়েছে। যদিও আব্দুল—মালিক আল—হুথি তাঁর গোষ্ঠীর সক্ষমতা অতিরঞ্জিত করে তুলে ধরেছিলেন—এবং ইরানের ওপর তাদের অব্যাহত নির্ভরতার বিষয়টি উল্লেখ করেননি—তবুও তাঁর দাবিটি আপাতদৃষ্টিতে যতটা অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে, বাস্তবে তা ততটা অবাস্তব ছিল না। বিভিন্ন প্রতিবেদনে ওঠে এসেছে কীভাবে এই গোষ্ঠীটি কেবল অস্ত্র গ্রহণকারী পর্যায় থেকে বেরিয়ে এসে নিজস্ব সামরিক—শিল্প কাঠামো পরিচালনার পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে—অর্থাৎ চোরাকারবারির ভূমিকা থেকে সুশৃঙ্খল সরবরাহ ব্যবস্থার মালিক হয়ে উঠেছে। যুদ্ধের পুরো সময়জুড়ে হুথিদের প্রতিপক্ষরা তাদের সামরিক সক্ষমতাকে মূলত ইরানি চোরাচালানকৃত অস্ত্রের ফসল হিসেবেই চিহ্নিত করে এসেছে। এই দাবিটি আংশিক সত্য হলেও, হুথি, ইরানের কুদস ফোর্স এবং বৃহত্তর ‘অ্যাক্সিস অফ রেজিস্ট্যান্স’ বা ‘প্রতিরোধ অক্ষ’—এর মধ্যকার ক্রমবিকাশমান সম্পর্ক—পাশাপাশি হুথিদের নিজস্ব রূপান্তরের বিষয়টি—এতে সঠিকভাবে অনুধাবন করা হয়নি।
হুথিরা তাদের প্রতিপক্ষের জন্য উদ্বেগজনক নজির স্থাপন করে চলেছে। ইরানের সহায়তায় তারা এখন বৈশ্বিক নৌ—চলাচলের পথগুলোর ওপর উল্লেখযোগ্য নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখছে এবং ইয়েমেনের সীমানা ছাড়িয়ে অনেক দূর পর্যন্ত নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের সক্ষমতা অর্জন করেছে; পাশাপাশি ইয়েমেনের অভ্যন্তরে প্রতিপক্ষ গোষ্ঠী ও সাধারণ নাগরিকদের ওপর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধনের ক্ষমতাও তাদের রয়েছে। গাজায় যুদ্ধবিরতির ফলে গোষ্ঠীটির লোহিত সাগরকেন্দ্রিক অভিযান সাময়িকভাবে থমকে গিয়েছিল। তবে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতার পাশাপাশি তাদের আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও আদর্শিক উদ্দীপনা অব্যাহত থাকবে বলে অনেক বিশ্লেষকের অভিমত। হুথিরা যে আন্তঃসীমান্ত হামলার জন্য নতুন কোনো অজুহাত খুঁজে বের করবে, তা কেবল সময়ের ব্যাপার। হুথিদের এই ব্যাপক পরিচিতি মস্কোর আগ্রহও আকর্ষণ করেছে বলে শোনা যায়; এমনকি সোমালিয়া ও পূর্ব আফ্রিকার অন্যান্য অঞ্চলের উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর সাথে তাদের যোগাযোগের পথও হয়তো এর ফলে তৈরি হয়েছে।
ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যকার পারস্পরিক সমীকরণ একটি চরমভাবে বিভক্ত সমাজের চিত্র তুলে ধরে। সেখানে রাজনৈতিক ও গোত্রগত সম্পর্কের সাথে আঞ্চলিক ও ধর্মীয় পরিচয়ের জটিল সম্পর্কের উদ্ভব ঘটেছে। হুথি আন্দোলনকে এই বিভাজনের কারণ ও লক্ষণ—উভয় হিসেবেই দেখা যেতে পারে। ঐতিহাসিক ক্ষোভ, আর্থ—সামাজিক বৈষম্য এবং রাজনৈতিক বঞ্চনা দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতকে উসকে দিয়েছে। প্রাক্তন মিত্রদের শত্রুতে পরিণত হওয়ার মতো ঘটনা এবং বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল জোট ও সংঘাত ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির জটিলতা ও অস্থিতিশীলতাকেই নির্দেশ করে। ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার সমাধান কেবল দেশটির স্থিতিশীলতার জন্যই নয়, বরং এই সংঘাতের ফলে সৃষ্ট বৃহত্তর আঞ্চলিক প্রভাব প্রশমনের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইয়েমেন সংকটে আঞ্চলিক সম্পৃক্ততা মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব ও আধিপত্য বিস্তারের এক বৃহত্তর লড়াইয়েরই ইঙ্গিত দেয়। প্রধান বহিরাগত পক্ষ হিসেবে সৌদি আরব ও ইরান তাদের ভূ—রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার দৃষ্টিকোণ থেকেই এই যুদ্ধকে দেখে। তারা একে অপরের প্রভাবকে ভারসাম্যপূর্ণ রাখার পাশাপাশি নিজেদের কৌশলগত অবস্থান সুদৃঢ় করার চেষ্টা করছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তি এবং এমনকি রাষ্ট্র—বহির্ভূত গোষ্ঠীগুলোও ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে মতাদর্শ প্রচারের মতো বিভিন্ন কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনে তৎপর। এই বহিরাগত হস্তক্ষেপ যুদ্ধকে আরও তীব্র করে তুলেছে। ইয়েমেনকে এক 'প্রক্সি' বা পরোক্ষ যুদ্ধের ময়দানে পরিণত করেছে, যার ফলে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বা বহি:শক্তির বিভিন্ন পদক্ষেপ এবং ভূ—রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ইয়েমেনের সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করেছে। এর ফলে এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে এবং পুরো অঞ্চল অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা যেমন রক্তপাত বাড়িয়েছে, তেমনি শান্তির সম্ভাবনাকেও জটিল করে তুলেছে। অন্যদিকে, চীনের সম্পৃক্ততা বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে তাদের আগ্রহেরই প্রতিফলন। এসব পদক্ষেপের পেছনে রয়েছে নানাবিধ ভূ—রাজনৈতিক, সাম্প্রদায়িক ও অর্থনৈতিক লক্ষ্য, যা ইয়েমেনকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর জন্য এক দাবার বোর্ডে পরিণত করেছে। এর ফলে সৃষ্ট ক্ষমতার শূন্যতা, শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতা এবং মানবিক বিপর্যয়—এসবই এ ধরনের ভূ—রাজনৈতিক সংঘাতের ভয়াবহ পরিণতির ওপর আলোকপাত করে।
দুলাল আহমদ চৌধুরী, সম্পাদক ও প্রকাশক, News Diplomats
www.newsdiplomats.com
ইমেইল: [email protected]
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats