প্রায় ১০ মাস আত্মগোপনে থাকার পর সম্প্রতি বিভিন্ন মাধ্যমে তদবির চালিয়ে বেতন-ভাতা উত্তোলন ও পুনরায় কর্মস্থলে ফেরার মরিয়া চেষ্টা
সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী সরকারি এমসি একাডেমি স্কুল অ্যান্ড কলেজের সহকারী শিক্ষক (ভৌত বিজ্ঞান) উজ্জ্বল কুমার বিশ্বাসের বিরুদ্ধে উঠেছে নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও চুরির অভিযোগ। দোকানে পণ্য চুরির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর সস্ত্রীক আত্মগোপনে যান তিনি। তবে দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকার পর সম্প্রতি বিভিন্ন মাধ্যমে তদবির চালিয়ে পুনরায় কর্মস্থলে ফেরার মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন বিতর্কিত এই শিক্ষক। এতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
গোলাপগঞ্জ উপজেলার সরকারি এমসি একাডেমি স্কুল অ্যান্ড কলেজের খেলার মাঠের উত্তর-পূর্ব দিকে সিলেট-জকিগঞ্জ সড়কের পাশে ব্যবসায়ী এমরান আহমদ জসিমের একটি মুদি দোকান রয়েছে। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরের শুরুতে দোকান মালিক লক্ষ্য করেন যে, তাঁর দোকান থেকে প্রতিনিয়ত দামি ভোগ্যপণ্য গায়েব হয়ে যাচ্ছে। সন্দেহভাজনদের ওপর নজর রাখার একপর্যায়ে গত বছরের ৪ ডিসেম্বর গোপন সিসিটিভি/ভিডিও ফুটেজে ধরা পড়ে এক ব্যক্তির অভিনব উপায়ে পণ্য চুরির দৃশ্য। পরে দেখা যায়, নিয়মিত ক্রেতার আড়ালে চুরি করা সেই ব্যক্তি আর কেউ নন, ওই প্রতিষ্ঠানেরই সহকারী শিক্ষক উজ্জ্বল কুমার।
উল্লেখ্য, মাগুরা জেলার শ্রীপুরের সুনীল কুমার বিশ্বাসের ছেলে উজ্জ্বল কুমার এবং তাঁর স্ত্রী স্বপ্না রানী বিশ্বাস (সহকারী শিক্ষক, সামাজিক বিজ্ঞান) ২০১৪ সালের ৪ জানুয়ারি একই দিনে সরকারি এমসি একাডেমিতে যোগদান করেন।
তেল চুরির লিখিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে গত বছরের ৭ ডিসেম্বর ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। তদন্তে চুরির অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয়। পরে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) সিলেট অঞ্চলের তৎকালীন আঞ্চলিক উপ-পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) আবু সাঈদ মো. আবদুল ওয়াদুদ স্বাক্ষরিত প্রতিবেদনে বিষয়টি মহাপরিচালককে অবহিত করা হয়। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সাময়িকভাবে তাঁর বেতন-ভাতা স্থগিত করা ছাড়া এখন পর্যন্ত বড় কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।
উজ্জ্বল কুমারে বিরুদ্ধে শিক্ষকতার আড়ালে একাদিক অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার লিখিত অভিযোগ রয়েছে। জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের কাছে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের দেওয়া স্মারকলিপি থেকে তাঁর বিরুদ্ধে নিম্নোক্ত গুরুতর অভিযোগগুলো জানা যায়:
ধার্মিকতা ও মূল্যবোধে আঘাত: ক্লাসরুমে শিক্ষার্থী ও ধর্মীয় রীতিনীতি (যেমন: টুপি, দাড়ি ও ইসলাম ধর্ম) নিয়ে অশালীন মন্তব্য করা।
প্রশ্নপত্র ফাঁস ও দুর্নীতি: টাকার বিনিময়ে অভ্যন্তরীণ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস এবং সিক্সের ভর্তি বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ।
বৈষম্যমূলক আচরণ: প্রাইভেট না পড়া শিক্ষার্থীদের প্রতি হিংসাত্মক আচরণ এবং খাতা মূল্যায়নে বৈষম্য করা।
যৌন হয়রানি ও অশালীন আচরণ: প্রাইভেট কোচিংয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে যৌন হয়রানির অভিযোগ।
ছোটখাটো চুরি ও দুর্নীতি: টিচার্স কমন রুম থেকে সহকর্মীদের বই ও প্রকাশনা সংস্থার বিনামূল্যের বই চুরি করে বিক্রি করা, উত্তরপত্রের অব্যবহৃত কাগজ বাসায় নিয়ে যাওয়া এবং বাজারের কেনাকাটার টাকা না দিয়ে কেটে পড়া।
চুরির ভিডিও ফাঁসের পরপরই ওই শিক্ষক সস্ত্রীক এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যান। তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করে শিক্ষার্থীরা। কিছুদিন আগে তিনি লুকিয়ে বিদ্যালয়ে যোগ দিতে এলে শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন।
সম্প্রতি মাউশি মহাপরিচালক বরাবর আবেদন এবং একটি বিশ্বস্ত হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও অভিভাবকদের প্রভাবিত করে স্বপদে ফেরার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। অভিযোগে জানা যায়, সহকর্মী এক শিক্ষকের সহায়তায় এবং শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করে তিনি রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের পথ খুঁজছেন।
গোলাপগঞ্জ পৌর ছাত্রদলের আহ্বায়ক ও সামাজিক সংগঠন ঐক্য পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি তারেক চৌধুরী বলেন, "ঘটনাটি আমাদের সংসদ সদস্য এমরান চৌধুরীও অবগত আছেন। এ ধরনের নৈতিক স্খলনজনিত শিক্ষক পুনরায় বহাল হলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে আমরা কঠোর আন্দোলনে নামব।"
প্রতিষ্ঠানের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের অধ্যাপক ড. শফিকুর রহমান চৌধুরী বলেন, "এমসি একাডেমি একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান। অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণিত হলে সরকারের উচিত দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া।"
অভিযোগের বিষয়ে জানতে উজ্জ্বল কুমারে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান এবং সামনাসামনি কথা বলবেন বলে জানান।
সরকারি এমসি একাডেমি স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ভানুজ কান্তি ভট্টাচার্য্য বলেন, "প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষায় আমরা সচেতন। দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকায় তাঁর বেতন-ভাতা বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে কোনো শিক্ষককে বহিষ্কার বা চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার মন্ত্রণালয়ের, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের নয়।"
এমসি একাডেমির সাবেক গভর্নিং বডি সদস্য ও দৈনিক মানবকণ্ঠের সাবেক সম্পাদক দুলাল আহমদ চৌধুরী এই প্রতিবেদককে বলেন, এমসি একাডেমি স্কুল ও কলেজ সিলেট বিভাগের গোলাপগঞ্জের এক চিরউজ্জ্বল ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। যুগের পর যুগ ধরে এই প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছে অগণিত গুণীজন। এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের একজন প্রাক্তন শিক্ষার্থী হতে পেরে আমি অত্যন্ত গর্বিত। শুধু শিক্ষার্থী হিসেবেই নয়, ১৯৯৭ সাল থেকে ২০১৮ সাল (প্রতিষ্ঠানটি সরকারি হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত) টানা প্রায় ২২ বছর আমি এই প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি।
একটি কথা আমি অত্যন্ত গর্ব ও দৃপ্ত কণ্ঠে বলতে পারি—এমসি একাডেমির শিক্ষক, শিক্ষার্থী, পরিচালনা পর্ষদ, অভিভাবক এবং সর্বস্তরের গোলাপগঞ্জবাসী কখনও প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা, শিক্ষার মান এবং মর্যাদার প্রশ্নে বিন্দুমাত্র আপস করেননি।
কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, প্রায় ১০ মাস আগে এই প্রতিষ্ঠানের উজ্জল কুমার বিশ্বাস নামক এক শিক্ষকের একটি দোকানে চুরির দৃশ্য সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়ে। ঘটনাটি প্রকাশিত হওয়ার পর সবার মাথা হেট হয়ে যায়। চুরির বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই তিনি কর্মস্থলে অনুপস্থিত। পরবর্তীতে জানতে পারি, এই শিক্ষকের স্ত্রীও একই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। বিষয়টি জানার পর আমি ব্যক্তিগতভাবে জেলা ও বিভাগীয় শিক্ষা কর্মকর্তা, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) পরিচালক (মাধ্যমিক) এবং মহাপরিচালকের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করি। তাঁরা সকলেই অপরাধীর বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন।
প্রায় ১০ মাস ধরে বিনা নোটিশে অনুপস্থিত থাকা এই ব্যক্তি নাকি পুনরায় এমসি একাডেমিতে শিক্ষক হিসেবে যোগদানের অপচেষ্টা চালাচ্ছেন! এমনকি কিছু সরকারি কর্মকর্তা তাকে মদদ দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে, যা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম উত্তেজনা ও তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই—একটি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকেরা কীভাবে সিসিটিভি ফুটেজে স্পষ্ট ধরা পড়া একজন চোরের সাথে একই কমনরুমে বসবেন? আমাদের কোমলমতি সন্তানরা কি একজন চোরের কাছ থেকে নৈতিকতার শিক্ষা নেবে? যে শিক্ষকের চুরির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল, তাঁর সামনে বসে শিক্ষার্থীরা কোন মানসিকতায় পাঠ গ্রহণ করবে?
অতএব, যারা এই বিতর্কিত শিক্ষককে পুনরায় এমসি একাডেমিতে পুনর্বাসনের চক্রান্ত করছেন, তাদের প্রতি আহ্বান—অবিলম্বে এই হীন চেষ্টা বন্ধ করুন এবং তাঁকে চাকরি থেকে চূড়ান্তভাবে বরখাস্ত করুন। শিক্ষকতার মতো মহান পেশায় অন্তত কোনো চোরের স্থান হতে পারে না।
এর পরও যদি উজ্জল কুমারকে জোরপূর্বক ফিরিয়ে আনা হয় এবং ফলে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তবে তার পূর্ণ দায়ভার এই মদদদাতাদেরই বহন করতে হবে। আর যদি প্রশাসনিক কারও তাঁর প্রতি 'অতি অনুকম্পা' থাকে, তবে তাঁকে ও তাঁর স্ত্রীকে বদলি করে অন্য কোথাও নিয়ে যান। কারণ, শুধু চোর শিক্ষকই নন, চোরের স্ত্রীর মুখোমুখি বসে ক্লাস করাও শিক্ষার্থীদের জন্য সমানভাবে অস্বস্তিকর ও বিব্রতকর।
উচ্চপদস্থ কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানাচ্ছি, অনতিবিলম্বে ওই বিতর্কিত শিক্ষককে বরখাস্ত করে প্রতিষ্ঠানের সুদীর্ঘ ঐতিহ্য ও শৃঙ্খলা রক্ষা করা হোক।"
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats