জাতিসংঘ আজ অপ্রাসঙ্গিক কি না- এই প্রশ্নের উত্তর একই সঙ্গে হ্যাঁ এবং না।
হ্যাঁ, কারণ যদি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের ইরানবিরোধী হামলা থেকে তৈরি হওয়া মধ্যপ্রাচ্য সংকটকে প্রাসঙ্গিকতার পরীক্ষা ধরা হয়, তাহলে জাতিসংঘ সেই পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে। আবার না, কারণ আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার বাইরে জাতিসংঘ এখনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে গাজায় ফিলিস্তিনিদের জন্য মানবিক সহায়তার কথা বলা যায়, যেখানে ইসরাইলি বাধা সত্ত্বেও জাতিসংঘের জীবনরক্ষাকারী সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দশকের পর দশক ধরে জাতিসংঘ অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন এগিয়ে নেয়া, মানবিক সংকটে প্রথম সাড়া দেয়া, শরণার্থীদের সহায়তা, শিশু অধিকার রক্ষা এবং মানবাধিকার থেকে জলবায়ু পরিবর্তন পর্যন্ত নানা বিষয়ে বৈশ্বিক মানদণ্ড তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। জাতিসংঘের অধিকাংশ বিশেষায়িত সংস্থা নানা ক্ষেত্রে অসাধারণ কাজ করছে। কার্যকর কর্মকাণ্ডের বহু ক্ষেত্রেই জাতিসংঘ এখনও অপরিহার্য।
তবে শান্তি ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রেই জাতিসংঘের কার্যকারিতা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বজুড়ে মানুষ ও সরকার এই জায়গাতেই সংস্থাটির মূল্য ও বৈধতা বিচার করে। আর এখানেই জাতিসংঘ সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে পড়েছে।
আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার প্রধান দায়িত্ব জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ওপর বর্তায়। তাদের কাজ সংঘাত প্রতিরোধ, যুদ্ধ বন্ধ এবং বৈশ্বিক শান্তি বজায় রাখা। কিন্তু এই দায়িত্ব পালনের ক্ষমতা নির্ভর করে পরিষদের পাঁচ ভেটোক্ষমতাসম্পন্ন স্থায়ী সদস্যের ওপর।যখন এই পাঁচ শক্তিধর দেশের স্বার্থের সংঘাত তৈরি হয়, তখন নিরাপত্তা পরিষদ কার্যত অচল হয়ে পড়ে। বাস্তববাদী রাজনীতির সমর্থকরা বলেন, জাতিসংঘ সনদ যা-ই বলুক, পরিষদের কাঠামো এমনভাবে গড়া হয়েছিল যাতে শুধু সেই যুদ্ধ ঠেকানো হয় যেখানে স্থায়ী সদস্যদের স্বার্থ জড়িত নয়। কিন্তু তাদের স্বার্থ জড়িত থাকলে পরিষদ নীরব থাকে। এর ভয়াবহ পরিণতিও স্পষ্ট।
গাজায় ইসরাইলের গণহত্যামূলক যুদ্ধে নিরাপত্তা পরিষদের অচলাবস্থা পরিষ্কারভাবে দেখা গেছে, যখন যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবগুলো বারবার যুক্তরাষ্ট্র ভেটো দেয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প পরে বোর্ড অব পিস নামে একটি নতুন উদ্যোগ গঠন করেন, যা গাজাসহ অন্যান্য সংঘাতের জন্য নিরাপত্তা পরিষদের বিকল্প হিসেবে তুলে ধরা হয়। ট্রাম্প বহুপাক্ষিকতাকে সার্বভৌমত্বের আত্মসমর্পণ হিসেবে চিত্রিত করেন।
কিন্তু জাতিসংঘকে ‘অকার্যকর’, ‘সেকেলে’ ও ‘নিষ্প্রভ’ বলে তার সমালোচনা একটি মৌলিক বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে। জাতিসংঘ ও নিরাপত্তা পরিষদ সদস্য রাষ্ট্রগুলো যতটা শক্তিশালী বা দুর্বল করতে চায়, ততটাই হয়।
যদি কোনো স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্র জাতিসংঘ সনদ লঙ্ঘন করে এবং অন্য দেশের সার্বভৌমত্ব ভঙ্গ করে- যেমন যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালিয়ে করেছে, অথবা রাশিয়া ইউক্রেনে আগ্রাসন চালিয়ে করেছে, তাহলে জাতিসংঘের পক্ষে তা ঠেকানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
রাশিয়া ২০২২ সালে ইউক্রেন আক্রমণের পর বহু প্রস্তাবে ভেটো ব্যবহার করেছে। এমনকি কোনো প্রস্তাব গৃহীত হলেও স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্রের পদক্ষেপের কারণে তা বাস্তবায়ন করা যায়নি। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে বহুপাক্ষিকতার পশ্চাদপসরণ জাতিসংঘকে আরও প্রান্তিক করেছে। ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও বিভক্তিতে ভরা বিশ্বে এর ভূমিকা কমে গেছে।
যারা একসময় নিয়মভিত্তিক বৈশ্বিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল, তারাই এখন সেই নিয়ম দুর্বল করে দিচ্ছে। শক্তিধর দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান সামরিক শক্তি প্রয়োগ ও বলপ্রয়োগের প্রবণতা আন্তর্জাতিক আইনকে দুর্বল করেছে এবং বৈশ্বিক সহযোগিতা ও শাসনব্যবস্থাকে ভেঙে দিচ্ছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবহেলার কারণেও জাতিসংঘের মর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ওয়াশিংটন একাধিক গুরুত্বপূর্ণ জাতিসংঘ সংস্থা থেকে সরে দাঁড়ায় এবং অর্থায়নও কমিয়ে দেয়।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল-ইরান সংঘাতে নিরাপত্তা পরিষদের অকার্যকারিতা আবারও স্পষ্ট হয়েছে। যুদ্ধ থামানো বা যুদ্ধবিরতি আনার ক্ষেত্রে পরিষদ কার্যত কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার নিন্দা জানিয়ে কোনো প্রস্তাব গৃহীত হয়নি। রাশিয়ার একটি উত্তেজনা প্রশমনের খসড়া প্রস্তাবও পর্যাপ্ত সমর্থন পায়নি। বরং এমন একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়, যেখানে উপসাগরীয় দেশগুলোর বিরুদ্ধে ইরানের পাল্টা হামলার নিন্দা জানানো হয়। কিন্তু সেখানে সংঘাতের মূল কারণ বা যুদ্ধ কে শুরু করেছে, তা উল্লেখই করা হয়নি। এতে আবারও পরিষদের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ক্ষমতা প্রায়ই নীতিকে ছাপিয়ে গেছে, ফলে যুদ্ধ ও শান্তির প্রশ্নে জাতিসংঘ অনেক সময় শুধু দর্শকে পরিণত হয়েছে। হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা চলাকালে নিরাপত্তা পরিষদ কার্যত নিষ্ক্রিয় ছিল। পরে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, ওয়াশিংটন চায় জাতিসংঘ হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কার্যক্রম থামিয়ে দিক। তিনি প্রশ্ন তোলেন, যদি তা না পারে তবে জাতিসংঘের কার্যকারিতা কোথায়। এমন মন্তব্য এমন এক দেশের পক্ষ থেকেই এসেছে, যে দেশটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অর্থায়ন কমানোসহ বিভিন্নভাবে জাতিসংঘকে সবচেয়ে বেশি দুর্বল করেছে।
৮০ বছর পুরোনো এই সংস্থাকে সমসাময়িক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে সংস্কারের প্রয়োজন, এই যুক্তি অত্যন্ত শক্তিশালী। বিশেষ করে নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামো এখন সময়ের সঙ্গে বেমানান। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বহুবার বলেছেন, বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা ভাঙনের মুখে এবং বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে জরুরি সংস্কার প্রয়োজন। সাবেক মহাসচিব বান কি-মুন সতর্ক করেছেন যে, জাতিসংঘ কার্যকারিতা হারানোর দিকে এগোচ্ছে।
যদিও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে সংস্কারের ব্যাপক সমর্থন রয়েছে, তবু নিরাপত্তা পরিষদকে কীভাবে আরও প্রতিনিধিত্বশীল, কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করা যায়, সে বিষয়ে ঐকমত্য নেই। গত দুই দশকের সংস্কার প্রচেষ্টা মূলত থমকে গেছে। কারণ কিছু দেশ নিজেদের স্থায়ী সদস্য করতে চায়, আর অন্যরা আরও স্থায়ী সদস্য বাড়ানোর বিরোধিতা করে নির্বাচিত অস্থায়ী সদস্য বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়। এ ছাড়া সংস্কারের জন্য যাদের সম্মতি সবচেয়ে জরুরি, সেই পাঁচ স্থায়ী সদস্য নিজেদের ভেটো ক্ষমতা ছাড়তে বা প্রভাব কমাতে মোটেও আগ্রহী নয়। ফলে সংস্কারের সম্ভাবনা এখনও খুবই ক্ষীণ। শিগগিরই নতুন মহাসচিব নির্বাচিত হওয়ার কথা। তাই নতুন নেতৃত্বের ওপর জাতিসংঘকে কার্যকর ও সময়োপযোগী করে তোলার দায়িত্ব আরও বাড়বে। সংঘাত, মানবিক সংকট থেকে জলবায়ু পরিবর্তন- এমন অসংখ্য বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শক্তিশালী জাতিসংঘের প্রয়োজন।
সব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও নিরাপত্তা পরিষদের বৈধতা দেয়ার ভূমিকা এখনও গুরুত্বপূর্ণ। এজন্যই দেশগুলো নিজেদের পদক্ষেপের আন্তর্জাতিক বৈধতা নিশ্চিত করতে পরিষদের অনুমোদন চায়। এ কারণেই ইরানও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য শান্তি চুক্তিতে নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন চায়।
(লেখক যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন ও জাতিসংঘে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত। তার এ লেখাটি অনলাইন ডন থেকে অনুবাদ)
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats