(এটি একটি ব্যাংক দখলের গল্প,‘এই, আপনারা কারা’ শিরোণামে রিপোর্টের পরবর্তি অংশ)
২০১৪ সালে ৫ জানুয়ারি বিএনপি ও জামায়াতহীন একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। তখন ইসলামী ব্যাংককে নিয়ন্ত্রণের তৎপরতা শুরু হয়। সে সময় পর্ষদে থাকা ব্যাংকটির দুজন পরিচালক প্রথম আলোকে বলেছেন, পরিচালক ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মধ্যে কয়েকজনকে প্রায়ই ডিজিএফআই কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে যাওয়া হতো।
২০২৪ সালের ৫ জানুয়ারি ডামি ভোট নামে পরিচিত একতরফা নির্বাচনে জয়ী হয় আওয়ামী লীগ। তিন দিনের মাথায় গণভবনে গিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে (জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত) ফুলেল শুভেচ্ছা জানান এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম (শেখ হাসিনার বাঁয়ে)। ছবিতে শেখ হাসিনার ডানে সাইফুল আলমের ছেলে আশরাফুল আলম ও আহসানুল আলম। সাইফুল আলমের বাঁয়ে তাঁর জামাতা বেলাল আহমেদ
২০২৪ সালের ৫ জানুয়ারি ডামি ভোট নামে পরিচিত একতরফা নির্বাচনে জয়ী হয় আওয়ামী লীগ। তিন দিনের মাথায় গণভবনে গিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে (জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত) ফুলেল শুভেচ্ছা জানান এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম (শেখ হাসিনার বাঁয়ে)। ছবিতে শেখ হাসিনার ডানে সাইফুল আলমের ছেলে আশরাফুল আলম ও আহসানুল আলম। সাইফুল আলমের বাঁয়ে তাঁর জামাতা বেলাল আহমেদছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১৬ সালে ইসলামী ব্যাংকে চারজন স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দেয়। তাঁরা হলেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক সামীম মোহাম্মদ আফজাল (প্রয়াত), পূবালী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হেলাল আহমেদ চৌধুরী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ আহসানুল আলম ও ইসলামী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম আজিজুল হক (প্রয়াত)।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন দুজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, সরকার ইসলামী ব্যাংকে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে চাপ দিয়েছিল। তাঁদের মতে, তৎকালীন গভর্নর আতিউর রহমান চেয়েছিলেন ইসলামী ব্যাংকের আর্থিক ক্ষতি না হোক। কারণ, দেশের সবচেয়ে বড় ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হলে দেশের অর্থনীতি বিপাকে পড়তে পারে। গভর্নর তখন স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগের মাধ্যমে সরকারের চাপ সামলানোর চেষ্টা করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের দুজন কর্মকর্তা বলছেন, সাইফুল আলমের একান্ত সচিব (পিএস) আকিজ উদ্দিন তখন বাংলাদেশ ব্যাংকে নিয়মিত যেতেন। তাঁরা গভর্নর ফজলে কবির ও আবদুর রউফ তালুকদারের ঘরে লম্বা সময় কাটাতেন। আর তাঁদের মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ ও নিয়মবহির্ভূত বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা অনুমোদন করিয়ে নিতেন।
তখন এস আলম গ্রুপ ছিল ইসলামী ব্যাংকের শীর্ষ গ্রাহক। ২০১৬ সালে ব্যাংকটিতে এস আলম গ্রুপের তিন প্রতিষ্ঠানের ঋণ ছিল তিন হাজার কোটি টাকা। চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ শাখায় লেনদেন করত গ্রুপটি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ব্যাংক কোনো একটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে নিজের মূলধনের ২৫ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ দিতে পারে। ঝুঁকি সীমিত রাখতে এই নিয়ম করা হয়েছে।
ইসলামী ব্যাংকে এস আলম গ্রুপের ঋণ সীমা ছুঁয়ে ফেলেছিল। তারা আর কোনো ঋণ পাওয়ার যোগ্য ছিল না। কিন্তু ২০১৬ সালে নতুন করে ঋণের জন্য ইসলামী ব্যাংকে আবেদন করে এস আলম। তবে ইসলামী ব্যাংক তা নাকচ করে দেয়। ব্যাংকটির একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর আতিউর রহমান তখন ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল মান্নানকে ডেকে বলেন, এস আলমকে আরও ঋণ দিতে সরকার থেকে বলা হয়েছে। ব্যাংক বাঁচাতে চাইলে টাকা দিতেই হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অফসাইট সুপারভিশন বিভাগ (বড় ঋণ অনুমোদন ও তদারকি করত, এখন নেই) ঋণসীমার শর্ত শিথিল করে এস আলমকে ঋণ দেওয়ার সুযোগ তৈরি করে দেয়। এরপর ইসলামী ব্যাংক এস আলমকে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার নতুন ঋণ অনুমোদন করে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অফসাইট সুপারভিশন বিভাগে তখন মহাব্যবস্থাপক ছিলেন রবিউল হাসান। চাকরির মেয়াদ শেষ হলে ২০২০ সালে তাঁকে ইসলামী ব্যাংকের প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে অধ্যক্ষ হিসেবে তিন বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়। তত দিনে এস আলম ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। রবিউলের পর একই পদে যোগ দেন বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) উপপ্রধান ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক নজরুল ইসলাম। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তাঁর নিয়োগ বাতিল করে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের দুজন কর্মকর্তা বলছেন, সাইফুল আলমের একান্ত সচিব (পিএস) আকিজ উদ্দিন তখন বাংলাদেশ ব্যাংকে নিয়মিত যেতেন। তাঁরা গভর্নর ফজলে কবির ও আবদুর রউফ তালুকদারের ঘরে লম্বা সময় কাটাতেন। আর তাঁদের মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ ও নিয়মবহির্ভূত বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা অনুমোদন করিয়ে নিতেন। যেসব কর্মকর্তা বিশেষ সুযোগ দিতেন, তাঁদের অবসরের পরে চাকরি দেওয়া হতো এস আলমের নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যাংকে।
এস আলমের নিয়ন্ত্রণে থাকার সময় ২০২২ সালে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পরিষদের সভায় উপস্থিত চেয়ারম্যান নাজমুল হাসান ভাইস চেয়ারম্যান মো. সাহাবুদ্দিন (বর্তমানে রাষ্ট্রপতি), ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুব উল আলমসহ অন্যরা। ছবি: ইসলামী ব্যাংক
২০১৬ সালের শুরুতে ইউনাইটেড গ্রুপ ইসলামী ব্যাংকের ৩ কোটি ২৫ লাখ ৪৭ হাজার ৩৩৫টি শেয়ার কেনে। পরে তারা সেই শেয়ার বিক্রি করে দেয়।
শেয়ার কেনা হয় এস আলম গ্রুপের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান গ্র্যান্ড বিজনেস লিমিটেডের নামে। এরপর এস আলম গ্রুপ বিভিন্ন নামে ইসলামী ব্যাংকের আরও শেয়ার কেনে। ২০১৬ সালের মে মাসের বিভিন্ন সময় এক্সেল ডায়িং অ্যান্ড প্রিন্টিং লিমিটেড, আরমাডা স্পিনিং মিল লিমিটেড, এবিসি ভেঞ্চার্স লিমিটেড, প্ল্যাটিনাম এন্ডেভারস, প্যারাডাইজ ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড ও ব্লু ইন্টারন্যাশনালের নামে এসব শেয়ার কেনা হয়। পুঁজিবাজারে নিবন্ধিত কোম্পানির ২ শতাংশ শেয়ারের মালিক হলে পরিচালক হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তখন আলোচনা ছিল, ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার এস আলম কিনলেও ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নেবে বেক্সিমকো গ্রুপ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এস আলমের ঘনিষ্ঠ একজন ব্যক্তি এই প্রতিবেদককে বলেছিলেন, বনানীতে নিজের বাসার পাশের একটি মসজিদে নিয়মিত নামাজ পড়তেন সাইফুল আলম। ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি ইসলামী ব্যাংক দখলের দিন ভোরে সেই মসজিদে যান সালমান এফ রহমান। তিনি সাইফুল আলমের কাছে ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ বেক্সিমকোকে দেওয়ার জন্য বলেন। সাইফুল আলম রাজি হননি।
সূত্রটি আরও বলেছে, সালমান এফ রহমান সরকারের উচ্চপর্যায়কে ‘ম্যানেজ’ করার কথা বলেছিলেন। যদিও সাইফুল আলম বলেন, তাঁর কাছে কোনো ‘সিগন্যাল’ নেই। আর বিষয়টি নির্ভর করছে ডিজিএফআইয়ের কর্মকর্তাদের (তৎকালীন) ওপর।
দ্বিতীয় কোনো সূত্র থেকে এই তথ্য যাচাইয়ের চেষ্টা করা হয়েছে। তবে তা সম্ভব হয়নি। কারণ, বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান এখন কারাগারে। সাইফুল আলম বিদেশে।
সার্বিক বিষয়ে কথা বলার জন্য সাইফুল আলমের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে যোগাযোগ করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। এস আলম গ্রুপের ওয়েবসাইটে থাকা ই-মেইলে এ বিষয়ে গত ৩১ মার্চ প্রথম আলোর পক্ষ থেকে প্রশ্ন লিখে পাঠানো হয়। তবে জবাব আসেনি।
ডিজিএফআই ‘প্রযোজিত’ পর্ষদ বৈঠক
শুরুতে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের যে বৈঠকের (৫ জানুয়ারি, ২০১৭) কথা বলা হয়েছে, সেটি হওয়ার কথা ছিল ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ে, মতিঝিলে। এটি কোনো বিশেষ সভা ছিল না। অন্য সব সভার মতো এটিরও আলোচ্যসূচি ছিল গ্রাহকের ঋণ ও অন্যান্য বিষয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে তৎকালীন একজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা বলেছেন, ৪ জানুয়ারি (২০১৭) আগের দিন ইসলামী বাংকে পদোন্নতি নিয়ে একটি সভা ছিল। সেটা রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত চলে। রাত ১০টার দিকে ডিজিএফআই থেকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল মান্নানের ফোনে একটি কল আসে। বলা হয়, পরের দিনের পর্ষদ সভা হবে র্যাডিসনে।
আবদুল মান্নান বিষয়টি জানান ইসলামী ব্যাংকের তখনকার কোম্পানি সচিব আবু রেজা মোহাম্মদ ইয়াহিয়াকে। তিনি তখনই যোগাযোগ করেন র্যাডিসন হোটেলে। সেখান থেকে জানানো হয়, বৈঠক করার মতো কোনো কক্ষ ফাঁকা নেই। বিষয়টি জানানো হয় ডিজিএফআইকে। তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়, কক্ষের চিন্তা করতে হবে না। সেটার ব্যবস্থা তারা করবে।
ইসলামী ব্যাংকের পক্ষ থেকে ডিজিএফআইয়ের কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছিল যে ৫ জানুয়ারি (২০১৭) সকালে ব্যাংকের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সভা রয়েছে। বেলা আড়াইটার দিকে পরিচালনা পর্ষদের নির্ধারিত সভা রয়েছে। ডিজিএফআইয়ের কর্মকর্তারা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সভাটিও র্যাডিসনে করতে বলেন।
ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিয়ে সকালের সভা হয় র্যাডিসন হোটেলের দ্বিতীয় তলায়। ওই সভায় ছিলেন শুধু সংশ্লিষ্ট কমিটির সদস্যরা। সেটি চলাকালেই দ্রুত শেষ করার তাগাদা দেওয়া হয় ডিজিএফআই থেকে। সভা শেষ হতে হতে মধ্যাহ্নভোজের সময় হয়ে যায়। ‘বুফে’তে (খাবার পরিবেশনব্যবস্থা) খাবার নেওয়ার সময় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কমিটির বৈঠকে থাকা একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ব্যাংকের চেয়ারম্যান মুস্তাফা আনোয়ারকে দেখতে পান। ২৭ এপ্রিল তিনি প্রথম আলোকে বলেন, চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালককে ফোনে পাচ্ছিলেন না। ফলে তিনি আশঙ্কা করছিলেন কিছু একটা হতে যাচ্ছে। চেয়ারম্যানকে দেখে তিনি নিচু স্বরে জানতে চান, ‘স্যার, কী অবস্থা?’ চেয়ারম্যান জবাব দেন দুটি শব্দে, ‘সব শেষ।’
৪ জানুয়ারি (২০১৭) আগের দিন ইসলামী বাংকে পদোন্নতি নিয়ে একটি সভা ছিল। সেটা রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত চলে। রাত ১০টার দিকে ডিজিএফআই থেকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল মান্নানের ফোনে একটি কল আসে। বলা হয়, পরের দিনের পর্ষদ সভা হবে র্যাডিসনে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ব্যাংকটির তৎকালীন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা
দুপুরে পরিচালনা পর্ষদের সভা শুরুর আগে সবার মুঠোফোন নিয়ে নেন গোয়েন্দারা। তাঁরা ছিলেন পাঁচ থেকে ছয়জন।
এদিকে সকালে ব্যাংকটির তৎকালীন চেয়ারম্যান মুস্তাফা আনোয়ার, ভাইস চেয়ারম্যান আজিজুল হক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল মান্নান বাসা থেকে সভাস্থলের দিকে রওনা হলে তাঁদের ডিজিএফআইয়ের প্রধান কার্যালয়ে যেতে বাধ্য করা হয়।
সেই দিনের ঘটনা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ইসলামী ব্যাংকের একজন সাবেক পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ডিজিএফআইয়ের কার্যালয়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল মান্নানকে সংস্থাটির তৎকালীন মহাপরিচালক মোহাম্মদ আকবর হোসেনের সামনে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁকে পদত্যাগপত্রে সই করতে বাধ্য করা হয়। তিনি আরও বলেন, আবদুল মান্নানকে সেদিন আটকে রাখা হয়েছিল সন্ধ্যা পর্যন্ত। ওদিকে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভা চলছিল।
ইসলামী ব্যাংক থেকে পদত্যাগে বাধ্য হওয়ার পর দেশ ছাড়েন আবদুল মান্নান। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি দেশে ফেরেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাকে ধরে নিয়ে একটি প্যাডে জোরপূর্বক স্বাক্ষর করানো হয়। যেখানে আগে থেকে পদত্যাগের বিষয়টি লেখা ছিল। সেই প্যাড ইসলামী ব্যাংকের ছিল না। এই ঘটনার পর থেকে আমি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত।’
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ডিজিএফআইয়ের তৎকালীন মহাপরিচালক আকবর হোসেনকে গুমের ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় আসামি করা হয়েছে। তিনি এখন পলাতক।
ডিজিএফআই ‘প্রযোজিত’ পর্ষদ সভায় আরমাডা স্পিনিং মিলের প্রতিনিধি হিসেবে আরাস্তু খানকে ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান করা হয়। আরমাডা স্পিনিং এস আলমেরই স্বার্থসংশ্লিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠান। আরাস্তু খান এর আগে এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন কমার্স ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন।
বৈঠকে উপস্থিত দুটি সূত্র বলেছে, আরাস্তু খানকে চেয়ারম্যান নির্বাচিত করার পর সাইফুল আলম তাঁর হাতে একটি কাগজ দেন এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে আব্দুল হামিদ মিয়ার নাম ঘোষণা করতে বলেন। নামটি ঘোষণা করা হয়।
আব্দুল হামিদ মিয়া তখন এস আলমের নিয়ন্ত্রণে থাকা ইউনিয়ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তাঁকে ইসলামী ব্যাংকের এমডি করা হয়। বৈঠক সূত্র আরও বলছে, সভায় সাইফুল আলমের দেওয়া কাগজ দেখে ইসলামী ব্যাংকের কোম্পানি সচিব হিসেবে হাবিবুল্লাহর নাম ঘোষণা করেন আরাস্তু খান।
সভা চলে সন্ধ্যা পর্যন্ত। রাতেই নতুন চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের নথিপত্র প্রস্তুত করা হয়। তা রাত ১২টার দিকে নিয়ে যাওয়া হয় গভর্নর হাউসে, অর্থাৎ বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর ফজলে কবিরের বাসভবনে। ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে কাউকে নিয়োগ দিতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন লাগে।
ইসলামী ব্যাংকের দুটি সূত্র বলছে, ফজলে কবির দোতলা থেকে লুঙ্গি পরে নিচে নামেন। তিনি নথিপত্র নেন। পরের প্রথম কর্মদিবস রোববার সকালে ইসলামী ব্যাংকের নতুন নিয়োগগুলো অনুমোদন পায়।
সভা চলে সন্ধ্যা পর্যন্ত। রাতেই নতুন চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের নথিপত্র প্রস্তুত করা হয়। তা রাত ১২টার দিকে নিয়ে যাওয়া হয় গভর্নর হাউসে, অর্থাৎ বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর ফজলে কবিরের বাসভবনে।
ব্যাংক খাতে নানা কেলেঙ্কারি ও অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার অভিযোগ ওঠার পরও দুই মেয়াদে গভর্নর পদে রাখা হয়েছিল সাবেক অর্থসচিব ফজলে কবিরকে। এমনকি তাঁকে গভর্নর পদে রাখতে আইন সংশোধন করে বয়সসীমার শর্ত শিথিল করা হয়। আলোচনা আছে যে এস আলম গ্রুপের প্রভাবের কারণেই তিনি দুই মেয়াদে পদে থাকতে পেরেছিলেন।
বিষয়টি নিয়ে ফজলে কবিরের বক্তব্য জানতে তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করা হয়েছে। তবে তিনি সাড়া দেননি। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের হত্যা মামলার আসামি করা হয়েছে তাঁকে।
অবশ্য ২০২৪ সালের ১৭ আগস্ট ফজলে কবির মুঠোফোনে এই প্রতিবেদককে বলেছিলেন, ‘আমার সময়ে (ইসলামী ব্যাংকের) মালিকানা পরিবর্তন হয়েছিল, এটা মনে আছে। যদি অনিয়ম হয়ে থাকে, সেটা ওই ব্যাংকের চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও এমডি বলতে পারবেন।’
এস আলম গ্রুপের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সখ্য থাকা প্রসঙ্গে ফজলে কবির তখন বলেছিলেন, ‘এস আলম সাহেব সিঙ্গাপুরে থাকায় অনেক সময় তাঁর কর্মকর্তারা আসতেন। আমি কখনো কাউকে অতিরিক্ত সুবিধা দিইনি।’
অবশ্য ফজলে কবির গভর্নর থাকার সময়ই ইসলামী ব্যাংকের মালিকানায় জবরদস্তিমূলক হস্তান্তর এবং বিপুল অনিয়মের ঘটনা ঘটে। তিনি তা অনুমোদন করেন।
রিপোর্ট সংগ্রহ: প্রথম আলো
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats