কোনো ব্যক্তিকে যদি একটি কালো রঙের আবর্জনার ব্যাগে ভরে ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হয়, তাহলে কী ঘটতে পারে—যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে দুই বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী নিখোঁজ হওয়ার মাত্র ৩ দিন আগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) চ্যাটবট চ্যাটজিপিটিকে এ প্রশ্ন করেছিলেন হিশাম সালেহ আবুঘরবেহ।
বাংলাদেশি দুই পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি হত্যাকাণ্ডে সন্দেহভাজন হিসেবে মার্কিন নাগরিক আবুঘরবেহকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডা ক্যাম্পাসের বাইরে লিমনের সঙ্গে একই অ্যাপার্টমেন্টে থাকতেন আবুঘরবেহ। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রাক্তন শিক্ষার্থী।
লিমন ও বৃষ্টি নিখোঁজ হওয়ার পর ফরেনসিক দল লিমনের অ্যাপার্টমেন্টে যায় এবং সেখানে তারা রক্তের চিহ্ন খুঁজে পায়। ওই কমপ্লেক্সের ভেতর আবর্জনা রাখার জায়গায় তাঁরা লিমনের মানিব্যাগ ও চশমা এবং একটি গোলাপি রঙের আইফোন কাভার খুঁজে পায়। সেটি নিখোঁজ আরেক শিক্ষার্থী নাহিদা বৃষ্টির বলে ধারণা করা হয়। ফরেনসিক দলটি অ্যাপার্টমেন্টের ভেতর রক্তে ভেজা কাপড়ের টুকরাও খুঁজে পায়।

শুক্রবার আবুঘরবেহকে তাঁর পারিবারিক বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ২৬ বছর বয়সী আবুঘরবেহর বিচার শুরুর আগপর্যন্ত তাঁকে কারাগারে রাখার অনুরোধ জানিয়ে গত শনিবার তদন্ত কর্মকর্তারা আদালতে একটি আবেদন জমা দিয়েছেন। ওই আবেদনে এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। আবুঘরবেহর বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ পর্যায়ের (ফার্স্ট ডিগ্রি) দুটি হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।
আদালতে করা ওই আবেদনে এ দুই হত্যাকাণ্ড নিয়ে এখন পর্যন্ত তদন্তে যা কিছু পাওয়া গেছে, তার বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে।
সেখানে বলা হয়েছে, গত শুক্রবার ফ্লোরিডার হাওয়ার্ড ফ্রাঙ্কল্যান্ড ব্রিজ এলাকায় কয়েকটি কালো রঙের আবর্জনা ফেলার ব্যাগের মধ্যে লিমনের মরদেহ খুঁজে পাওয়া যায়। আদালতের নথি অনুযায়ী, লিমনের মরদেহে কোনো কাপড় ছিল না এবং মরদেহে একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল।
আদালতের নথি অনুযায়ী, তদন্ত কর্মকর্তারা আবুঘরবেহর ফোন ঘেঁটে কিছু তথ্য পেয়েছেন। সেই তথ্যানুযায়ী, লিমন ও বৃষ্টি নিখোঁজ হওয়ার তিন দিন আগে থেকেই আবুঘরবেহ চ্যাটজিপিটিকে একাধিক প্রশ্ন করেছিলেন। ১৩ এপ্রিল করা প্রথম প্রশ্নে তিনি ‘একজন মানুষকে’ ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া সম্পর্কে জানতে চান। নথি অনুযায়ী, চ্যাটজিপিটি এর উত্তরে বলে, এটি ‘বিপজ্জনক শোনাচ্ছে’। এরপর তিনি একটি ফলোআপ বার্তায় জিজ্ঞাসা করেন, ‘তারা কীভাবে জানতে পারবে?’
দুই পিএইচডি শিক্ষার্থী নিখোঁজ হওয়ার এক দিন আগে আবুঘরবেহ চ্যাটজিপিটিকে জিজ্ঞেস করেন, ‘একটি গাড়ির যানবাহন শনাক্তকরণ নম্বর (ভিআইএন) কি পরিবর্তন করা যায়?’ এবং ‘লাইসেন্স ছাড়া বাড়িতে কি বন্দুক রাখা যায়?’—এমনটাই ওই আবেদনপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে চ্যাটজিপিটি এসব প্রশ্নের উত্তর কী দিয়েছিল, তা নথিতে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়নি।
তদন্তে পাওয়া অন্যান্য রেকর্ড অনুযায়ী, দুই শিক্ষার্থী নিখোঁজ হওয়ার পর আবুঘরবেহ ১৬ এপ্রিল গভীর রাতে গাড়ি চালিয়ে কর্নি ক্যাম্পবেল কজওয়ে পার হয়ে স্যান্ড কি পার্ক এলাকায় যান।
নথিতে উল্লেখ করা হয়, সেই রাতে তাঁর গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার পথের সঙ্গে লিমনের মোবাইল ফোনের সিগন্যালের গতিপথ মিলে যায়। সে সময়ে লিমনের মোবাইলের সিগন্যালের গতিপথ কজওয়ে ও ক্লিয়ারওয়াটারের বিভিন্ন স্থানে শনাক্ত হয় এবং এরপর হঠাৎ সেটির সিগন্যাল বন্ধ হয়ে যায়।
শুধু লিমন ও বৃষ্টি নিখোঁজ হওয়ার আগেই নয়, বরং তাঁরা নিখোঁজ হওয়ার তিন দিন পর আবুঘরবেহ চ্যাটজিপিটিকে জিজ্ঞাসা করেছেন, ‘কেউ কি স্নাইপারের গুলিতে মাথায় আঘাত পাওয়ার পর বেঁচে গেছে?’ এবং ‘আমার প্রতিবেশীরা কি আমার বন্দুকের শব্দ শুনতে পাবে?’ নথিতে এমনটাই উল্লেখ আছে। হিলসবরো কাউন্টি শেরিফের কার্যালয় থেকে প্রকাশ করা একটি ভিডিওতে শুক্রবার উত্তর টাম্পার লেক ফরেস্ট এলাকায় পারিবারিক বাড়ি থেকে সোয়াটের একটি দল আবুঘরবেহকে আটক করে।
মিথ্যা জবানবন্দি দিয়ে ধরা খেল খুনি, প্রকাশ্যে রোমহর্ষক তথ্য
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে দক্ষিণ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইউএসএফ) দুই বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থীকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় চাঞ্চল্যকর সব তথ্য প্রকাশ করেছেন মার্কিন প্রসিকিউটররা। টাম্পা বের একটি ব্রিজ থেকে উদ্ধার হওয়া জামিল লিমন (২৭) এবং তাঁর নিখোঁজ বন্ধু নাহিদা বৃষ্টির (২৭) অন্তর্ধান রহস্যে এখন মূল অভিযুক্ত লিমনেরই রুমমেট হিশাম আবুঘারবিয়া (২৬)।
রোববার (২৬ এপ্রিল) হিলসবোরো কাউন্টি আদালতে প্রসিকিউটরদের দাখিল করা একটি প্রি-ট্রায়াল ডিটেনশন মোশন থেকে জানা গেছে, খুনের ধরন এতটাই বীভৎস ছিল যে অভিযুক্তকে জামিন দিলে তা সমাজের জন্য চরম বিপদের কারণ হতে পারে।
তদন্তকারীদের তথ্যমতে, গত ১৬ এপ্রিল থেকে নিখোঁজ হওয়ার পর হাওয়ার্ড ফ্রাঙ্কল্যান্ড ব্রিজের ওপর লিমনের ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে লিমনের শরীরে একাধিক ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। এর মধ্যে তাঁর পিঠের নিচের দিকে একটি গভীর ক্ষত পাওয়া গেছে যা তাঁর লিভার ভেদ করে গিয়েছিল। প্রসিকিউটররা আদালতকে জানিয়েছেন, লিমনের বন্ধু নাহিদা বৃষ্টির পরিণতিও একই রকম হয়েছে এবং তাঁকেও একইভাবে ব্রিজের আশপাশে কোথাও ফেলে দেওয়া হয়েছে বলে তাঁদের ধারণা।
নাহিদা বৃষ্টির পরিবারকে ইতিমধ্যে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, বৃষ্টির বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ক্ষীণ। এর পেছনে বড় কারণ হিসেবে তাঁরা লিমন ও হিশামের শেয়ার করা অ্যাপার্টমেন্টে ‘বিপুল পরিমাণ রক্ত’ দেখেছেন। বৃষ্টির ভাই সিএনএন-এর সহযোগী সংবাদমাধ্যম ডব্লিউটিএসপি-কে জানিয়েছেন, অ্যাপার্টমেন্টে পাওয়া রক্তের পরিমাণ দেখে গোয়েন্দারা নিশ্চিত যে সেখানে বড় ধরনের কোনো সহিংসতা ঘটেছে।
উল্লেখ্য, রোববার রাতে হাওয়ার্ড ফ্রাঙ্কল্যান্ড ব্রিজের দক্ষিণ দিকের জলাশয় থেকে কিছু মানুষের দেহাংশ উদ্ধার করা হয়েছে, তবে ডিএনএ পরীক্ষার আগে তা বৃষ্টির কি না তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
তদন্তের শুরুতে হিশাম আবুঘারবিয়া গোয়েন্দাদের জানিয়েছিলেন, তিনি ওই দিন লিমন বা বৃষ্টি কাউকে দেখেননি। এমনকি তিনি দাবি করেছিলেন, তাঁর গাড়িতে তাঁরা কখনোই ওঠেননি এবং তিনি ক্লিয়ারওয়াটার বিচ এলাকাতেও যাননি।
তবে প্রসিকিউটররা আদালতে হিশামের মিথ্যা জবানবন্দি খণ্ডন করতে নিচের প্রমাণগুলো উপস্থাপন করেন:
১. মোবাইল ও গাড়ির লোকেশন: লিমনের ফোনের শেষ লোকেশন এবং হিশামের গাড়ির লোকেশন একই সময়ে ক্লিয়ারওয়াটার বিচে পাওয়া গেছে। যখন তাঁকে এই প্রমাণের মুখোমুখি করা হয়, তখন হিশাম তাঁর বয়ান বদলে বলেন যে, তিনি লিমন ও তাঁর বান্ধবীকে সেখানে নামিয়ে দিতে গিয়েছিলেন।
২. আঙুলে ব্যান্ডেজ ও অদ্ভুত অজুহাত: জেরা করার সময় গোয়েন্দারা হিশামের বাম হাতের কনিষ্ঠ আঙুলে ব্যান্ডেজ দেখতে পান। হিশাম দাবি করেন পেঁয়াজ কাটতে গিয়ে তিনি ব্যথা পেয়েছেন। তবে প্রসিকিউটরদের ধারণা, ধস্তাধস্তির সময় এই চোট লেগে থাকতে পারে।
৩. আলামত মোছার সরঞ্জাম: লিমন ও হিশামের অ্যাপার্টমেন্ট থেকে একটি সিভিএস ফার্মেসির রসিদ পাওয়া গেছে। ১৬ এপ্রিলের সেই রসিদে দেখা যায়, হিশাম প্রচুর পরিমাণে ট্র্যাশ ব্যাগ, লাইসল ওয়াইপস এবং ফেব্রেজ কিনেছিলেন—যা মূলত খুনের আলামত ও রক্তের গন্ধ মোছার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
হিশাম আবুঘারবিয়ার বিরুদ্ধে বর্তমানে জোড়া খুনের (পরিকল্পিত হত্যা) পাশাপাশি মৃতদেহ লুকিয়ে ফেলা, আলামত নষ্ট করা, ভুয়া বন্দিত্ব এবং শারীরিক আঘাতের একাধিক অভিযোগ আনা হয়েছে। গত শুক্রবার একটি সাধারণ ঘরোয়া বিবাদের সূত্র ধরে পুলিশ তাঁর বাড়িতে গেলে এই ভয়াবহ সত্য প্রকাশ্যে আসে।
বাংলাদেশি দুই পিএইচডি শিক্ষার্থীকে খুন পূর্বপরিকল্পিত, খুনি রুমমেট: পুলিশ
হিলসবোরো কাউন্টি শেরিফ চ্যাড ক্রনিস্টার এক আবেগঘন বিবৃতিতে বলেন, ‘এই ঘটনাটি আমাদের পুরো কমিউনিটিকে নাড়িয়ে দিয়েছে। আমরা আশা করেছিলাম হয়তো তাদের সুস্থভাবে ফিরে পাব, কিন্তু এমন পরিণতি অত্যন্ত মর্মান্তিক।’
আগামী মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) হিশামের প্রি-ট্রায়াল ডিটেনশন (বিচার শুরুর আগে আটকাদেশ) শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে প্রসিকিউটররা তাঁকে বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিনা জামিনে কারাগারে রাখার পক্ষে যুক্তি দেবেন।
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats