সাত সমুদ্র তের নদী পাড়ের দেশ আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল। বাংলাদেশ থেকে সরলরেখায় হিসাব কষলে এ দুটি দেশের দূরত্ব ১৫০০০ থেকে ১৬০০০ কিলোমিটার। আর আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলকে প্রতিবেশী বললে খুব বাড়িয়ে বলা হয় না। বিশ্বকাপে এই দুই দল যখন খেলে, তখন তাদের দেশের চেয়ে উত্তেজনার ঢেউ সম্ভবত এত হাজার কিলোমিটার দূরের দেশ বাংলাদেশে আছড়ে পড়ে। ফুটবল ভূমিকম্পে কাঁপতে থাকে বাংলাদেশ। বড় দুটি শিবিরে ভাগ হয়ে যায় দেশ। আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল। অন্য দলের সমর্থনও আছে। তবে এই দুই দলের সমর্থন সম্ভবত সবচেয়ে বেশি। এর প্রমাণ বাংলাদেশের গ্রাম, গঞ্জ, শহর। ভবনের ছাদে ছাদে, রাস্তায় রাস্তায় এই দুই দেশের পতাকায় সয়লাব। তাদের সমর্থকরা এক পক্ষ অন্য পক্ষকে টেক্কা দিতে বিশাল বিশাল পতাকা বানিয়ে আনন্দ মিছিল করেন। মোটরসাইকেল র্যালি করেন। সবচেয়ে বড় সমাবেশ আয়োজন করেন। এমন ঘটনা এরই মধ্যে ঘটে গেছে এবারের বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে। এ বিষয়গুলো উঠে এসেছে বিদেশি মিডিয়ায়।
অনলাইন দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্টের রিপোর্টে বলা হয়েছে- একটি বড় আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আসর শুরু হওয়ায় বাংলাদেশের রাস্তাগুলো বিদেশি রঙিন পতাকায় ভরে গেছে। ১৭ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশ ২০২৬ বিশ্বকাপে যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। তবুও দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটি বিশ্বের সবচেয়ে উৎসাহী ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা সমর্থকদের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
ফুটবল ভক্তরা মে মাস থেকেই প্রতিযোগিতা করে আসছেন- কে বড় পতাকা টানাতে পারে তা নিয়ে। দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দলের বিশাল পতাকা রাস্তায় রাস্তায় দেখা যাচ্ছে। এটি এমন এক বিরল মুহূর্ত, যখন এই দেশটির প্রবল জাতীয়তাবাদী মানুষ বিদেশি রঙকে আপন করে নেয়। আবাসিক এলাকার বাইরে লিওনেল মেসির বিশাল কাটআউট দেখা যাচ্ছে, আর ঢাকার অভিজাত গুলশান এলাকায় ভক্তরা প্রায় ৫০০ টাকা দামে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের জার্সি কিনতে ভিড় করছেন। এই দুই লাতিন আমেরিকান দেশের প্রতি বাংলাদেশের ভালোবাসা, যদিও ভৌগোলিক বা রাজনৈতিক কোনো সম্পর্ক নেই, বহু প্রজন্ম ধরে চলে আসছে। কখনও কখনও বিশ্বকাপের সময় বন্ধুদেরও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামিয়ে দেয়। এ মাসের শুরুতে হবিগঞ্জে একটি স্থানীয় ফুটবল ম্যাচকে কেন্দ্র করে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে ডজনখানেক মানুষ আহত হয়েছেন। শরীয়তপুরের কিছু তরুণ ঘোষণা করেছে- ব্রাজিল তাদের শেষবার ২০০২ সালে জেতা ট্রফি আবার না জিতলে তারা বিয়ে করবেন না।
ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনাই প্রধান শক্তি হলেও, অন্য কিছু বিশ্বকাপ খেলুড়ে দেশও মাঝে মাঝে মানুষের আগ্রহ কেড়ে নেয়। ৭২ বছর বয়সী আমজাদ হোসেন সম্প্রতি খবরের শিরোনাম হয়েছেন। কারণ তিনি নিজের জমির একটি অংশ বিক্রি করে ৭.৫ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি জার্মান পতাকা তৈরি করেছেন। তার স্বপ্ন এই বিশাল পতাকা জার্মানির কোনো জাদুঘরে স্থান পাবে। নরওয়ে, যা ২৮ বছর পর প্রথমবার বিশ্বকাপে খেলবে, বাংলাদেশের ফুটবল উন্মাদনাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে এবং ভক্তদের ভাইকিংদের সমর্থন করার আহ্বান জানিয়েছে। ভক্তদের প্রতি তাদের আহ্বানে নরওয়েজিয়ান দূতাবাস দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে জানায়, স্বাধীনতার পর নরওয়ে প্রথম দিকের দেশগুলোর মধ্যে একটি ছিল, যারা বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। ‘তাহলে, কী বলো বাংলাদেশ?’- সামাজিক মাধ্যমে পোস্টে এমন প্রশ্ন করা হয়।
এই বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল অংশ নিচ্ছে, যা রেকর্ড ১০৪টি ম্যাচে সম্প্রসারিত হয়েছে। ম্যাচগুলো ১৯ জুলাই পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডায় অনুষ্ঠিত হবে। ২০২২ সালে আর্জেন্টিনার প্রতি বাংলাদেশের ভালোবাসা ফিফা ও আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়দেরও নজরে আসে। তারা বিশ্বের প্রায় ১৭,০০০ কিলোমিটার দূরের এই দেশের সমর্থনে অভিভূত হন। আর আর্জেন্টিনার প্রতি এই ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন ডিয়েগো মারাদোনা। ফুটবল খেলা প্রথমে বৃটিশ ঔপনিবেশিকরা ১৯শ শতকে কলকাতায় নিয়ে আসে। ৬০ ও ৭০-এর দশকে যখন তখনকার পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তরুণরা তখন আশা ও নায়কের সন্ধান করছিল। তখন তারা ব্রাজিলে অনুপ্রেরণা খুঁজে পায়, যা ছিল সেই সময়ের প্রভাবশালী দল। কালো মানিক খ্যাত পেলে তখন বাংলাদেশের মানুষের প্রিয় নায়কে পরিণত হন এবং পরবর্তী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করেন।
৮০-এর দশকের মাঝামাঝি টেলিভিশন ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে ক্রিকেটপ্রধান এই দেশে ফুটবলও ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। অনেক বাংলাদেশির জন্য ১৯৮৬ বিশ্বকাপ ছিল রঙিন টেলিভিশনে প্রথম বিশ্বকাপ দেখা। সে বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বিখ্যাত গোলগুলো ফুটবলের বাইরে গিয়ে একটি প্রতীকী বিজয়ের অনুভূতি তৈরি করেছিল, যা সাবেক ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে এক ধরনের প্রতীকী জয় হিসেবে ধরা হয়। তরুণ সমর্থকদের কাছে ম্যারাডোনার শূন্যতা পূরণ করেছেন আর্জেন্টাইন তারকা লিওনেল মেসি। আর ব্রাজিল সমর্থকদের কাছে প্রিয় তারকা হিসেবে আছেন নেইমার জুনিয়র।
এই উন্মাদনা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা অতীতেও সহিংস রূপ নিয়েছে। এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২২ বিশ্বকাপে প্রতিদ্বন্দ্বী সমর্থক গোষ্ঠীর সংঘর্ষে ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats