ব্রাজিল-মরক্কো লড়াই নিয়ে নানা হিসেব-নিকেশ। কেউ কারও চেয়ে কম নয়। যদিও ব্রাজিলের পক্ষেই কথা বলছেন ফুটবল পণ্ডিতরা। কিন্তু অনেকটা নীরবেই কৌশল এঁটেছে মরক্কো। লড়াইটা সহজ নয়, বড্ড কঠিন। গত কয়েক বিশ্বকাপে ব্রাজিলের নড়বড়ে অবস্থানকে খুব সহজেই টেক্কা দিতে পারবে মরক্কো এমন কথা বলাবলি আছে বিশ্বকাপের আসরে। এই লড়াই নিয়ে মাঠের বাইরে এক ধরনের উত্তেজনা। যদিও ফলাফল কী দাঁড়াবে সেজন্য আর বেশি সময় অপেক্ষা করতে হবে না।
নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামও প্রস্তুত। লড়াইটা হবে এখানেই। এই স্টেডিয়ামেই বিশ্বকাপের ফাইনাল হওয়ার কথা। ব্রাজিল-মরক্কো লড়াইটা যেন ফাইনালের আগেই এক ফাইনাল। গত বিশ্বকাপে মরক্কোর উত্থান ঘটে। ফুটবলার সরবরাহের কারণে আফ্রিকার এই দেশটি বিখ্যাত। ইউরোপের বিভিন্ন ফুটবল ক্লাবে মরোক্কানদের প্রভাব ঈর্ষণীয়। চলতি বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচের আগে ব্রাজিল দলের একাদশ নিয়ে বড় চমক সৃষ্টি করেছেন কোচ কার্লো আনচেলত্তি। তিনি আগের কৌশলের উপর ভিত্তি করেই দল সাজাচ্ছেন। শোনা যাচ্ছে, কাতার বিশ্বকাপের স্কোয়াড থেকে ৮ জন খেলোয়াড়কে প্রথম একাদশে জায়গা দিতে যাচ্ছেন।
মনে করা হচ্ছে, নতুন করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার চেয়ে দলের বর্তমান অভিজ্ঞতা সমন্বয় ও বোঝাপড়ার উপরেই বেশি আস্থা রাখছেন তিনি। এর অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে- দলের ভেতরে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। কাতার বিশ্বকাপের তিক্ত অভিজ্ঞতা এখানে কাজ করছে। রক্ষণভাগ ও মাঝমাঠে অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের উপস্থিতিতে দলটিকে অনেক বেশি শক্তিশালী ও সুসংগঠিত মনে হচ্ছে। তবে কোচের এই সিদ্ধান্তের পক্ষে, বিপক্ষে নানা আলোচনা চলছে সমর্থকদের মধ্যে। ধারণা করা হচ্ছিল- কোচ আনচেলত্তি নতুন প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের জায়গা করে দেবেন দলে। কিন্তু তিনি কোনো সমালোচনায় কান দেননি। তিনি বিশ্বকাপের মতো বিশাল মঞ্চে অভিজ্ঞদের উপর ভরসা করেই ষষ্ঠ শিরোপা ঘরে তোলার মিশন শুরু করতে চান।
ব্রাজিল দলের গোলরক্ষক অ্যালিসন বেকার কোচের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তার মতে, আনচেলত্তির আগমন ব্রাজিল দলের সামগ্রিক পরিবেশে আমূল পরিবর্তন এনেছে। দীর্ঘদিন থেকে দলটির ভেতরে অনিশ্চয়তা এবং অস্থিরতা কাজ করছিল। নতুন কোচ দায়িত্ব নিয়ে স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্ব ফিরিয়ে এনেছেন। কোচের শান্ত ও সুচিন্তিত নেতৃত্ব দলকে মাঠের ভেতরে এবং বাইরে অনেক বেশি মানসিকভাবে স্থিতিশীল করে তুলেছে। অ্যালিসন এটাই বলেছেন। যা কিনা টুর্নামেন্টের বড় মঞ্চে পারফরম্যান্সের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোচ আনচেলত্তির অধীনে ব্রাজিল এখন অনেক বেশি গোছানো। গত বিশ্বকাপগুলোর হতাশা ভুলে নতুন করে স্বপ্ন দেখার সাহস দিচ্ছেন এই কোচ।
ওদিকে মরক্কোর বিশ্বকাপ অভিযান নিয়ে কথা বলেছেন দেশটির সাবেক ফুটবল তারকা সালাহউদিন বাসির। তার বিশ্বাস- ব্রাজিলের মতো পরাশক্তিকে হারানোর ক্ষমতা কেবল ব্যক্তিগত নৈপুণ্য দিয়ে সম্ভব নয়। এটা কেবল সম্ভব কঠোর কৌশলগত এবং রক্ষণাত্মক সংহতির মাধ্যমে। তার মতে, ব্রাজিলের আক্রমণাত্মক ফুটবল শৈলীকে সামলাতে মরক্কোর খেলোয়াড়দের প্রতি মুহূর্তে সু-শৃঙ্খল থাকতে হবে। মাঠে প্রতিটি ইঞ্চি প্রতিপক্ষের জন্য সংকুচিত করে দিতে হবে। বড় দলের বিপক্ষে মরক্কোর খেলোয়াড়দের ধৈর্য্যের পরীক্ষা দিতে হবে। মরক্কো দলের জন্য জেসিম ইয়াসিনকে এক অনন্য গোপন অস্ত্র হিসেবে অভিহিত করা হয়। প্রভাবশালী স্প্যানিশ ক্রীড়া পত্রিকা মার্কা এমনটাই বলছে।
জেসিম মূলত দলের নেপথ্যে থাকা একজন বিশেষজ্ঞ। যিনি খেলোয়াড়দের শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, ইনজুরি প্রতিরোধ এবং মাঠের পারফরম্যান্সের মানোন্নয়নে পর্দার আড়ালে কাজ করছেন। মার্কার মতে, আধুনিক ফুটবলে কৌশল বা দক্ষতার পাশাপাশি খেলোয়াড়দের শারীরিক ফিটনেস থাকতে হবে। যা মরক্কোর মতো দলের জন্য একটি গেমচেঞ্জার হতে পারে। মরক্কো দলের প্রস্তুতি নিয়ে আসাবাহ পত্রিকার প্রতিবেদন নতুন এক ইঙ্গিত দেয়। মরক্কোর কোচিং প্যানেল এমন এক আত্মবিশ্বাস সঞ্চার করেছে যা প্রতিপক্ষের বিপক্ষে মাঠে নামতে খেলোয়াড়দের মধ্যে ভয় এবং দ্বিধা দূর করে । পত্রিকাটির ভাষ্যমতে, বর্তমান মরক্কো দল কেবল শারীরিক শক্তির উপর নির্ভরশীল নয়। বিশ্বকাপে আরব বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে মরক্কোর জাতীয় ফুটবল দলের খেলোয়াড়দের বাজারমূল্য সবচেয়ে বেশি। ট্রান্সফার মার্কেটের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান স্কোয়াডের মোট মূল্য প্রায় ৪৯৮ মিলিয়ন ইউরো। ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলোতে তাদের খেলোয়াড়দের অংশগ্রহণ এটাই প্রমাণ করে। আর্থিক ও ক্রীড়াশক্তির দিক থেকে তুলনা করলে মরক্কোর এই খেলোয়াড়দের বিশাল বাজারমূল্য মিশর, আলজেরিয়া ও তিউনেশিয়ার সম্মিলিত স্কোয়াডের চেয়েও বেশি।
ওদিকে ফিফা বিশ্বকাপের উৎসবের আবহে ব্রাজিলিয়ানদের প্রিয় ঐতিহ্যবাহী চুরাস্কো অথবা বারবিকিউয়ের আয়োজন অনেকটাই ব্যয়বহুল হয়ে গেছে। মুদ্রাস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে গত বিশ্বকাপের তুলনায় ৮৫ শতাংশ ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। খেলা পাগল ব্রাজিলিয়ানদের উৎসবের আনন্দ এবার তাই অনেকটাই ম্লান। এই অর্থনৈতিক চাপ সরাসরি সাধারণ মানুষের কেনাকাটার সক্ষমতার উপরও প্রভাব ফেলেছে। বিশ্বকাপের উন্মাদনার মাঝে ব্রাজিলিয়ানদের এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। ফুটবলের এই মহোৎসবে স্টেডিয়ামের গর্জন ছাপিয়ে এখন হেঁসেলের খরচ নিয়ে সাধারণ মানুষ উদ্বিগ্ন। তাই এই বিশ্বকাপ একদিকে উৎসব অন্যদিকে অর্থনৈতিক সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত করেছে ব্রাজিলিয়ানদের।
মানবজমিনের সৌজন্যে
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats