মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি ‘যুদ্ধবিরতি স্মারক’ চলতি সপ্তাহান্তেই সই হতে পারে। শুক্রবার (১২ জুন) পশ্চিমা একটি সূত্র বার্তাসংস্থা রয়টার্সকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাব্য স্থান হিসেবে সুইজারল্যান্ডের জেনেভা সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে। সূত্রটি জানায়, চুক্তির ভাষ্য চূড়ান্ত করার কাজ এখনও চলছে।
ইরান দাবি করছে, এই সমঝোতায় শুধু উপসাগরীয় যুদ্ধবিরতিই নয়, লেবাননে চলমান সংঘাতও বন্ধের নিশ্চয়তা থাকতে হবে— যেখানে ইসরাইল ও ইরান সমর্থিত হিজবুল্লাহর মধ্যে সংঘর্ষ চলছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, শনিবারের মধ্যে চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত করা হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ এতে স্বাক্ষর করতে পারেন।
তবে এখনো চূড়ান্ত স্থান নির্ধারণ হয়নি, যদিও জেনেভাকেই সম্ভাব্য স্থান হিসেবে ধরা হচ্ছে।
এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের বলেন, ইরানের সঙ্গে একটি ‘বড় সমঝোতা’ হয়েছে এবং নতুন কোনো হামলা আপাতত স্থগিত করা হচ্ছে। ট্রাম্প আরও বলেন, চুক্তি স্বাক্ষরের পর হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেয়া হবে এবং তা ‘খুব শিগগিরই’ হতে পারে।
চুক্তির শর্তে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত
ইরানি কর্মকর্তাদের বরাতে বলা হচ্ছে, প্রস্তাবিত চুক্তিতে তেহরান তাদের বহু গুরুত্বপূর্ণ দাবি পূরণে অগ্রগতি পাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে, ইরানের তেল রপ্তানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল, বিলিয়ন ডলারের সম্পদ অবমুক্ত, সব ফ্রন্টে (লেবাননসহ) যুদ্ধবিরতি এবং অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের উদ্যোগ
ইরানের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন পরিকল্পনা দেবে। তবে চুক্তির বিনিময়ে ইরান কী দেবে, তা নিয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে চুক্তিতে পারমাণবিক ইস্যু আপাতত স্থগিত রাখা হবে বলে জানা গেছে। ওয়াশিংটন চাইছে ইরান যেন কখনো পারমাণবিক অস্ত্র না তৈরি করতে পারে, তবে তেহরান বলছে, তারা এ ধরনের কোনো পরিকল্পনা করছে না।
বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব
ট্রাম্পের ঘোষণার পর বিশ্ববাজারে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। শেয়ারবাজারে ঊর্ধ্বগতি এবং তেলের দামে পতন ঘটেছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২ শতাংশের বেশি কমে যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, টানা কয়েক দিনের উত্তেজনা- ইরান, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি হামলার পর এই ঘোষণায় কিছুটা স্বস্তি এসেছে। তবে অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, ট্রাম্প বহুবার চুক্তি হওয়ার ঘোষণা দিলেও বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি। ফলে এবারও চুক্তি বাস্তবায়ন হবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনিই এই চুক্তিতে সম্মতি দিয়েছেন বলেও তিনি বুঝেছেন।
সব মিলিয়ে যুদ্ধবিরতি সত্যিই কার্যকর হবে, নাকি এটি আবারও ব্যর্থ আলোচনার একটি অধ্যায় হয়ে থাকবে— তা নির্ভর করছে আগামী কয়েক দিনের কূটনৈতিক অগ্রগতির ওপর।
চুক্তি আসন্ন বলে দাবি ট্রাম্পের, ইরানের অস্বীকৃতি
চলমান সংঘাতের অবসানে ইরানের সঙ্গে একটি চূড়ান্ত চুক্তি হতে যাচ্ছে বলে আবারও দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তবে তেহরান জানিয়েছে, এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি এবং সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে যেসব খবর প্রকাশিত হচ্ছে, সেগুলো ‘অনুমাননির্ভর।ব্রেকিং নিউজ
সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বৃহস্পতিবার (১২ জুন) ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতা হয়েছে, যার মূল লক্ষ্য হলো- ইরান যেন কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে। তিনি বলেন, আমরা এমন একটি চুক্তি করছি যাতে ইরান কখনো পারমাণবিক অস্ত্র পাবে না। পুরো সংঘাতের মধ্য দিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যই ছিল এটি। এটি বড় একটি অর্জন।
ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় নথিপত্রের কাজ প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই তা সম্পন্ন হতে পারে। এরপর ইউরোপে একটি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানও অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে তিনি ইঙ্গিত দেন। তিনি বলেন, চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেই বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেয়া হবে।
ইরানের পাল্টা বক্তব্য
তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই ট্রাম্পের বক্তব্যকে খণ্ডন করে বলেন, সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে যে খবর ছড়িয়েছে তা কেবল অনুমানভিত্তিক। তার ভাষায়, এখনও কিছুই চূড়ান্ত হয়নি। তিনি জানান, সমঝোতা স্মারকের অধিকাংশ অংশ নিয়ে কাজ শেষ হলেও যুক্তরাষ্ট্র শেষ মুহূর্তে অতিরিক্ত কিছু দাবি ও নতুন শর্ত যুক্ত করেছে। বাঘাই জোর দিয়ে বলেন, ইরান তার রেড লাইন থেকে একচুলও সরে আসবে না।
সংঘাতের পটভূমি
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় ব্যাপক হামলা চালায়। এর জবাবে ইরান ইসরাইল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর ওপর হামলা চালায়। একই সঙ্গে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দেয়।
পরবর্তীতে গত ৮ এপ্রিল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি হলেও দুই পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় গোলাগুলি ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা অব্যাহত থাকে। বিশেষ করে চলতি সপ্তাহে উভয় পক্ষ পরস্পরের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়েছে।
নেতানিয়াহুর সঙ্গে ট্রাম্পের আলোচনা
ট্রাম্প জানান, তিনি ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন নেতার সঙ্গে কথা বলেছেন। তার দাবি,পুরো মধ্যপ্রাচ্যই খুব খুশি। অন্যদিকে নেতানিয়াহুর কার্যালয় এক বিবৃতিতে জানায়, ইসরাইল সম্ভাব্য সমঝোতা স্মারকের কোনো পক্ষ নয়। তবে তারা এমন একটি চূড়ান্ত চুক্তিকে সমর্থন করে, যাতে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অপসারণ, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ অবকাঠামো ধ্বংস, ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে সীমাবদ্ধতা এবং আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর প্রতি ইরানের সমর্থন বন্ধ করার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
হামলার হুমকি ও উত্তেজনা
চুক্তিতে আশাবাদী মন্তব্য করার কয়েক ঘণ্টা আগে বৃহস্পতিবার ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র রাতেই ইরানের ওপর খুব কঠোর হামলা চালাতে পারে। সেই সঙ্গে তিনি ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপসহ অন্যান্য জ্বালানি অবকাঠামোর নিয়ন্ত্রণ নেয়ারও হুমকি দেন। খার্গ দ্বীপ দিয়ে ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ তেল রপ্তানি হয়ে থাকে।
এর জবাবে ইরানের সামরিক বাহিনী সতর্ক করে জানায়, নতুন কোনো হামলা হলে আগের চেয়ে আরও কঠোর প্রতিশোধ নেয়া হবে। এক বিবৃতিতে তারা বলে,তেল ও গ্যাস রপ্তানি হয় সবার জন্য, নয়তো কারও জন্যই হবে না।
ইরানের শীর্ষ আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফও যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে বলেন, ভুল কৌশল ও আবেগপ্রসূত সিদ্ধান্ত এমন এক অন্তহীন জলাভূমি তৈরি করবে, যেখানে আপনাদের বহু বছর আটকে থাকতে হবে।
তবে বৃহস্পতিবার রাতেই ইরানে হামলার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন ট্রাম্প। এরপর এক ঘোষণায় জানান, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র আর হামলা চালাচ্ছে না এবং দেশটির সঙ্গে শিগগিরই চুক্তি হচ্ছে। তবে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে ভিন্ন বার্তা দিয়েছে। দেশটি জানিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো চুক্তি করছে না।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সব মিলিয়ে ট্রাম্প সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে আশাবাদী অবস্থান নিলেও তেহরান এখনো সতর্ক। ফলে যুদ্ধবিরতি স্থায়ী শান্তিতে রূপ নেবে, নাকি নতুন করে সংঘাত আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে- তা নির্ভর করছে আগামী কয়েক দিনের কূটনৈতিক আলোচনার ওপর।
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats