সামরিক দিক থেকে একসঙ্গে দুই মহাক্ষমতাধর দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হচ্ছে ইরানকে। এই দুই দেশের মধ্যে একটি বিশ্বের এক নম্বর পরাশক্তি। সেই তুলনায় অপেক্ষাকৃত দুর্বল ইরান নিজেদের সক্ষমতার ওপর ভর করেই সেই দুই শক্তিশালী দেশকে প্রতিরোধ করে আসছে তিন মাসের বেশি সময় ধরে।
জেনেভায় তেহরান-ওয়াশিংটন শান্তি আলোচনার মধ্যেই গত ২৮ ফেব্রুয়ারি রাতে আচমকা মধ্যপ্রাচ্যের খনিজসমৃদ্ধ ও প্রাচীন সভ্যতার উত্তরাধিকার দেশটির ওপর হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও এর প্রধান মিত্র ইসরায়েল।
সব আন্তর্জাতিক আইনকে উপেক্ষা করে ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ দেশটির শীর্ষ সামরিক ও বেসামরিক নেতাদের হত্যার পথ বেছে নেয় গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের ধ্বজাধারী দেশ দুটি। এরপর, হামলা-প্রতিহামলা চলতে থাকে দিনের পর দিন ও মাসের পর মাস।
গত ২ জুন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরান যুদ্ধের ৯৫তম দিনে লন্ডনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডলইস্ট আই-এর এক মতামতের শিরোনাম করা হয়—‘ইরান কি নতুন আঞ্চলিক পরাশক্তি?’
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক গবেষণা ফেলো ও তেহরানের ইনস্টিটিউট ফর মিডল ইস্ট স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের পরিচালক কায়হান বারজেগার তার মতামতে বলেন, ‘যুদ্ধ শুরুর পর ইরানের জাতীয় ও সামাজিক পরিমণ্ডলে যে জোরালো ঐক্য দেখা গিয়েছে তাতে বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধেই আপামর জনতার দাবি স্পষ্ট হয়।’এটি ইরানকে বাড়তি সুবিধা দিয়েছে বলেও মন্তব্য করেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বারজেগার।
তার মতে, এমন পরিস্থিতি আগ্রাসী শক্তিগুলোর সামরিক প্রযুক্তির শ্রেষ্ঠত্বকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। আজ ইরানের এই প্রতিরোধ শুধু নিজ দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং তা পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে বলেও মনে করেন তিনি।
কায়হান বারজেগার আরও বলেন, চলমান যুদ্ধ ও ২০২৫ সালের জুনে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ১২ দিনের যুদ্ধের আগে তেহরান আঞ্চলিক মিত্র তথা লেবানন, সিরিয়া, ইরাক ও ইয়েমেনের ‘প্রতিরোধ যোদ্ধাদের’ মাধ্যমে ‘আক্রমণাত্মক প্রতিরোধের’ কৌশল মেনে চলতো।
কিন্তু, চলমান যুদ্ধ বুঝিয়ে দিলো—শত্রুর বিরুদ্ধে চাল দেওয়ার মতো আরও অনেক ঘুঁটি ইরানের হাতে আছে।
এর মাধ্যমে বোঝা গেল, গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত হরমুজ প্রণালীর ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখার সক্ষমতা ইরানের আছে। বৈশ্বিক তেল সরবরাহের এই গুরুত্বপূর্ণ পথ অবরুদ্ধ করে দেনদরবার করার ক্ষমতা ইরানের আছে।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান এই যুদ্ধ ভৌগোলিক ও ভূ-রাজনৈতিক প্রতিরোধ কৌশলের দিক থেকে পারস্য উপসাগরীয় দেশটিকে নেতৃস্থানীয় অবস্থানে এনে দিয়েছে।
স্ব-উদ্ভাবিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা
সংবাদমাধ্যম মিডলইস্ট আই-এর মতামতটিতে আরও বলা হয়—ইরানের ভূ-প্রকৃতি একটি কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানের মিত্রদের অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা ও প্রতিরোধ চালিয়ে যাওয়ার মনোবল ফিরিয়ে এনেছে।
বহু বছর ধরে পশ্চিমের দেশগুলো এই বার্তাই প্রচার করে আসছিল যে আঞ্চলিক ‘প্রতিরোধ যোদ্ধারা’ ইরানের হাতের পুতুল। তারা ইরানের জাতীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য কাজ করছে।
কিন্তু, ইরানের স্ব-উদ্ভাবিত প্রতিরোধ ব্যবস্থা ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে লেবাননের হিজবুল্লাহকে সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি প্রমাণ করছে যে ইরান তার আঞ্চলিক মিত্রদের আক্ষরিক অর্থেই গুরুত্ব দেয়।
ইসরায়েল যদি লেবাননে হামলা অব্যাহত রাখে তাহলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে চলমান যুদ্ধবিরতি আলোচনা থেকে তেহরান নিজেদের সরিয়ে নেবে। অর্থাৎ, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির আলোচনায় সব পক্ষকে যুক্ত করতে হবে।
এমন পরিস্থিতি বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ইরানের আঞ্চলিক ভূমিকাকে কার্যকরভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। পাশাপাশি, এটি মধ্যপ্রাচ্য বা পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোয় মার্কিন সামরিক ঘাঁটির যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে ইসরায়েলকে এতদিন যেভাবে দেখা হতো সেই দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন এসেছে।
কায়হান বারজেগার তার লেখায় বলেন—ইরান যুদ্ধের আগে, বিশেষ করে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের আগ পর্যন্ত ইসরায়েল নিজের আঞ্চলিক একাধিপত্য তুলে ধরার চেষ্টা করে এসেছে।
পশ্চিমের দেশগুলোর সমর্থন নিয়ে তেল আবিব মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ওপর একতরফা হামলা চালিয়েছে। পশ্চিমের দেশগুলো ইসরায়েলের সেসব হামলার বৈধতাও দিয়ে এসেছে।
সামরিক দিক থেকে ইরানের প্রতিরোধ ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক দিক থেকে দেশটির টিকে থাকা আজ ইসরায়েলের প্রচণ্ড মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এখন এমন কথা উঠেছে যে—এই সংঘাতের মধ্য দিয়ে ইসরায়েল নয়, বরং ইরান আঞ্চলিক ‘পরাশক্তি’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
যৌথ নিরাপত্তা ভাবনা
দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে ‘যৌথ নিরাপত্তা’ ভাবনা প্রাধান্য পেয়ে আসছিল। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধ সেই চিরায়ত ভাবনায় ছেদ ঘটিয়েছে।
ইরান কি ভেঙে যাবে?
যুদ্ধের আগ পর্যন্ত ভাবা হতো যে, ‘যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থার’ মাধ্যমে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা আনা সম্ভব। কিন্তু, চলমান যুদ্ধ সেই ভাবনাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
সেই অঞ্চলের আরব দেশগুলো নতুন নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে দ্বিধায় পড়েছে। কেননা, বহু বছর ধরে সেসব দেশ নিজেদের মাটিতে মার্কিন ঘাঁটি বসিয়ে বহু অর্থ খরচ করে ফেলেছে। তারা বহু অর্থ খরচ করে মার্কিন সমরাস্ত্র কিনেছে। অথচ, মার্কিনিরা তাদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
বিশ্ববাসী দেখেছে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনগুলো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় কী ধ্বংসলীলা চালিয়েছে।
কায়হান বারজেগার বলছেন—উপসাগরীয় দেশগুলো এখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কে ভারসাম্য আনার কথা ভাবছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত দিন শেষে কোথায় গিয়ে থামে, এর ওপর নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক-নিরাপত্তার সমীকরণ।
উপসাগরীয় দেশগুলো এখন বিবদমান পক্ষগুলোর মধ্যে টেকসই শান্তির জন্য ক্রমাগত চেষ্টা করে যাচ্ছে। আরব নেতাগুলোর ক্রমাগত অনুরোধ সেই বার্তাই তুলে ধরছে। তারা ইরানকে ছাড় দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে শান্তি চুক্তি করার অনুরোধ করে আসছে।
বিবদমান পক্ষগুলোর মধ্যে আসলেই কে শক্তিশালী, কার সক্ষমতা কতটুকু ও আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যের দিক থেকে কে এগিয়ে তা সম্ভবত এই যুদ্ধের মাধ্যমে পরিষ্কার হবে। তবে সন্দেহ নেই যে, এই যুদ্ধ ইরানকে তার নিজের সামরিক শক্তি ও কৌশলগত বাধাগুলোকেও বুঝতে সক্ষম করবে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বারজেগার মনে করেন—সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইরানের পররাষ্ট্রনীতি অল্প সময়ের জন্য হলেও বদলে গেছে। বিশেষ করে, পরমাণু ইস্যু থেকে ভূ-রাজনৈতিক সুবিধাগুলো দেশটির প্রতিরোধ কৌশল নির্ধারণে বিশেষ ভূমিকা রাখছে।
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats