জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্যপদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে জোর প্রচারণা চালানোর পরও জিততে ব্যর্থ হয়েছে জার্মানি। ব্যর্থ হওয়ার পর রাশিয়াকে দায়ী করেছে দেশটি। জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোহান ওয়াডেফুল বলেছেন, ইউক্রেন ও ইসরাইলের প্রতি বার্লিনের দৃঢ় সমর্থনের কারণে অনেক দেশের ভোট হারাতে হয়েছে। একই সঙ্গে রাশিয়া জার্মানির বিরুদ্ধে সক্রিয় প্রচারণা চালিয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি। বুধবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে অনুষ্ঠিত ভোটে নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্যপদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জার্মানি। তবে পশ্চিম ইউরোপ ও অন্যান্য রাষ্ট্রের (ওয়েস্টার্ন ইউরোপিয়ান অ্যান্ড আদার্স গ্রুপ) দুটি আসনে জয়ী হয় পর্তুগাল ও অস্ট্রিয়া। পর্তুগাল পায় ১৩৪ ভোট, অস্ট্রিয়া ১৩১ ভোট এবং জার্মানি পায় ১০৪ ভোট।
ফল ঘোষণার পর ওয়াডেফুল এ ঘটনাকে ‘তিক্ত পরাজয়’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ইউক্রেনের প্রতি জার্মানির অটল সমর্থন অনেক দেশের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। রাশিয়া যে নিরাপত্তা পরিষদে জার্মানির মতো একটি কণ্ঠস্বর দেখতে চায় না, সেটিও কোনো গোপন বিষয় নয়। তার দাবি, রাশিয়া জার্মানির বিরুদ্ধে ব্যাপক লবিং করেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্য সংকটে ইসরাইলের প্রতি জার্মানির বিশেষ দায়িত্ববোধও ভোট কম পাওয়ার একটি কারণ হতে পারে। তিনি উল্লেখ করেন, কিছু আন্তর্জাতিক ইস্যুতে জার্মানির অবস্থান সব সদস্য রাষ্ট্রের সঙ্গে মেলে না। রাশিয়া এ অভিযোগের কোনো তাৎক্ষণিক জবাব দেয়নি।
কী এই জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ? জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ (ইউএনএসসি) হলো জাতিসংঘের সবচেয়ে ক্ষমতাধর অঙ্গ। আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার প্রধান দায়িত্ব এ পরিষদের ওপর ন্যস্ত। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার সময়ই নিরাপত্তা পরিষদ গঠন করা হয়, যাতে ভবিষ্যতে বড় ধরনের আন্তর্জাতিক সংঘাত প্রতিরোধ করা যায়। নিরাপত্তা পরিষদ জাতিসংঘের একমাত্র সংস্থা, যা আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কোনো দেশের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ, অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা জারি, শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েন কিংবা সামরিক শক্তি ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে এ পরিষদের।
পরিষদে মোট ১৫টি সদস্য দেশ থাকে। এর মধ্যে পাঁচটি স্থায়ী সদস্য যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, চীন ও ফ্রান্স। এ দেশগুলোকে সাধারণভাবে ‘পি-৫’ বলা হয়। তাদের প্রত্যেকের হাতে রয়েছে ভেটো ক্ষমতা। অর্থাৎ কোনো প্রস্তাবের পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন থাকলেও স্থায়ী সদস্যদের একজন আপত্তি জানালে সেই প্রস্তাব পাস হয় না। বাকি ১০টি সদস্য অস্থায়ী। তারা দুই বছরের জন্য নির্বাচিত হয়। এ সব রাষ্ট্র ভেটো ক্ষমতা ভোগ করে না। প্রতি বছর পাঁচটি নতুন দেশ নির্বাচিত হয়ে পরিষদে যোগ দেয়। আঞ্চলিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে আফ্রিকা, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চল এবং পশ্চিম ইউরোপ ও অন্যান্য রাষ্ট্রের জন্য নির্দিষ্ট আসন বরাদ্দ থাকে।
নতুন সদস্য কারা? এবার নির্বাচিত পাঁচটি নতুন অস্থায়ী সদস্য দেশ হলো অস্ট্রিয়া, কিরগিজস্তান, পর্তুগাল, ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগো এবং জিম্বাবুয়ে। তারা ২০২৭ সালের ১লা জানুয়ারি থেকে দায়িত্ব গ্রহণ করবে এবং ২০২৮ সালের শেষ পর্যন্ত পরিষদে থাকবে। কিরগিজস্তান প্রথমবারের মতো নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছে। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের আসনের জন্য ফিলিপাইনের সঙ্গে চার দফা ভোটের পর তারা প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন অর্জন করে।
জার্মানির জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ ছিল এই আসন? জার্মানি বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী অর্থনীতির দেশে। একই সঙ্গে তারা জাতিসংঘের দ্বিতীয় বৃহত্তম আর্থিক সহয়তাকারী দেশ। দীর্ঘদিন ধরেই দেশটি নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদ পাওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে। জাপান, ভারত ও ব্রাজিলের সঙ্গে মিলে জার্মানি পরিষদ সংস্কারের পক্ষে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। চ্যান্সেলর ফ্রিডরিক মের্ৎস ক্ষমতায় আসার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জার্মানির ভূমিকা আরও জোরালো করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ফলে অস্থায়ী সদস্যপদ অর্জনকে বার্লিন কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে দেখছিল। এ কারণে ভোটে পরাজয়কে জার্মানির জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
ফলাফলের পর মের্ৎস বলেন, দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে আমরা প্রার্থী হয়েছিলাম, কিন্তু লক্ষ্য অর্জন করতে পারিনি। তবে এতে জাতিসংঘে জার্মানির দায়িত্ব ও ভূমিকার কোনো পরিবর্তন হবে না। বহুপক্ষীয় আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবেই জার্মানি কাজ চালিয়ে যাবে। জাতিসংঘে আর্থিক অবদানের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পর দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে জার্মানি। নির্বাচনের আগে ওয়াডেফুল নিরাপত্তা পরিষদে সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নেন এবং বিশ্ব মানচিত্রের দক্ষিণের দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর আহ্বান জানান। অন্যদিকে মঙ্গলবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা খলিলুর রহমান। আগামী সেপ্টেম্বরে শুরু হওয়া অধিবেশনে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।
সূত্র: ডয়েচে ভেলে, রয়টার্স
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats