প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া থেকে বিরত রাখতে বুধবার একটি প্রস্তাব অনুমোদন করেছে রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ
ইরানের অভ্যন্তরে দীর্ঘ সময় ধরে চালানো যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক সামরিক অভিযান বা হামলা বন্ধ করা হয়েছে বলে ঘোষণা করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছেন যে মধ্যপ্রাচ্যকে যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দেওয়া কয়েক মাসের সংঘাতের পর অবশেষে মার্কিন সামরিক অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ তার নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।
বুধবার (৩ জুন) মার্কিন আইনপ্রণেতাদের সামনে দেওয়া এক বিবৃতিতে রুবিও বলেন, ওয়াশিংটন এখন আর ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে দেশটির ভেতরে কোনো ধারাবাহিক ও অনবরত আক্রমণ পরিচালনা করছে না।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া থেকে বিরত রাখতে বুধবার একটি প্রস্তাব অনুমোদন করেছে রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ। এই ভোটের মাধ্যমে তিন মাস ধরে চলা এ সংঘাত নিয়ে ট্রাম্পের নিজের দলের আইনপ্রণেতাদের মধ্যেই ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।
প্রতিনিধি পরিষদে প্রস্তাবটি ২১৫-২০৮ ভোটে পাস হয়। কংগ্রেসের যুদ্ধ ক্ষমতা প্রস্তাবের (ওয়ার পাওয়ার্স রেজোলিউশন) পক্ষে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে যোগ দিয়ে ভোট দেন চারজন রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আইনপ্রণেতাদের কাছে যুক্তি দিয়ে বলেন, এই সামরিক অপারেশনটি সফলভাবে ইরানের প্রতিরক্ষা-শিল্প ঘাঁটির একটি বড় অংশ ধ্বংস করেছে এবং একই সঙ্গে তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা ও ড্রোনের মজুত উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমিয়ে এনেছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে বিক্ষিপ্ত কিছু সহিংসতার ঘটনা ঘটলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি বজায় থাকার সময়েই রুবিওর এই বক্তব্য সামনে এলো।
এই যুদ্ধবিরতির মাঝেই সাম্প্রতিকতম চরম উত্তেজনার অংশ হিসেবে কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইরানের একটি বড় ড্রোন হামলা আঘাত হানে, যার ফলে একটি যাত্রীবাহী টার্মিনাল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, একজন ভারতীয় নাগরিক নিহত হন এবং আরও ডজনখানেক মানুষ আহত হন। এই ভয়াবহ হামলার কারণে বিমানবন্দরটি সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায় এবং এর আগে যারা নিজেদের এই সংঘাত থেকে নিরাপদ মনে করেছিল, সেই উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা দুর্বলতা নিয়ে নতুন করে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
চলতি বছরে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ এখন চতুর্থ মাসে পদার্পণ করেছে, যা একই সঙ্গে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে তীব্র চাপ সৃষ্টি করে চলেছে। ইরান এখনো বিশ্বজুড়ে তেল ও গ্যাস রপ্তানির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ‘হরমুজ প্রণালী’-এর ওপর নিজস্ব সামরিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে এবং এর বিপরীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের প্রধান প্রধান সমুদ্রবন্দরগুলোর ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও নিষেধাজ্ঞা জারি রেখেছে।
মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসন জানিয়েছেন যে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওই নৌপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে আন্তর্জাতিক মিত্রদের সঙ্গে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে কাজ করছেন এবং এই পরিস্থিতিকে স্থিতিশীল করার জন্য এটিকে ‘চূড়ান্ত অংশ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
রুবিও আইনপ্রণেতাদের আশ্বস্ত করে আরও বলেছেন যে তেহরানের সঙ্গে চলমান কূটনৈতিক আলোচনা এবং প্রচেষ্টা এখনো পুরোপুরি সক্রিয় রয়েছে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে ২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তির মতো কোনো দুর্বল চুক্তি আবার হতে পারে কি না— এমন উদ্বেগের জবাবে রুবিও জোর দিয়ে বলেন, ভবিষ্যতের যেকোনো চুক্তি অবশ্যই আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠোর হবে।
যৌথ ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা বা জেসিপিওএ-এর কথা উল্লেখ করে তিনি স্পষ্ট করেন যে শেষ পর্যন্ত তারা যদি কোনো চুক্তি করেন তবে তা একটি ভালো ও শক্তিশালী চুক্তি হবে, অন্যথায় কোনো চুক্তিই হবে না এবং এটি নিশ্চিতভাবেই জেসিপিওএ-এর চেয়ে অনেক ভালো হবে, যা থেকে ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে বের হয়ে এসেছিলেন।
মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে ধাক্কা খেলেন ট্রাম্প
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া থেকে বিরত রাখতে বুধবার একটি প্রস্তাব অনুমোদন করেছে রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ।
এই প্রস্তাব অনুযায়ী, কংগ্রেস যদি আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ ঘোষণা না করে কিংবা সামরিক শক্তি ব্যবহারের অনুমতি না দেয়, তবে ট্রাম্পকে অবশ্যই ইরান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করতে হবে। হাউজ এবং সেনেট উভয় কক্ষেই নিজ দলের সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও এটি মার্কিন কংগ্রেসে ট্রাম্পের জন্য সর্বশেষ একটি ধাক্কা। তবে আপাতত এই ভোটটিকে বহুলাংশে প্রতীকী হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কারণ কোনো প্রস্তাব কার্যকর হতে হলে তা হাউজ এবং সেনেট, উভয় কক্ষেই পাস হতে হয়। এ ছাড়া কংগ্রেসের অনুমোদন পাওয়ার পরও যুদ্ধ ক্ষমতা সংক্রান্ত এই ধরনের প্রস্তাবের সাংবিধানিক বৈধতা কতটুকু থাকবে, তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। তা সত্ত্বেও, এই ভোটটি ট্রাম্পের যুদ্ধ পরিচালনার নীতি নিয়ে কিছু রিপাবলিকানের অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ এবং চতুর্থ মাসে পদার্পণ করা এই যুদ্ধে রাষ্ট্রপতির যুদ্ধ ক্ষমতা সীমিত করার ক্ষেত্রে একটি বিরল দ্বিদলীয় প্রয়াস।
এর আগে প্রতিনিধি পরিষদে এই সংক্রান্ত তিনটি প্রস্তাব পাসের চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল। তবে গত মাসে এই প্রস্তাবটি পাস হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিলে হাউজের রিপাবলিকান নেতারা আকস্মিকভাবে ভোটগ্রহণ স্থগিত করেছিলেন।
অন্যদিকে মার্কিন সেনেটেও গত মাসে সাতবার ব্যর্থ চেষ্টার পর একটি পৃথক কিন্তু অনুরূপ প্রস্তাবের ওপর প্রাথমিক প্রক্রিয়াগত ভোট সম্পন্ন হয়েছে। তবে সেনেটে এই বিষয়ে পরবর্তী ভোটের সময়সূচি এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।
প্রতিনিধি পরিষদে যে চারজন রিপাবলিকান এই যুদ্ধ ক্ষমতা প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছেন তারা হলেন, মিশিগানের টম ব্যারেট, ওহাইওর ওয়ারেন ডেভিডসন, পেনসিলভানিয়ার ব্রায়ান ফিটজপ্যাট্রিক এবং কেনটাকির থমাস ম্যাসি। ডেমোক্র্যাটদের কোনো সদস্যই এর বিপক্ষে ভোট দেননি। প্রতিনিধি পরিষেদের সাতজন সদস্য ভোটদানে বিরত ছিলেন।
বিগত কয়েক মাস ট্রাম্প নির্বিঘ্নে তার নীতি বাস্তবায়ন করলেও, সম্প্রতি তিনি নিজ দলের ভেতরেই বিরোধিতার মুখোমুখি হচ্ছেন।
শুধু ইরান যুদ্ধই নয়, জাতীয় নিরাপত্তা অভিজ্ঞতা না থাকা বিল পুল্টিকে জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মনোনীত করা এবং ট্রাম্পের রাজনৈতিক মিত্রদের জন্য একটি বিশেষ তহবিল গঠনের পরিকল্পনারও তীব্র সমালোচনা করেছেন রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারা।
একই দিনে হাউজে ইউক্রেইন সহায়তা আইনের ওপর ভোটের পথ সুগম করতে একটি প্রক্রিয়াগত প্রস্তাবও অনুমোদিত হয়েছে।
ডেমোক্র্যাটরা মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী কেবল আইনসভাই যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারে, প্রেসিডেন্ট নয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে গ্যাস, খাদ্য ও অন্যান্য পণ্যের দাম অত্যাধিক বেড়ে গেছে। গত এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদক পর্যায়ে মূল্যস্ফীতি গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats