বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অঘটনগুলোর তালিকা করতে গেলে ২০০২ বিশ্বকাপের ফ্রান্স-সেনেগাল ম্যাচের নাম অবধারিতভাবে আসে। আফ্রিকান দেশটির সেবারই প্রথমবার বিশ্বকাপে খেলা, আর তারাই কি না হারিয়ে দিলো আগের আসরের চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে। সেই হারের ধাক্কা কাটাতে পারেনি ফরাসিরা, ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হয়েও বিদায় নিতে হয়েছিল গ্রুপ পর্ব থেকে।
সেনেগালের বর্তমান কোচ পাপে থিয়াউ সেই ঐতিহাসিক ম্যাচের অংশ ছিলেন। যদিও মাঠে নামেননি, ছিলেন বদলি খেলোয়াড়ের তালিকায়। কিন্তু সেই সুখস্মৃতি এখনো সতেজ তার হৃদয়ে। এবারও প্রথম ম্যাচে সামনে ফ্রান্সকে পেয়ে থিয়াউ আগের ম্যাচ থেকেই অনুপ্রেরণা খুঁজছেন।
বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত ওই একবারই মুখোমুখি হয়েছে দুই দল। সে হিসেবে সেনেগালকে এখনো বিশ্বকাপ আসরে হারাতে পারেনি ফ্রান্স। আগের বার বদলি খেলোয়াড় হিসেবে বেঞ্চে থাকলেও এবার দলের সবচেয়ে গুরুদায়িত্ব থিয়াউয়ের কাঁধে। খেলোয়াড়ের পর কোচ হিসেবেও ফ্রান্সকে হারিয়ে চক্র পূরণ করতে চাচ্ছেন থিয়াউ, ‘এই ম্যাচে আমি কোচ হিসেবে ডাগআউটে থাকব, এটা আমার জন্য বিশেষ এক অনুভূতি। ২০০২ সালেও আমি বেঞ্চে ছিলাম, কিন্তু ম্যাচে সরাসরি কোনো প্রভাব রাখতে পারিনি। এবার আমার উপর বিশাল দায়িত্ব’।
সেনেগাল অবশ্য প্রেরণা খুঁজছে আরেকটি বিষয় থেকে। গত আফ্রিকা কাপ অব ন্যাশনসের বিতর্কিত ফাইনালে শুরুতে মরক্কোকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হলেও পরবর্তীতে বিতর্কের জেরে মরক্কোকে চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করা হয়। সেনেগাল সে সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করলেও এখনো সেই ফলাফল অমীমাংসিত অবস্থায় আছে। আফ্রিকান ফুটবলের আসল চ্যাম্পিয়ন তারাই, এটি এবার নিজেদের খেলা দিয়ে বিশ্বমঞ্চে প্রমাণ করতে চান থিয়াউ, ‘সাম্প্রতিক সময়ে আফ্রিকান ফুটবলে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। গত বিশ্বকাপেও আমরা সেটি দেখেছি। সেনেগাল যদি ফ্রান্সকে হারায় সেটিকে কি আর চমক বলা যায়? আমার মনে হয় বলা যায় না। কারণ আমাদেরও অনেক বিশ্বমানের খেলোয়াড় আছে’।
মাঠে সেয়ানে-সেয়ানে লড়াই হলেও একটি জায়গায় নিশ্চিতভাবেই ফ্রান্সের চেয়ে পিছিয়ে থাকবে সেনেগাল। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ভিসা নিষেধাজ্ঞার কারণে আফ্রিকান দেশটি থেকে সমর্থকগোষ্ঠী এবার গ্যালারিতে উপস্থিত থাকতে পারছে না। এবারই প্রথম নিজেদের সমর্থকগোষ্ঠী ছাড়া বিশ্বকাপ খেলতে হবে সেনেগালকে। বিষয়টি নিয়ে হতাশ দেশটির ফুটবল ফেডারেশনের সেক্রেটারি জেনারেল আবদুলআয়ে সোউ, ‘যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব নিয়ম-কানুন আছে। সেই নিয়মের কারণে আমরা আমাদের সমর্থকদের মাঠে পাব না। অবশ্যই এটি আমাদের জন্য আক্ষেপের। ফিফা পুরো বিষয়টি জানত। কিন্তু এখন আমাদের স্বাগতিক দেশের নিয়মকে শ্রদ্ধা জানিয়েই চলতে হবে’।
২০০২ এর পুনরাবৃত্তি ঘটাতে হলে এবার নিজেদের সর্বোচ্চ মানের ফুটবলই খেলতে হবে সেনেগালকে। কিলিয়ান এমবাপে, উসমান দেম্বেলে, মাইকেল ওলিসে- প্রত্যেকেই আছেন দুর্দান্ত ফর্মে। এবারের আসরের সবচেয়ে শক্তিশালী আক্রমণভাগ ফ্রান্সের কি না এমন আলোচনাও আছে। তবে সেনেগালেরও আছে সাদিও মানে, ইসমাইল সার, নিকোলাস জ্যাকসনের মতো ইউরোপীয় লিগে খেলার অভিজ্ঞতা সম্পন্ন স্ট্রাইকার। দুই দলের লড়াইটা তাই জমজমাটই হওয়ার কথা।
প্রতিশোধের আগুনে জ্বলছেন এমবাপ্পে
কেমন হবে ফ্রান্স-সেনেগাল লড়াই? ইস্ট রাদারফোর্ডের মেটলাইফ স্টেডিয়াম কি নতুন কোনো ইতিহাসের সাক্ষী হবে। এ নিয়ে বলাবলির অন্ত নেই। ইতিহাসটা বড় তিক্ত। অন্তত ফ্রান্সের জন্য। ২০০২ জাপান-কোরিয়া বিশ্বকাপে দুঃখের স্মৃতি নিয়ে বাড়ি ফিরেছিল ফ্রান্স। পরাজয়ের গ্লানি তাদের একদম কাবু করেছিল। লজ্জায় মুখ ঢেকে সেনেগালের কাছে পরাজয় মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল। চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয় ফুটবল দুনিয়ায়। এবার কী ঘটতে যাচ্ছে। সেবার তো ফ্রান্সের এমবাপ্পে ছিলেন না। তবে দুর্দান্ত এক টিম ছিল। মাত্র চার বছর আগেই ফ্রান্স বিশ্ব শিরোপা কব্জায় নিয়েছিল।
উদ্বোধনী ম্যাচে হেরে অনেকটাই বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে পড়েছিল ফ্রান্স। তাদের পতনের সূচনা এটাই। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে লিওনেল মেসি ফ্রান্সকে হতাশায় ডুবিয়েছিলেন। বলা হয়ে থাকে- ভাগ্যগুণে মেসি বাজিমাত করেছিলেন। পেনাল্টি শুট আউটে খেলার ভাগ্য নির্ধারিত হয়েছিল। ফ্রান্স ভক্তরা এখনো সে স্মৃতি মুছতে পারেননি। এবার হট ফেভারিটের তালিকায় রয়েছে ফ্রান্স। তাদের সঙ্গে রয়েছেন অভিজ্ঞ কোচ দিদিয়ে দেশম।
এটা তার শেষ বিশ্বকাপ। তিনি বিদায় নিলে সুপারস্টার জিনেদিন জিদান দায়িত্ব নেবেন। কোচ দিদিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করতে চান। তার বিশ্বাস- তিনি আবারো বিশ্বকে চমকে দেয়ার ক্ষমতা রাখেন। কারণ এবার ফ্রান্স টিম শুধুমাত্র এমবাপ্পেনির্ভর নয়। এমবাপ্পে বাড়তি শক্তি। প্রতিশোধের আগুনে তিনি জ্বলছেন। খেলোয়াড় ও কোচ উভয় ভূমিকায় একমাত্র জীবিত ব্যক্তি দিদিয়ে দেশম। চ্যালেঞ্জটা বড় কঠিন। ১৪টি ম্যাচ জেতানোর সাফল্য রয়েছে দিদিয়ের ঝুলিতে। ফরাসি গণমাধ্যম বলছে, ফ্রান্স যদি এবার গ্রুপ পর্বের তিনটি ম্যাচই জেতে তাহলে বিশ্বকাপের ইতিহাসে কোচ হিসেবে সর্বাধিক জয়ের রেকর্ড গড়বেন দেশম। ১৬ জয় নিয়ে যে রেকর্ডটি রয়েছে হেলমাট শোনের দখলে।
আর্লিং হালান্দের নরওয়েকে নিয়েই ফ্রান্সের ভয়টা অনেক বেশি। ম্যানচেস্টার সিটির গোল মেশিন হচ্ছেন হালান্দ। তার রয়েছে অপ্রতিরোধ্য গতি। হালান্দের সামনে বল মানেই গোল। নতুন এক বিশ্বরেকর্ডের কাছাকাছি তিনি। সাম্প্রতিক বিশ্বকাপ ইতিহাসও ফ্রান্সের পক্ষে। গত ৭টি বিশ্বকাপের মধ্যে চারটিতেই তারা ফাইনালে পৌঁছেছিল। গত ৪ঠা জুন প্রীতি ম্যাচে আইভরিকোস্টের কাছে ২-১ গোলে হেরে যাওয়ার পর ফ্রান্সের অবস্থান নিয়ে কিছুটা সংশয় তৈরি হয়। ফুটবলে এমনটা ঘটে। মাত্র চারদিন পর তারা নর্দান আয়ারল্যান্ডকে ৩-১ গোলে হারিয়ে দেয়। ফ্রান্সের আক্রমণভাগ যে কোনো টিমের জন্য ভয়ঙ্কর। বিশ্বকাপ রেটিংয়ে তারা এগিয়ে রয়েছে। চ্যাম্পিয়নের তালিকায় এবার ফ্রান্সকেই এগিয়ে রাখছেন কোচ, খেলোয়াড় ও সমর্থকরা।
ওদিকে আফ্রিকার অন্যতম ফুটবলশক্তি সেনেগাল বাছাইপর্বে কোনো খেলায় হারেনি। যদিও ২০২২ বিশ্বকাপে তারা গ্রুপ পর্বেই বাদ পড়েছিল। আফ্রিকা কাপ অব নেশন্স-২০২১ চ্যাম্পিয়ন সেনেগাল। বিতর্ক রয়েছে ২০২৫- এই মহাদেশীয় শিরোপা নিয়ে। আদালতে মামলা ঠুকেছে সেনেগাল। কনফেডারেশন অব আফ্রিকান এই সংস্থাটি মরক্কোর পক্ষে রায় দিয়েছিল। যা নিয়ে এখনো বিতর্ক জারি রয়েছে। ফ্রান্স শিবিরে কিছুটা উদ্বেগ ছিল। আর্সেনালের ডিফেন্ডার উইলিয়ামস সালিবাকে নিয়ে। চ্যাম্পিয়ন্স লীগে তিনি ইনজুরিতে পড়েছিলেন। গত দু’দিন তিনি পুরোদমে অনুশীলনে অংশ নিয়েছেন।
শুরুতেই বলেছিলাম এমবাপ্পের কথা। কিলিয়ান এমবাপ্পে ৫৬ গোল নিয়ে এবার বিশ্বকাপে এসেছেন। যা কিনা ফ্রান্সের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ডের কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। ওই রেকর্ডটি কেবল কাতার বিশ্বকাপে গড়া অলিভার জিরুর দখলে রয়েছে। সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে উঠতে পারেন তিনি। সেনেগালের গোল মেশিন সাদিও মানেকে দেখা যায়নি ২০২২ বিশ্বকাপে। ইনজুরি তার গতি রোধ করেছিল। বলা হচ্ছে- এবার তিনি দুর্দান্ত ফিট। মঙ্গলবারের এই হাইভোল্টেজ ম্যাচের দিকে তাকিয়ে ফুটবল বিশ্ব। ফ্রান্স যদি সেনেগালকে থামিয়ে দিতে পারে তাহলে বিশ্বকাপ পাওয়ার দৌড়ে থাকবে। হাজার হাজার ফ্রান্স ভক্ত ইতিমধ্যেই নিউ জার্সিতে পৌঁছেছেন। ঠাঁই নেই হোটেল-মোটেলে। এমনকি এয়ার বিএনবিতেও। অন্য শহরগুলোতেও সমর্থকদের প্রচণ্ড ভিড়। মেটলাইফ স্টেডিয়াম কি কোনো অঘটনের জন্ম দেবে? নাকি রচনা করবে নতুন কোনো ইতিহাস!
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats