জেলা শিক্ষা অফিসারের তদন্ত প্রতিবেদন এবং জেলা প্রশাসকের সুপারিশ চার মাস ধরে পড়ে আছে জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনে। সিন্ডিকেট করে চলছে প্রতিষ্ঠানবিনষ্টের অপপ্রচার।
সিলেট ইনক্লুসিভ স্কুল অ্যান্ড কলেজের সহকারী শিক্ষিকা মোছাঃ আকলিমা বেগমের বিরুদ্ধে নিয়োগের শর্ত ভঙ্গ, ছুটির নিয়ম লঙ্ঘন, কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া উচ্চতর শিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ, ছুটি না নিয়ে দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকা, কর্তৃপক্ষকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বিভিন্ন আবেদন, নিয়মিত ক্লাস করতে অনীহা, প্রতারণার মাধ্যমে মাতৃত্বকালীন ছুটি গ্রহণ, প্রশাসনিক নির্দেশনা অমান্য এবং প্রধান শিক্ষকসহ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অসদাচরণের গুরুতর অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। সম্প্রতি সিলেট জেলা শিক্ষা অফিসার তদন্ত শেষে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি ও সিলেটের জেলা প্রশাসকের বরাবরে প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন।
তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্কুলের শিক্ষা কার্যক্রমে বিঘ্ন সৃষ্টি ও চাকরিবিধি লঙ্ঘনকারী অভিযুক্ত শিক্ষিকার বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তাকে দ্রুত অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে সংযুক্ত করতে সমাজসেবা মন্ত্রণালয়ের অধীন জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বরাবরে চিঠি পাঠিয়েছেন সিলেটের জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম। কিন্তু প্রায় চার মাস অতিবাহিত হওয়ার পরও এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেয়নি জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন। জানা গেছে, স্বামীর খুঁটির জোরে এই শিক্ষিকা বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। তার সঙ্গে রয়েছেন তিনজন খণ্ডকালীন শিক্ষক, যারা প্রতিদিন শিক্ষক মিলনায়তনে বসে উসকানিমূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কার্যক্রমে বিঘ্ন সৃষ্টি করছেন।
অভিযোগ রয়েছে, নিজের অপরাধকর্ম ধামাচাপা দিতে শিক্ষিকা মোছাঃ আকলিমা বেগম কতিপয় খণ্ডকালীন শিক্ষককে নিয়ে একটি সিন্ডিকেট গড়ে প্রধান শিক্ষিকার বিরুদ্ধে বিভিন্ন মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগ তুলে সরকারের বিভিন্ন শীর্ষ পর্যায়ে বেনামি পত্র দিয়ে প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করছেন। তারা স্কুলের শিক্ষক মিলনায়তনে বসে স্কুলের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি, জেলা প্রশাসক, তদন্তকারী জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও প্রধান শিক্ষিকা সম্পর্কে নানা কুরুচিপূর্ণ আলোচনা ও বিষোদ্গার করেন। কর্তৃপক্ষ তাদের বারবার সতর্ক করার পরও তারা এসব অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন।

সিলেট মহানগরীর বাগবাড়ি এলাকায় প্রতিষ্ঠিত সিলেট ইনক্লুসিভ স্কুল অ্যান্ড কলেজ একটি বিশেষায়িত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যেখানে অটিজম ও অন্যান্য বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শিক্ষা, চিকিৎসা সহায়তা ও বিকাশমূলক কার্যক্রম অত্যন্ত সংবেদনশীলতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে পরিচালিত হয়ে থাকে। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষকের বেপরোয়া ও অশোভন আচরণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে।
শিক্ষিকা মোছাঃ আকলিমা বেগমের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে সিলেটের জেলা প্রশাসকের নির্দেশে তদন্ত শেষে গত ২ জানুয়ারি প্রতিবেদন প্রদান করেন সিলেট জেলা শিক্ষা অফিসার আবু সাঈদ মোঃ আব্দুল ওয়াদুদ। তদন্ত প্রতিবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, মোছাম্মৎ আকলিমা বেগমের কর্মকাণ্ড প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা এবং ‘প্রতিবন্ধিতা সম্পর্কিত সমন্বিত বিশেষ শিক্ষা নীতিমালা-২০১৯’-এর ধারা ২৩-এর পরিপন্থী। তার দাখিলকৃত শোকজ নোটিশের জবাবের ভাষা আরও সংযত ও মার্জিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। অটিজম ও এতিম শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তার অসদাচরণের সত্যতা রয়েছে, যা কোনো অবস্থাতেই কাম্য নয়। প্রতারণার মাধ্যমে তৃতীয় মাতৃত্বকে দ্বিতীয় মাতৃত্ব দাবি করে ছুটির আবেদন করেন এবং কমিটিকে চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে স্ববেতনে ছুটি ভোগ করেন। স্কুল ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং কমিটিকে না জানিয়ে আকলিমা সরাসরি প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনে সিনিয়র শিক্ষক হিসেবে পদোন্নতির জন্য আবেদন করেন, যা গত বছরের ২ অক্টোবর বাতিল হয়। তার এসব আচরণ অন্যান্য শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রভাবিত করতে পারে এবং প্রতিষ্ঠানের কর্মপরিবেশ বিনষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
জেলা শিক্ষা অফিসারের পাঁচ পাতার এই তদন্ত প্রতিবেদন গত ২৫ ফেব্রুয়ারি সুপারিশসহ জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বরাবরে প্রেরণ করেন সিলেটের জেলা প্রশাসক ও প্রতিষ্ঠানটির সভাপতি মোঃ সারওয়ার আলম। তিনি তার প্রেরিত পত্রে উল্লেখ করেন, স্কুলের প্রধান শিক্ষক, অন্যান্য শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মোছাম্মৎ আকলিমা বেগমের আচরণ সন্তোষজনক নয়। প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আদেশ অমান্য, অনুমতি ব্যতীত ছুটি ভোগ এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের কারণে তার বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন। তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে মোছাম্মৎ আকলিমা বেগমকে জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে দ্রুত সংযুক্তি দেওয়ার সুপারিশ করেন জেলা প্রশাসক। যা চার মাস ধরে পড়ে আছে প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনে।
জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন সমাজসেবা অধিদপ্তরের একটি প্রতিষ্ঠান। এই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমেই পরিচালিত হয় বিশেষায়িত এই স্কুল। জানা গেছে, সহকারী শিক্ষিকা মোছাঃ আকলিমা বেগমের স্বামী মোঃ আফিল উদ্দিন একজন সহকারী সমাজসেবা কর্মকর্তা। দুর্নীতির কারণে সম্প্রতি তাকে সিলেট থেকে নোয়াখালীতে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছিল। তদবিরের মাধ্যমে তিনি নোয়াখালী থেকে সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলায় বদলি হয়েছেন। স্বামী সমাজসেবায় চাকরি করার সুবাদে দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন আকলিমা বেগম। একজন শিক্ষক হিসেবে প্রতিষ্ঠানের কোনো আইনকানুন বা নিয়মনীতি তিনি মানতে রাজি নন বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনজন খণ্ডকালীন সহকারী শিক্ষককে নিয়ে তিনি সিন্ডিকেট গড়ে স্কুলের শিক্ষা কার্যক্রমে বিঘ্ন সৃষ্টি করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এরা হলেন মোঃ মিনহাজুল ইসলাম, মোঃ রুহুল আমিন এবং মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম। এদেরকে স্কুল কর্তৃপক্ষ একাধিকবার মৌখিকভাবে সতর্ক করেছে এবং একজনকে লিখিত কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করা হলেও তারা সংযত হননি। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে ইতোমধ্যে ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং কমিটির সভা আহ্বান করা হয়েছে বলে জেলা প্রশাসক কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে।
এই সিন্ডিকেট স্কুলের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এবং প্রধান শিক্ষিকার নামে আর্থিক নানা অপবাদ ও উদ্ভট অভিযোগ দিয়ে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে নামবিহীন আবেদন করেছে। শুধু তাই নয়, প্রধান শিক্ষিকার স্বামীর কর্মস্থলের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বরাবরে এসব ভুয়া আবেদনের কপিও পাঠিয়েছে। আর্থিক দুর্নীতির নানা অভিযোগ দেওয়া হলেও বাস্তবে জেলা প্রশাসক ও সমাজসেবার উপপরিচালকের যৌথ স্বাক্ষরে বিশেষায়িত এই স্কুলের হিসাব পরিচালিত হয়। আর্থিক কার্যক্রমের সঙ্গে প্রধান শিক্ষিকার কোনো সম্পর্ক নেই।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিলেট ইনক্লুসিভ স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রধান শিক্ষক ফারজানা ইশরাত মুঠোফোনে জানান, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও সংবেদনশীল। সহকারী শিক্ষিকা মোছাঃ আকলিমা বেগমসহ তিনজন খণ্ডকালীন শিক্ষকের কার্যক্রম সম্পর্কে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও সিলেটের জেলা প্রশাসকের নির্দেশে জেলা শিক্ষা অফিসার ইতোমধ্যে বিষয়টি তদন্ত করেছেন এবং অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য তদন্ত প্রতিবেদনসহ সুপারিশ জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের বরাবরে পাঠিয়েছেন জেলা প্রশাসক। তিনি প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও নীতিমালা অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনা এবং পারস্পরিক আস্থা বজায় রেখে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করে সিলেটের জেলা প্রশাসক মোঃ সারওয়ার আলম এবং জেলা শিক্ষা অফিসার আবু সাঈদ মোঃ আব্দুল ওয়াদুদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats