এসআইসহ ২ পুলিশ সদস্য বরখাস্ত, ঘটনা তদন্তে কমিটি, নাঈমের বাসায় সিএমপি কমিশনার
জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসানকে মারধরের অভিযোগে পুলিশের এক উপপরিদর্শকসহ (এসআই) দুজনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। আজ শনিবার দুপুরে ক্রিকেটার নাঈম হাসানের বাসায় গিয়ে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী।
নাঈম হাসানের বাসা চট্টগ্রাম নগরের চান্দগাঁওয়ের ফরিদারপাড়া এলাকায়। তাঁকে মারধরের ঘটনার বিষয়ে জানতে ও দুঃখ প্রকাশ করতে সেখানে যান সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী। পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী বলেন, অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে বিধিমোতাবেক সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এরই মধ্যে তাঁদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। বিভাগীয় মামলাও প্রক্রিয়াধীন। ঘটনায় অন্য কেউ জড়িত থাকলে তাঁদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এক প্রশ্নের জবাবে পুলিশ কমিশনার বলেন, ‘কারও ব্যক্তিগত অপরাধের দায় পুলিশ নেবে না। যাঁর দায় তাঁকেই নিতে হবে। জড়িতদের বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না।’

ক্রিকেটার নাঈম হাসানের বাসায় গিয়ে তাঁর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলছেন সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী। আজ দুপুরে চট্টগ্রাম নগরের ফরিদা পাড়ায়ছবি: সংগৃহীত
ঢাকায় প্রিমিয়ার লীগের খেলা শেষে বাসায় ফেরার পথে গতকাল শুক্রবার রাতে চট্টগ্রাম নগরের লালখান বাজার এলাকায় অটোরিকশা থেকে নামিয়ে নাঈমকে মারধর ও হেনস্তার অভিযোগ ওঠে পুলিশের বিরুদ্ধে। পরে তাঁকে থানায় নিয়ে গিয়েও হেনস্তা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
নাঈম হাসান সাংবাদিকদের জানান, রাতের ফ্লাইটে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে নামেন তিনি। সেখান থেকে অটোরিকশা করে বাসার উদ্দেশে রওনা হন। এক্সপ্রেসওয়ে থেকে নামার সময় লালখান বাজার এলাকায় পুলিশ অটোরিকশাটিকে থামার সংকেত দেয়। এরপর চালকের কাছ থেকে গাড়ির কাগজপত্র নিয়ে নেয় পুলিশ। পরে গাড়ি থেকে নামিয়ে নাঈম হাসানকে লাঠি ও পাইপ দিয়ে মারধর করেন খুলশী থানার এসআই শফিকুল ইসলাম ও পুলিশের সোর্স সোহেল। একপর্যায়ে একটি অটোরিকশায় করে নাঈমকে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। সেখানেও তাঁকে হেনস্তা করা হয়েছে। পরে বিসিবি কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপে থানা থেকে ছাড়া পেয়েছেন নাঈম।
এ ঘটনায় সাময়িক বরখাস্ত হওয়া দুই পুলিশ সদস্য হলেন খুলশী থানার এসআই শফিকুল ইসলাম, কনস্টেবল মো. রাসেল চৌধুরী। এর আগে গতকাল রাতেই তাঁদের খুলশী থানা থেকে প্রত্যাহার করে সিএমপির দামপাড়া পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত করা হয়। এদিকে এ ঘটনায় পুলিশের সোর্স সোহেলকেও আটক করা হয়েছে বলে জানান সিএমপি কমিশনার।
এর আগে ক্রিকেটার নাঈম হাসান রাতে সাংবাদিকদের জানান, ঢাকায় প্রিমিয়ার লিগের খেলা শেষ করে শুক্রবার রাত ৯টা ৪০ মিনিটের ফ্লাইটে চট্টগ্রাম আসার কথা ছিল তাঁর। তবে বিলম্ব হওয়ায় রাত ১০টা ২০ মিনিটে তিনি চট্টগ্রাম পৌঁছান। এরপর চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে অটোরিকশা করে বাসার উদ্দেশে রওনা দেন। অটোরিকশাটি এক্সপ্রেসওয়ে থেকে নামার পর লালখান বাজার এলাকায় পুলিশের এক সদস্য থামার সংকেত দেন।

নাঈম হাসান বলেন, থামাতেই কয়েকজন ডিবি পুলিশ পরিচয়ে চালকের কাছ থেকে কাগজপত্র নিয়ে নেন। এরপর তাঁকে নামিয়ে গলায় ধাক্কা দিয়ে পুলিশের গাড়িতে তোলার চেষ্টা করা হয়। তখন তিনি নিজেকে জাতীয় দলের ক্রিকেটার হিসেবে পরিচয় দেন, পরিচয়পত্রও দেখান। তবু তাঁকে ঘটনাস্থলে থাকা খুলশী থানার এসআই শফিকুল ইসলাম হাতে থাকা লাঠি দিয়ে কোমরে আঘাত করতে থাকেন। পুলিশের ওই এসআইয়ের সঙ্গে সাদা পোশাকে থাকা (পুলিশের সোর্স সোহেল) এক ব্যক্তিও হাতে থাকা পাইপ দিয়ে পেটান বলে জানান নাঈম হাসান।
মারধরের সময় ঘটনাস্থলে লোকজন জড়ো হয়ে যায় জানিয়ে জাতীয় দলের এই ক্রিকেটার বলেন, ‘প্রায় ১০০ থেকে ২০০ মানুষ জড়ো হয়ে আমার ক্রিকেটার পরিচয় দিলেও তারা মারধর থামায়নি। তারা বলছিল—তুই আসামি, চুপ থাক, একটা কথাও বলবি না।’
মারধরের একপর্যায়ে আরেকটি অটোরিকশায় তুলে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয় বলেও অভিযোগ করেন ক্রিকেটার নাঈম হাসান। তিনি বলেন, পুলিশের গাড়ি থাকলেও সেখানে তাঁকে তোলা হয়নি। মারধরের একপর্যায়ে তাঁকে থানায় নিয়ে যান এসআই শফিকুল। এরপর ওসির কক্ষে নেওয়া হয় তাঁকে। ওসির কক্ষেও তাঁকে হেনস্তা করা হয়েছে বলে জানান নাঈম। তিনি বলেন, ওসিকে তিনি যখন ঘটনার বিস্তারিত জানাচ্ছিলেন তখন ওসি বারবার বলেন চোখ নিচু করে কথা বলতে। এর মধ্যেই একটি ফোন পেয়ে ওসি শান্ত হন।
নাঈম হাসান আরও বলেন, ‘অটোরিকশা থেকে নামানোর পর আমার ফোন নিয়ে নেওয়া হয়। থানায় আসার পর ফোনটি পেয়ে আমি বিসিবির সভাপতি তামিম ইকবালকে ফোন করি। তিনি বিসিবির সদস্য ইসরাফিল খসরুকে বিষয়টি জানান। এরপর তাঁরা পুলিশের সঙ্গে কথা বলেন।’ তিনি বলেন, ‘আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই। আজকে আমার সঙ্গে হয়েছে। আমার জন্য অনেক লোক এসেছে থানায়। কিন্তু অন্য সাধারণ লোকের জন্য কেউ থানায় আসবে না। আর কাউকে যাতে এভাবে হয়রানির শিকার হতে না হয়।’
এ ব্যাপারে নগর পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) আমিরুল ইসলাম একটি জাতীয় দৈনিককে বলেন, ‘চোরাচালানের তথ্য ছিল অটোরিকশাটির বিরুদ্ধে। তবে এই তথ্য কতটুকু সঠিক যাচাই করা হচ্ছে। আর অভিযান চালানোর আগে নিয়ম অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জানানো হয়েছে কি না তা–ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযান কিংবা তল্লাশিতে পুলিশের কিছু নিয়মকানুন রয়েছে। বিষয়টি আমরা গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছি।’
পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) আমিরুল ইসলাম আরও বলেন, ‘অভিযান চালানোর নিয়ম রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছে, আপাতদৃষ্টিতে এখানে ভুলত্রুটি রয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিভাগীয় শাস্তির আওতায় আনা হবে।’
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ছুটিতে ঢাকায় রয়েছেন খুলশী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মনিরুল ইসলাম। তিনি এসআই শফিকুল ইসলামকে তথ্য দেন একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে সোনার চোরাচালান আসবে। এই তথ্যের ভিত্তিতে শফিকুল লালখান বাজার এলাকায় অভিযানে যান। মনিরুল একটি গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে চোরাচালানের এই তথ্য পেয়েছেন দাবি করেছেন। নাঈমকে পুলিশের মারধর ও থানায় নিয়ে যাওয়ার খবর পেয়ে রাতে থানায় ছুটে যান তাঁর বাবা মাহবুবুল আলম। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, বিমানবন্দর থেকে নামার পর নাঈমের সঙ্গে তাঁর কথা হয়। পরে নাঈম পুলিশের মারধর করার খবর জানায়।
নাঈমের বাবা অভিযোগ করেন, ‘খবর পেয়ে থানায় এলে ডিউটি অফিসার আমার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই।’
মধ্যরাতে নাঈমকে থানায় নিয়ে যাওয়ার পর সেখানে হাজির হন তাঁর আত্মীয়-স্বজন ও ক্রিকেটপ্রেমীরাও। ঘটনায় জড়িত পুলিশ সদস্যদের গ্রেপ্তার ও শাস্তির দাবি করেন তাঁরা। আজ শনিবার সকালে নাঈমের ভাই সাব্বির আলম বাদী হয়ে থানায় একটি মামলা করেন। এতে এসআই শফিকুল ইসলাম, কনস্টেবল রাসেল ও পুলিশ সোর্স সোহেলকে আসামি করা হয়। মামলায় মারধর ও অপহরণ চেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছে।
জানতে চাইলে খুলশী থানার ওসি আরিফুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘অভিযানের বিষয়ে এসআই শফিকুল ইসলাম আমাকে কিছু জানাননি। থানায় নিয়ে আসার পর ক্রিকেটার নাঈমের পরিচয় জানি। দুঃখ প্রকাশ করে সসম্মানে থানা থেকে তাঁকে চলে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়। তবে জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তি না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা থানা থেকে যাবেন না জানান। পরে এ ঘটনায় মামলা হয়েছে।’ ওসি বলেন, ‘এসআই শফিকুল ইসলাম, কনস্টেবল রাসেল ও অভিযানে থাকা আরেক কনস্টেবলকে তাৎক্ষণিক ক্লোজ করা হয়েছে।’
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats