দিল্লি বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানকে প্রায় আড়াই ঘণ্টা বসিয়ে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ ও হয়রানির ঘটনায় ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনারকে ডেকে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ। অনাকাঙ্ক্ষিত ও দুঃখজনক বললেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
ঢাকায় ভারতে ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার পবন বঢেকে আজ সোমবার দুপুরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানের সঙ্গে গতকাল রোববার দিল্লির বিমানবন্দরে যে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে, তাতে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে।
আজ সোমবার বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এর আগে দুপুরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেছেন, দিল্লির ঘটনাটি অনাকাঙ্ক্ষিত। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামও সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেন, দিল্লি বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার সঙ্গে যা হয়েছে, তা কোনোভাবেই প্রত্যাশিত নয়। ঘটনার বিস্তারিত খবর নিচ্ছে সংশ্লিষ্ট উইং।
কূটনৈতিক চিঠি দিয়ে আগে জানানোর পরও গতকাল রোববার সন্ধ্যায় ভারতের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ ‘রহস্যজনক কারণে’ প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানকে দিল্লিতে ঢুকতে বাধা দিয়েছে। পরে উচ্চ মহলের নির্দেশে অনুমতি দেওয়া হলেও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা দিল্লিতে না গিয়ে কলম্বো হয়ে আজ দুপুরে ঢাকায় ফিরেছেন।
আজ থেকে দিল্লিতে ইন্ডিয়ান ওশান রিম অ্যাসোসিয়েশনের (আইওআরএ) জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের দুই দিনের বৈঠক শুরু হওয়ার কথা। সেখানে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতা হিসেবে উপদেষ্টার অংশ নেওয়ার কথা ছিল।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার ফেরা ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’, ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে: পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দিল্লি বিমানবন্দর থেকে প্রধানমন্ত্রীর পলিসি ও স্ট্র্যাটেজিবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানের দেশে ফিরে আসার ঘটনায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানের দিল্লি বিমানবন্দর থেকে ফিরে আসার বিষয়টি অনাকাঙ্ক্ষিত ও দুঃখজনক। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যেই এ বিষয়ে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। আজ দিনশেষে আমরা এ বিষয়ে আপনাদেরকে জানাব।
এর আগে গতকাল রোববার সন্ধ্যায় দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এক ‘অপ্রীতিকর ঘটনার’ পর দেশে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন প্রধানমন্ত্রীর নীতি ও কৌশলবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘সিএনএন-নিউজ ১৮’ সূত্রের বরাত দিয়ে জানায়, নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট একটি নজরদারি তালিকায় (ওয়াচ লিস্ট) নাম থাকার কারণে দিল্লির ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ জাহেদ উর রহমানকে বিমানবন্দরে ‘কিছুক্ষণ আটকে’ রাখে। রুটিন তল্লাশির সময় তার নামটি ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের নজরে আসে এবং তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের জন্য তাকে সেখানে থামানো হয়।
জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টার কাছে কোনো কূটনৈতিক পাসপোর্ট ছিল না। তিনি সার্কের স্টিকারযুক্ত সাধারণ সবুজ পাসপোর্ট নিয়ে ভ্রমণে গিয়েছিলেন। তবে তার এই সফরের বিষয়টি নিশ্চিত করে নয়াদিল্লিতে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশন আগেই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে একটি কূটনৈতিক পত্র (নোট ভারবাল) পাঠিয়েছিল। এমনকি রোববার বিকেলে তাকে অভ্যর্থনা জানাতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহ নিজে দিল্লি বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন।
নয়াদিল্লির একটি সূত্র জানায়, বিমানবন্দরে জটিলতা তৈরির পর ‘উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপে’ ভারতীয় ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ শেষ পর্যন্ত তাকে ভারতে প্রবেশের অনুমতি দিয়েছিল। তবে বিমানবন্দরে এমন আচরণের পর উপদেষ্টা নিজেই দেশে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন এবং কলম্বো হয়ে ট্রানজিট নিয়ে দেশের উদ্দেশ্যে রওনা হন।
ঢাকায় ফিরে উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান কথা বললেন না
প্রধানমন্ত্রীর পলিসি ও স্ট্র্যাটেজি এবং তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান আজ সোমবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শ্রীলঙ্কার কলম্বো হয়ে ঢাকা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। এ সময় বিমানবন্দরে উপস্থিত সাংবাদিকেরা দিল্লির ঘটনা নিয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এদিকে, ঢাকার সরকারি সূত্রগুলো জানিয়েছে, দিল্লির বিমানবন্দরে বাংলাদেশের একজন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিনিধির সঙ্গে ঠিক কী ঘটেছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। সব তথ্য যাচাইয়ের পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এই সরকারি সফরের বিষয়ে গত শুক্রবারই (১২ জুন) দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে কূটনৈতিক পত্রের (নোট ভারবাল) মাধ্যমে অবহিত করেছিল। শুধু তাই নয়, দিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার এম রিয়াজ হামিদুল্লাহ ব্যক্তিগতভাবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে ফোনেও কথা বলেছিলেন।
এতকিছুর পরও গতকাল রোববার সন্ধ্যায় দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামার পর অভিবাসন কর্মকর্তারা উপদেষ্টাকে প্রায় আড়াই ঘণ্টা বসিয়ে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। ঢাকা ও দিল্লির কূটনৈতিক সূত্রগুলো একে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত ও রহস্যজনক’ বলে অভিহিত করেছে।
কেন আটকে দেওয়া হয়েছিল?
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম সিএনএন-নিউজ১৮ সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানের নাম ভারতের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত একটি নজরদারি তালিকায় (ওয়াচ লিস্ট) থাকায় এই জটিলতার সৃষ্টি হয়েছিল। দিল্লি বিমানবন্দরে নিয়মিত তল্লাশির সময় অভিবাসন কর্মকর্তারা তাঁকে শনাক্ত করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাময়িকভাবে আটকে রাখেন।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের দাবি, এটি মূলত একটি ‘প্রশাসনিক ত্রুটি’ ছিল। পরবর্তীতে অসঙ্গতিটি চিহ্নিত হওয়ার পর দেশটির উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপে দ্রুত বিষয়টির সমাধান করা হয় এবং উপদেষ্টাকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়।
জানা গেছে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ থেকে পরিচালিত কিছু ইনফ্লুয়েন্সার ও অ্যাক্টিভিস্টদের ইউটিউব চ্যানেল ভারতবিরোধী প্রচারণার অভিযোগে ভারতে ব্লক করা হয়েছিল। ভারতের নিরাপত্তা নজরদারি তালিকায় থাকা সেই তালিকায় ডা. জাহেদ উর রহমানের নামও যুক্ত ছিল।
উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান কূটনৈতিক পাসপোর্ট পাওয়ার যোগ্য হলেও, এই সফরে তিনি তাঁর সাধারণ পাসপোর্ট ব্যবহার করছিলেন বলে জানা গেছে। তবে কূটনৈতিক পত্রের কারণে তাঁর রাষ্ট্রীয় প্রটোকল পাওয়ার আইনি ভিত্তি ছিল।
দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ ও বিরক্ত হয়ে উপদেষ্টা নিজেই কর্মকর্তাদের কাছ থেকে নিজের পাসপোর্ট ফেরত চান এবং ভারতে প্রবেশ না করে পরবর্তী ফ্লাইটে দেশে ফেরার প্রস্তুতি নেন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে পরবর্তীতে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তাঁকে সসম্মানে ভারতে প্রবেশের অনুরোধ জানালেও, আত্মসম্মান ও প্রটোকল বজায় রাখতে ডা. জাহেদুর রহমান সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি দিল্লি থেকে কলম্বো হয়ে ঢাকার পথ ধরেন।
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats