যুদ্ধ বন্ধে একটি চুক্তিতে পৌঁছেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য এটি একটি চমৎকার ‘জন্মদিনের উপহার’ হিসেবে বিবেচিত হলেও, এই চুক্তি ঘিরে রয়েছে অনিশ্চয়তার মেঘ।
সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে এই চুক্তির খবরটি নিশ্চিত করেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি জানান, নতুন এই সমঝোতার আওতায় কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর থেকে তাদের নৌ-অবরোধ তুলে নেবে।
রোববার এই চুক্তির বিষয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে ট্রাম্প দাবি করেন, বিগত মার্কিন প্রেসিডেন্টদের ব্যর্থতার বিপরীতে তিনি এমন এক ‘চমৎকার চুক্তি’ নিশ্চিত করেছেন যা পুরো অঞ্চলে শান্তি বয়ে আনবে এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। ট্রাম্পের জন্য এই ধরনের বাড়িয়ে বলা অবশ্য নতুন কিছু নয়। গত বছর গাজা যুদ্ধ শেষ করার চুক্তি নিয়ে তার মন্তব্যগুলোও ছিল একই রকম নাটকীয়। তিনি সেটিকে 'চিরস্থায়ী শান্তি' এবং 'বিশ্বাস ও আশার যুগের শুরু' বলে অভিহিত করেছিলেন, যদিও বাস্তব পরিস্থিতি ছিল তার উল্টো। এ ধরনের বড় কূটনৈতিক চুক্তির জয়-পরাজয় মূলত নির্ভর করে তার বিস্তারিত শর্তাবলির ওপর। কিন্তু এই চুক্তির ক্ষেত্রে সেই বিস্তারিত তথ্যের বেশ অভাব রয়েছে।
মার্কিন ভাইস-প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স রবিবার ফক্স নিউজকে জানান, ইরান যেন কখনো পারমাণবিক অস্ত্র না পায়, তা এই চুক্তিতে নিশ্চিত করা হয়েছে এবং তারা বিষয়টি তদারকি করতে পারবেন। তবে মূল কিছু বিষয় নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। যেমন—ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার ওপর কী ধরনের বাধা থাকবে এবং ইরানের বর্তমান মজুত করা উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিয়ে কী করা হবে।
এই চুক্তির অনেক খুঁটিনাটি বিষয় বর্তমান অস্ত্রবিরতির বর্ধিত ৬০ দিনের মধ্যে পরবর্তী আলোচনা এবং কারিগরি দিক নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে কয়েক দশক ধরে ইরানকে তাদের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করতে প্ররোচিত ও বাধ্য করার চেষ্টার পর একটি বিষয় পরিষ্কার—এই চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র যা-ই নিশ্চিত হয়েছে বলে মনে করুক না কেন, প্রকৃতপক্ষে কোনো কিছুরই নিশ্চয়তা নেই।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, চুক্তি বা সমঝোতা স্মারকের অধীনে অন্য পক্ষের প্রতিশ্রুতিসমূহ বাস্তবায়িত হওয়ার আগে চূড়ান্ত আলোচনা শুরু করা হবে না। সেই প্রতিশ্রুতিগুলো আসলে কী এবং ইরান সেগুলোকে কীভাবে ব্যাখ্যা করে—তার ওপরই নির্ভর করবে এই চুক্তি শেষ পর্যন্ত টিকবে কি না।
এদিকে জ্বালানি বাজারের বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন দ্রুতই যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরে আসার সম্ভাবনা কম। ট্যাঙ্কারের দীর্ঘ জট কমানো, মাইন অপসারণ এবং তেলের নিয়মিত উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক করতে কয়েক সপ্তাহ সময় লেগে যেতে পারে।
চুক্তি সইয়ের আর মাত্র কয়েক দিন বাকি। এই সময়ের মধ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির সফলতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ খুঁটিনাটি বিষয়গুলো সমাধান করার সুযোগ পাবে—তবে একই সঙ্গে চুক্তিটি পুরোপুরি ভেস্তে যাওয়ারও যথেষ্ট ঝুঁকি রয়েছে।
এই সমীকরণে ইসরায়েল হলো আরেকটি অনিশ্চিত প্রভাবক।
এই যুদ্ধটি সবসময়ই ছিল ত্রিমুখী। গত রোববার ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প জানান, তিনি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ওপর অত্যন্ত ক্ষুব্ধ। ট্রাম্পের মতে, লেবাননে ইসরায়েলি হামলার নির্দেশ দিয়ে নেতানিয়াহু প্রায় চূড়ান্ত হওয়া ইরান চুক্তিটি পণ্ড করতে চেয়েছিলেন।
শেষ পর্যন্ত চুক্তিটি টিকে গেছে—অন্তত জনসমক্ষে ঘোষণা করার মতো সময় পর্যন্ত। কিন্তু ইসরায়েল যদি লেবাননে নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু করে, তবে ইরান আবারও হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে, যা বিশ্ব অর্থনীতিকে পুনরায় ঝুঁকির মুখে ফেলবে।
জে ডি ভ্যান্স তার মন্তব্যে জ্বালানির উচ্চমূল্য এবং এর ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকটের কারণে আমেরিকানদের যে কষ্ট হচ্ছে, তা স্বীকার করেছেন। তিনি আমেরিকানদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, এখন থেকে জ্বালানি তেলের দাম কমতে শুরু করবে।
তেলের দাম কত দ্রুত কমে এবং সাধারণ আমেরিকানদের জীবনযাত্রার ব্যয় হ্রাসে তা কতটা প্রভাব ফেলে—তার ওপরই নির্ভর করবে নভেম্বরের মধ্যবর্তী কংগ্রেসীয় নির্বাচনের আগে রিপাবলিকানদের ওপর বাড়তে থাকা রাজনৈতিক চাপ কমবে কি না।
সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, ট্রাম্প এবং তার দল ক্রমবর্ধমান জনঅসন্তোষের মুখে রয়েছে। ইউগভের একটি জরিপে দেখা গেছে, ৬৩ শতাংশ আমেরিকান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ট্রাম্পের ভূমিকায় অসন্তুষ্ট এবং ৫৭ শতাংশ মনে করেন যে অর্থনীতি আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে।
তবে অন্ততপক্ষে, রোববারের চুক্তিটি চলমান যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক চাপ পুরোপুরি দূর করতে না পারলেও তা লাঘব করতে সাহায্য করবে। যদি তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে শুরু করে, তবে আমেরিকানদের কাছে এটি একটি দৃশ্যমান লক্ষণ হবে যে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটছে।
যদিও ট্রাম্পের বৃহত্তর লক্ষ্যগুলো এখনও অর্জিত হয়নি এবং তিনি দেশে রাজনৈতিক ঝুঁকির মুখে রয়েছেন, তবুও যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরে যাওয়ার ক্ষেত্রে এই চুক্তি একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ।
চুক্তিতে পৌঁছাল যুক্তরাষ্ট্র-ইরান, স্পষ্ট নয় সব শর্ত
যুদ্ধের ইতি টানতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি চুক্তিতে সম্মত হয়েছে। এই চুক্তির আওতায় লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক তৎপরতা ‘অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে’ বন্ধের কথা বলা হয়েছে।
মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের পক্ষ থেকে আসা চুক্তির ঘোষণাটি ওয়াশিংটন ও তেহরান নিশ্চিত করেছে। আগামী ১৯ জুন সুইজারল্যান্ডে চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের দিন ধার্য করা হয়েছে। বার্তা সংস্থা এএফপির খবরে এমনটি বলা হয়েছে।
রোববার নিজের ৮০তম জন্মদিন উদযাপনকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে লেখেন, ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সঙ্গে চুক্তি এখন সম্পন্ন।’
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প লেখেন, ‘আমি হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ টোল-মুক্তভাবে চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার অনুমোদন দিচ্ছি এবং একইসঙ্গে মার্কিন নৌ-অবরোধ অবিলম্বে প্রত্যাহারের নির্দেশ দিচ্ছি। বিশ্বের জাহাজগুলো, তোমাদের ইঞ্জিন চালু করো। তেলের প্রবাহ চলুক।’
এর কিছু পরেই ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি টেলিভিশনে দেওয়া এক বক্তব্যে বলেন, এই চুক্তি দুই দেশের যুদ্ধের ‘অবিলম্বে অবসান’ ঘটিয়েছে এবং একটি ‘চূড়ান্ত চুক্তির’ লক্ষ্যে তারা আগামী দুই মাসের মধ্যে আলোচনায় বসবেন।
অবশ্য মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই লেবাননে ইরানের মিত্র হিজবুল্লাহর ওপর ইসরায়েলের হামলার প্রেক্ষাপটে তেহরান প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করেছিল। এতে চুক্তিটি পিছিয়ে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছিল। তবে দিনের শেষের দিকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ চুক্তির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে বলেন, উভয়পক্ষই লেবাননসহ সব রণাঙ্গনে অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে সামরিক অভিযান বন্ধ করছে। তিনি মধ্যস্থতা প্রচেষ্টায় সমর্থনের জন্য কাতার, সৌদি আরব এবং তুরস্কের নেতাদের ধন্যবাদ জানান।
সুযোগ হাতছাড়া করা উচিত নয়
চুক্তিটি ঘোষণার পর বিশ্বজুড়ে স্বস্তি নেমে এসেছে এবং মানুষ আশা করছে যে এর মাধ্যমে যুদ্ধের অবসান ঘটবে। জাতিসংঘের প্রধান আন্তোনিও গুতেরেস মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরাতে এটি একটি বিশাল পদক্ষেপ।
যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি ও ইতালির মতো ইউরোপের প্রভাবশালী দেশগুলো ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে। তারা বলেছে যে, এই সুযোগটি হাতছাড়া করা উচিত নয় এবং একটি স্থায়ী সমাধানের জন্য তারা সবার সঙ্গে মিলে কাজ করবে।
এই খবরের প্রভাবে সোমবার বিশ্ববাজারেও স্বস্তি দেখা গেছে। টোকিওতে তেলের দাম এক ধাক্কায় ৪ শতাংশের বেশি কমে গেছে এবং জাপানের শেয়ারবাজার চাঙা হয়ে উঠেছে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় বিশ্বজুড়ে তেল ও গ্যাসের দাম বেড়ে যায়। ফলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু করে বহু দেশে মূল্যস্ফীতি দেখা দেয় এবং চাষাবাদের জন্য প্রয়োজনীয় সারের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স বলেন, এই চুক্তির ফলে আমরা জ্বালানি খরচ কমিয়ে আনতে পারব এবং মধ্যপ্রাচ্যে নতুন অর্থনৈতিক জোয়ার সৃষ্টি হবে। তিনি জানান, জেনেভায় চুক্তি সই অনুষ্ঠানে তিনি উপস্থিত থাকবেন এবং সম্ভবত ডোনাল্ড ট্রাম্পও সেখানে যাবেন।
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats