কানাডার পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ আলবার্টার বিচ্ছিন্নতাবাদীরা সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছেন, তারা কানাডা থেকে স্বাধীনতার প্রশ্নে গণভোট আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক স্বাক্ষর সংগ্রহ করেছেন। বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতাদের দাবি, তারা এ সপ্তাহে নির্বাচন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রায় তিন লাখ স্বাক্ষর জমা দিয়েছেন, যা গণভোট বিবেচনার জন্য প্রয়োজনীয় ১ লাখ ৭৮ হাজার স্বাক্ষরের তুলনায় অনেক বেশি।
বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা মিচ সিলভেস্ট্রে বলেন, ‘আজকের দিনটি আলবার্টার ইতিহাসে ঐতিহাসিক’। তিনি আরও বলেন, ‘এটি পরবর্তী ধাপের প্রথম পদক্ষেপ—আমরা তৃতীয় রাউন্ড পার করেছি, এখন স্ট্যানলি কাপের ফাইনালে।’
আল জাজিরা বলছে, গণভোটে স্বাধীনতার পক্ষে ফল এলেও দীর্ঘ ও অনিশ্চিত একটি প্রক্রিয়া সামনে আসবে। এর মধ্যে আইনি চ্যালেঞ্জ এবং ফেডারেল সরকারের সঙ্গে আলোচনা অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। তার পরও সম্ভাব্য এই গণভোট কানাডার কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা নিয়ে আলবার্টার দীর্ঘদিনের অসন্তোষ এবং অধিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে।

গত ৪ মে কানাডার এডমন্টনে ইলেকশনস আলবার্টার কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত এক সমাবেশে জড়ো হন বিচ্ছিন্নতাবাদী সমর্থকেরা। ছবি: এএফপি
কত স্বাক্ষর সংগ্রহ করা হয়েছে?
বিচ্ছিন্নতাবাদীরা সোমবার জানান, তারা প্রায় ৩ লাখ ২ হাজার স্বাক্ষর জমা দিয়েছেন, যা গণভোট বিবেচনার জন্য নির্ধারিত সীমার চেয়েও বেশি। আলবার্টার প্রিমিয়ার ড্যানিয়েল স্মিথ বলেছেন, প্রয়োজনীয় স্বাক্ষর পাওয়া গেলে তিনি গণভোটের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেবেন। যদিও তিনি নিজে কানাডা থেকে আলবার্টার স্বাধীনতার পক্ষে নন।
গণভোটে ভোটারদের কী প্রশ্ন করা হবে?
প্রস্তাবটি ব্যালটে উঠলে ভোটারদের জিজ্ঞেস করা হবে: ‘আপনি কি একমত যে, কানাডা থেকে আলাদা হয়ে আলবার্টাকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া উচিত?’
গণভোট কি নিশ্চিত?
শুধু প্রয়োজনীয় স্বাক্ষর সংগ্রহ হলেই গণভোট নিশ্চিত হয় না। আলবার্টার নির্বাচন কর্তৃপক্ষকে এখনো স্বাক্ষরকারীদের নাম যাচাই করতে হবে। আদালতের এক আদেশের কারণে সেই প্রক্রিয়া আপাতত স্থগিত রয়েছে। এ ছাড়া, আদিবাসী কয়েকটি গোষ্ঠী আইনি চ্যালেঞ্জ করেছে। তাদের দাবি, আলবার্টা আলাদা হয়ে গেলে তা তাদের চুক্তিভিত্তিক অধিকারকে লঙ্ঘন করবে।
জনমত জরিপে দেখা গেছে, প্রদেশটির প্রায় ৩০ শতাংশ বাসিন্দা স্বাধীনতার পক্ষে। ফলে গণভোট হলেও তা পাস হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
ইলেকশনস আলবার্টার কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত এক সমাবেশে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছেন বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা মিচ সিলভেস্ট্রে। ছবি: এএফপি
বিচ্ছিন্নতাবাদের নেপথ্যে কী?
প্রায় ৫০ লাখ মানুষের প্রদেশ আলবার্টায় বহু দশক ধরেই স্বাধীনতার পক্ষে একটি রাজনৈতিক অভিলাষ রয়েছে।
অনেকের বিশ্বাস, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে আলবার্টা কানাডার অন্য অংশগুলোর চেয়ে আলাদা। তেলসমৃদ্ধ এই প্রদেশ দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, জাতীয় অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখলেও রাজধানী অটোয়ার রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে তাদের মত যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও পরিবেশগত বিধিনিষেধ নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে। বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতাদের দাবি, কেন্দ্রীয় আমলারা আলবার্টার বাস্তবতা না বুঝেই এমন নীতি নিচ্ছেন, যা তাদের প্রধান শিল্প জ্বালানি খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
সিলভেস্ট্রে বলেন, ‘আমরা কানাডার অন্য অংশের মতো নই। আমরা শতভাগ রক্ষণশীল। অথচ আমাদের শাসন করছে এমন লিবারেলরা, যারা আমাদের মতো চিন্তা করে না।’

ইলেকশনস আলবার্টার কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত এক সমাবেশে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছেন বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা মিচ সিলভেস্ট্রে। ছবি: এএফপি
অন্য প্রদেশেও কি বিচ্ছিন্নতাবাদ রয়েছে?
আলবার্টাই একমাত্র নয়। ফরাসিভাষী প্রদেশ কুইবেকেও বহু পুরোনো জাতীয়তাবাদী আন্দোলন রয়েছে, যারা কানাডা থেকে আলাদা হওয়ার পক্ষে। এর মূল কারণ কুইবেকের স্বতন্ত্র ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয়।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কুইবেকের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের জনপ্রিয়তা কমেছে। মার্চের এক জরিপে দেখা গেছে, ১৯৯৫ সালের গণভোটে অল্প ব্যবধানে পরাজয়ের পর এবারই সমর্থন সবচেয়ে কম।
সমালোচনাও বাড়ছে
আলবার্টার স্বাধীনতার দাবিকে ঘিরে তীব্র মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। প্রদেশটির সাবেক উপ-প্রিমিয়ার থমাস লুকাশুক এএফপিকে বলেন, ‘এটি এমন কিছুর প্রতিনিধিত্ব করে, যা অধিকাংশ আলবার্টাবাসী ও কানাডীয় সমর্থন করে না। এটি এক ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা।’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের কিছু মন্তব্যও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। ট্রাম্প এর আগে বলেছিলেন, কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্য হওয়া উচিত।
জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেন, আলবার্টা যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্বাভাবিক অংশীদার’ হতে পারে। তিনি বলেন, ‘আলবার্টার বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে, কিন্তু তাদের প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত পাইপলাইন নির্মাণ করতে দেওয়া হচ্ছে না।’
সামনে কী?
আগামী ১৯ অক্টোবর সাংবিধানিক ও অভিবাসনসংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশ্নে প্রস্তাবিত বৃহত্তর গণভোটের অংশ হিসেবে আলবার্টাজুড়ে ভোট হতে পারে। তবে আদিবাসী ফার্স্ট নেশনস গোষ্ঠীগুলোর আইনি চ্যালেঞ্জের কারণে আদালত ১০ এপ্রিল এক মাসের জন্য স্বাধীনতা–সংক্রান্ত আবেদনের অনুমোদন স্থগিত করেন।
এ সপ্তাহের শেষ দিকে এ বিষয়ে আদালতের সিদ্ধান্ত আসতে পারে। যদি আদালত আদিবাসী গোষ্ঠীগুলোর পক্ষে রায় দেন, তাহলে পুরো প্রক্রিয়াই অর্থহীন হয়ে যেতে পারে।
স্টার অনলাইন ডেস্ক
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats