২০২০ সালের ৭ মের ঘটনা। একটি ব্যাংকের এমডিকে গুলি করে হত্যার চেষ্টা করেন ঋণ আবেদনকারী। বহুল আলোচিত সিকদার গ্রুপকে নিয়ে ঘটনাটি ঘটে। জয়নুল হক সিকদারের সিকদার গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান ৫০০ কোটি টাকার ঋণের আবেদন করেছিল এক্সিম ব্যাংকে। ঋণের বিপরীতে যে সম্পদ দেখানো হয়েছিল, তার মূল্যমান ছিল কম।
কিন্তু ঋণের জন্য বন্ধকি সম্পত্তির মূল্য বেশি দেখাতে রাজি না হওয়ায় এক্সিম ব্যাংকের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ হায়দার আলী মিয়া ও অতিরিক্ত এমডি মোহাম্মদ ফিরোজ হোসেনকে গুলি করে হত্যার চেষ্টা করেন সিকদার গ্রুপের তৎকালীন চেয়ারম্যান জয়নুল হক সিকদারের ছেলে রন হক সিকদার ও তাঁর ভাই দিপু হক সিকদার।
তাঁরা পদস্থ দুই ব্যাংক কর্মকর্তাকে বনানীর একটি বাসায় জোর করে আটক রেখে নির্যাতন করেন এবং সাদা কাগজে সই নেন। ব্যাংক খাতে এমন ঘটনা নজিরবিহীন। ঘটনাটি জানাজানি হলে এ নিয়ে তখন তোলপাড় হয়। এ ঘটনা নিয়ে গুলশান থানায় এক্সিম ব্যাংক কর্তৃপক্ষের করা মামলায় এই অভিযোগ করা হয়েছে।
কিছুদিন পর রোগী সেজে বিশেষ ভাড়া করা বিমানে দুই ভাই ব্যাংককে চলে যান। তখন অভিযোগ ওঠেছিল, আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকদের কেউ কেউ রন হক সিকদার ও দিপু হক সিকদারকে দেশ ত্যাগে সহায়তা করেন।
এই হলো দেশের বড় একটি শিল্পগোষ্ঠী সিকদার গ্রুপের পেশিশক্তি প্রদর্শনের একটি উদাহরণ। শুধু পেশিশক্তি প্রদর্শন নয়, রাজনৈতিক যোগসাজশে ব্যবসা বাগিয়ে নেওয়া, ঋণের নামে লুটপাট, বিদেশি অর্থ পাচার করে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলা— সবই করেছে সিকদার গ্রুপ।
সিকদার গ্রুপের যাত্রা শুরু হয় ৫০ দশকে। আবাসন ব্যবসার মাধ্যমে এই গ্রুপের কর্ণধার প্রয়াত জয়নুল হক সিকদার তাঁর ব্যবসার গোড়াপত্তন করেন। স্বাধীনতার পর ব্যবসার সম্প্রসারণ হতে শুরু করে।
স্বাধীনতার কিছু পরে জয়নুল হক সিকদার আমেরিকায় পাড়ি দিয়েছিলেন। ওই সময়ে দেশটিতে তিনি ছোট আকারে ব্যবসা শুরু করেন। এরপর দেশে ফিরে আসেন। এখন তিনি ও তাঁর সন্তানেরা বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগ করছেন, তবে এসব অর্থের উৎস অজানা।
আওয়ামী লীগের তৎকালীন শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা থাকায় ২০০৯ সালের পর বিশেষ আনুকূল্য পেতে শুরু করেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বেশি। এই সুযোগে ব্যবসা বাড়তে থাকে। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বিদ্যুৎ, আবাসনসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করতে থাকেন। এমনকি আওয়ামী লীগ ক্ষমতার আসার পরপরই ন্যাশনাল ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণও নেয় সিকদার পরিবার। অবশ্য পরে ন্যাশনাল ব্যাংকের পর্ষদে কে বসবেন, তা নিয়ে ২০২১ সাল থেকে পরিবারের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। দ্বন্দ্ব ঠেকাতে জয়নুল হক সিকদারের স্ত্রী মনোয়ারা সিকদারকে চেয়ারম্যান করা হয়।
সার্বিকভাবে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সিকদার গ্রুপ ব্যাংক দখল, ঋণের নামে লুটপাট, অর্থ পাচারসহ নানা অপকর্মের মাধ্যমে ফুলেফেঁপে ওঠে।
কোটি কোটি টাকা ঋণখেলাপি হয় সিকদার গ্রুপ। বিদেশি গড়ে তুলে সম্পদের পাহাড়। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাব খাটিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবসা পান। রাজনীতিতেও নামে সিকদার পরিবার। ভাগিয়ে নেন সংসদ সদস্যের পদ। জয়নুল হক সিকদারের মেয়ে পারভীন হক সিকদার আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংরক্ষিত আসনে নারী সংসদ সদস্য ছিলেন।
পতনের শুরু
২০২১ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি দুবাইয়ের একটি হাসপাতালে সিকদার গ্রুপের চেয়ারম্যান জয়নুল সিকদারের মৃত্যু হয়। এর পর থেকে এই শিল্পগোষ্ঠীর পতনের শুরু হয়। তিনি মৃত্যুর আগপর্যন্ত ন্যাশনাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন। সম্পত্তি নিয়ে সন্তানদের দ্বন্দ্ব ঠেকাতে জয়নুল হক সিকদারের স্ত্রী মনোয়ারা সিকদারকে চেয়ারম্যান করা হয়। দুই মাস আগে তিনিও যুক্তরাষ্ট্রের একটি হাসপাতালে মারা গেছেন।
গতকাল জয়নুল হক সিকদারের ছেলে ও সিকদার গ্রুপের অন্যতম কর্ণধার রন হক সিকদার সংযুক্ত আরব আমিরাতে মারা যান।
আর ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর জয়নুল হক সিকদারের ছেলেমেয়েরা অনেকটা স্থায়ীভাবে দেশ ছাড়তে শুরু করেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তাঁদের আর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি।
জয়নুল হক সিকদার ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা অবশ্য আগে থেকেই বিভিন্ন দেশের নাগরিকত্ব নিয়েছিলেন। স্বামী-স্ত্রী দুজনই যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক ছিলেন। তাঁদের ছেলে–মেয়ে, নাতি-নাতনিদের বেশির ভাগই বিভিন্ন দেশের নাগরিক। সেখানেই স্থায়ীভাবে থিতু হয়েছেন, তবে তাঁদের অনেকে সিকদার গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিচালক।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দেশের শীর্ষ ১০টি গ্রুপের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম, কর ফাঁকির তদন্ত শুরু করে। এই ১০টি গ্রুপের একটি হলো সিকদার গ্রুপ। তখন সিকদার গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সম্পদ জব্দ করা হয়। জব্দ করা হয় জয়নুল হক সিকদারের স্ত্রী মনোয়ারা সিকদার, ছেলে রন হক সিকদার, রিক হক সিকদার, মেয়ে পারভীন হক সিকদারসহ পরিবারের সদস্যদের ২০০–এর বেশি ব্যাংক হিসাব, যা এখনো অবরুদ্ধ।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তে ওঠে এসেছে, জনগণের আমানতের অর্থ আত্মসাৎ করে তাঁরা নিজেদের, পরিবারের সদস্যদের ও নিকট আত্মীয়দের নামে-বেনামে প্রচুর সম্পদ গড়েছেন। এ নিয়ে আদালতে মামলা চলছে। বর্তমানে সিকদার গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধই হয়ে গেছে বলা চলে।
দেশে-বিদেশে সম্পদের পাহাড়
বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায়ও সিকদার পরিবারের সম্পদ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। ব্যাংক, বিমা, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আবাসন, নির্মাণ, হোটেল, পর্যটন, এভিয়েশনসহ বিভিন্ন খাতে গ্রুপটির ব্যবসা রয়েছে। পরিবারটির সবচেয়ে বড় ব্যবসা এখন বিদ্যুৎ খাতের পাওয়ার প্যাক হোল্ডিং। পাওয়ার প্যাক হোল্ডিংয়ে ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে সিকদার গ্রুপের ব্যবসা রয়েছে।
এর আগে প্রথম আলোর অনুসন্ধানে ওঠে এসেছে থাইল্যান্ড, দুবাই, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে সিকদার গ্রুপের হোটেল, রেস্তোরাঁ, আবাসনসহ বিভিন্ন খাতের ব্যবসা আছে।
২০০৫ সালে ব্যাংককের সুকুম্ভিতে প্রথম কয়ি রেস্টুরেন্ট চালু করেছিলেন রন হক সিকদার ও রিক হক সিকদার। পরে থাইল্যান্ডের একাধিক শহর ও পর্যটনকেন্দ্রে তারকা হোটেল, রেস্টুরেন্ট, ক্লাব, স্পা ও বিনোদনকেন্দ্র গড়ে তোলে পরিবারটি।
যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা, লাস ভেগাসসহ বিভিন্ন শহরে সিকদার গ্রুপের আবাসন, রেস্তোরাঁ ও রিফুয়েলিং স্টেশনের ব্যবসা আছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প টাওয়ারে তাদের রেস্তোরাঁ আছে বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশের আর্থিক খাত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বাংলাদেশে সিকদার গ্রুপের ব্যবসা বিকশিত হওয়া শুরু হয় ২০০৯ সালের পর। নতুন নতুন একাধিক বিদ্যুৎ প্রকল্প তাদের দেওয়া হয়। আর ন্যাশনাল ব্যাংক পুরোপুরি তাদের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার পর বিদেশেও সম্পদ বাড়তে শুরু করে।
শীর্ষ ঋণখেলাপির তালিকায় দুই ভাই
সিকদার গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে এখন সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ আছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে তাদের বিদ্যুৎ খাতের কোম্পানির বিপরীতে দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ আছে। যেসব ব্যাংক থেকে সিকদার গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ নিয়েছে, সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক।
গত মাসে জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী দেশের শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপির তালিকা প্রকাশ করেন। সেখানে দেখা গেছে, ১৩ ও ১৪তম তালিকায় রয়েছে সিকদার গ্রুপের মালিকানাধীন পাওয়ার প্যাক মুতিয়ারা কেরানীগঞ্জ পাওয়ার প্ল্যান্ট লি. ও পাওয়ার প্যাক মুতিয়ারা জামালপুর পাওয়ার প্ল্যান্ট লি.। প্রয়াত জয়নুল হক সিকদারের দুই পুত্র রন হক সিকদার (তিনিও সদ্য প্রয়াত) ও রিক হক সিকদার এই দুই প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় আছেন।
বিলাসী জীবন: ক্রেডিট কার্ডেই ৭১ কোটি টাকা খরচ
সিকদার গ্রুপের পরিচালকদের আরেকটি অনিয়মের উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। এক্সিম ব্যাংকের এমডিকে গুলি করে হত্যা চেষ্টার মামলা হওয়ায় রন হক সিকদার ও দিপু হক সিকদার দেশ থেকে পালিয়ে যান। দেশের বাইরে দুই ভাই নিজেদের ন্যাশনাল ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে প্রায় ৭১ কোটি টাকা খরচ করেন। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুসারে, জামানতহীনভাবে একটি ক্রেডিট কার্ডে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা এবং জামানত থাকলে সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা খরচ করতে পারেন। এ নিয়ে দুই ভাই ও ন্যাশনাল ব্যাংকের তৎকালীন সময় দায়িত্ব থাকা তিন এমডির বিরুদ্ধে মামলা করেছে মামলা করেছে দুদক।
এভাবে সিকদার গ্রুপের উত্থান পর পতনের শুরু। দেশের অবকাঠামো, বিদ্যুৎ ও স্বাস্থ্য খাতে বড় বিনিয়োগের মাধ্যমে আলোচনায় থাকা সিকদার গ্রুপকে ঘিরে ঋণ ও করপোরেট সুশাসন নিয়ে বড় প্রশ্ন আছে।
ক্ষমতাসীন দলের পৃষ্ঠপোষকতায় বড় বড় ব্যবসায় যেমন বিনিয়োগ করেছে, তেমনি নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে এই গ্রুপটি। বিদেশে অর্থ পাচার করে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন গ্রুপটির মালিকেরা। এমনকি সিকদার গ্রুপের পরিচালক তথা জয়নুল হক সিকদারের সন্তানেরা বিভিন্ন দেশের নাগরিকত্ব নিয়ে ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছেন।
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats