ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মানচিত্রে দীর্ঘ দেড় দশকের 'মমতা যুগের' অবসান ঘটেছে। প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় বসতে যাচ্ছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। প্রতিবেশী রাজ্যে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির এই উথ্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে নানামুখী প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে সীমান্ত সমস্যা, অনুপ্রবেশ তকমা ও সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ নিয়ে দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে চাপ তৈরির আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের চোখে সম্ভাব্য ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ
বিশ্লেষক ও গবেষক আলতাফ পারভেজ এই পরিবর্তনকে বাংলাদেশের জন্য একটি বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন।
দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ মিলিয়ে প্রায় ৫০ লাখ মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার যে প্রক্রিয়া (এনআরসি ও এসআইআর) চলছে, তা সীমান্ত সংকটে নতুন মাত্রা যোগ করবে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর বড় অংশই মুসলিম, যাদের 'বাংলাদেশি' বা 'অবৈধ অনুপ্রবেশকারী' হিসেবে চিহ্নিত করার রাজনৈতিক প্রবণতা বিজেপির মধ্যে প্রবল।
এনআরসি হলো ভারতের জাতীয় নাগরিক পঞ্জী বা তালিকা। এটির মাধ্যমে 'অবৈধ অনুপ্রবেশকারী' যাচাইয়ের নামে কয়েক লক্ষ মানুষকে রাষ্ট্রহীন ঘোষণা করা হয়েছে, বিশেষ করে আসামে।
অন্যদিকে, এসআইআর হলো নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা সংশোধনের একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে সম্প্রতি বহু মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
আলতাফ পারভেজ বলেন, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে যারা নাগরিক অধিকার হারিয়েছে, তাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়ে বিজেপি নেতারা প্রায়ই বাংলাদেশবিরোধী বক্তব্য দিয়ে থাকেন। এখন দুই রাজ্যেই বিজেপি ক্ষমতায় থাকায় 'অবৈধ বাংলাদেশি' ফেরত পাঠানোর নাম করে সীমান্তে 'পুশ-ইন'-এর চাপ নিশ্চিতভাবেই বাড়বে।
তিনি আরও আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, পশ্চিমবঙ্গে ধর্মীয় মেরুকরণের কারণে সংখ্যালঘুরা কোণঠাসা হয়ে পড়লে তাদের একটি অংশ জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে চলে আসতে চাইতে পারে, যা ঢাকার নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
আলতাফ পারভেজের মতে, আসামের হিমন্ত বিশ্ব শর্মা এবং পশ্চিমবঙ্গের শুভেন্দু অধিকারীর মতো নেতারা বিজেপির কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নিজেদের জনপ্রিয়তা বাড়াতে 'বাংলাদেশবিরোধী' বক্তব্যকে রাজনৈতিক পণ্য হিসেবে ব্যবহার করেন। ফলে আগামীতে পশ্চিমবঙ্গেও 'পুশ-ইন' বা ‘পুশ-ব্যাক’ আতঙ্ক বাড়তে পারে।
আরেকটি অনুমানের কথাও বলেন আলতাফ পারভেজ। তিনি বলেন, মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষেরা এখন বলতে পারেন যে তাদের নাগরিক অধিকার দিতে হবে। যদি তাদের জন্য সিএএ কার্যকর করা হয়, তাহলে বাংলাদেশ থেকে সংখ্যালঘুদের ভারতে যাওয়ার প্রবণতাও বাড়তে পারে।
সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ ও আঞ্চলিক অস্থিরতা
পশ্চিমবঙ্গের সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অর্ক ভাদুড়ি বিজেপির এই জয়কে উভয় দেশের জন্য একটি 'বিপজ্জনক ইঙ্গিত' হিসেবে দেখছেন।
তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, এবারের বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারের মূল অভিমুখই ছিল, পশ্চিমবঙ্গ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীতে ভরে গেছে।
বিজেপির সম্ভাব্য মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী শুভেন্দু অধিকারীর সাম্প্রদায়িক মন্তব্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নির্বাচনের দিনও ভবানীপুর কেন্দ্রে শুভেন্দু বলেছেন, 'বাংলাদেশি রোহিঙ্গা' ও 'বাংলাভাষী'রা এখানে রয়েছে। বিজেপির সার্বিক প্রচারটাই ছিল যে গোটা পশ্চিমবঙ্গে লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা, এরা সবাই বাংলাদেশ থেকে এসছে এবং এদেরকে তাড়াতে হবে।
ভারতের সংখ্যালঘু নাগরিকদেরকে 'বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী' বা 'রোহিঙ্গা' তকমা দিয়ে শুভেন্দুর এসব আক্রমণাত্মক বক্তব্য ভোটারদের একটি বড় অংশকে প্রভাবিত করেছে বলেও মনে করেন অর্ক ভাদুড়ি।
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, বাংলাদেশের শেষ নির্বাচনের ফলাফলে জামায়াতে ইসলামী সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে ভালো ফল করেছে। ঠিক তার পাশেই এখানে বিজেপির পক্ষের বলয় তৈরি হয়েছে। কাজেই দুদিকেই দুটো চরম মৌলবাদী শক্তি মুখোমুখি অবস্থানে। এটা দুটো দেশের জন্যই বিপজ্জনক ঘটনার ইঙ্গিত।
অর্ক ভাদুড়ির মতে, আগামীতে দুই দেশের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বাড়বে। বিজেপি ও জামায়াতে ইসলামী দুপক্ষই নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে এটাকে জিইয়ে রাখবে। ফলে দুটো দেশেরই শান্তিপ্রিয় ও অসাম্প্রদায়িক মানুষের বিপদ বাড়বে।
তিস্তা ও গঙ্গা চুক্তির মতো দ্বিপাক্ষিক ইস্যুগুলোর কী হবে?
বিজেপির এই জয় কোনো কোনো ক্ষেত্রে সুযোগও তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
আলতাফ পারভেজ মনে করেন, এতদিন দিল্লির কেন্দ্রীয় সরকার তিস্তা পানি বণ্টনের ক্ষেত্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তির অজুহাত দিত। এখন কেন্দ্র ও রাজ্য—উভয় জায়গায় একই দল ক্ষমতায় থাকায় বাংলাদেশ পানি বণ্টনের বিষয়ে জোরালো দাবি তোলার একটি পরিষ্কার সুযোগ পাচ্ছে।
পাশাপাশি গঙ্গা চুক্তির নবায়ন ও ভিসা সমস্যা সমাধানের বিষয়েও আলোচনার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ এ বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন। গতকাল সোমবার তিনি সাংবাদিকদের বলেন, পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং এতে বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। গঙ্গা চুক্তির নবায়ন ও ভিসা সমস্যার সমাধান আলোচনার মাধ্যমেই হবে বলে তিনি আশাবাদী।
সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও ভূ-রাজনীতি
কলকাতার সাংবাদিক শুভজিৎ বাগচী মনে করেন, বাংলাদেশের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের ২ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি সীমান্তের ব্যবস্থাপনা এখন আলোচনার বিষয় হবে। এই নির্বাচনের ফল বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে কতটা প্রভাবিত করবে, এটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। সীমান্ত ইস্যুতে কীভাবে তারা বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনা ও কাজ করবে, এর ওপরেই ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নির্ভর করবে।
আলতাফ পারভেজ বলেন, সীমান্তে বেসামরিক মানুষ প্রায়ই নিগৃহীত হয়, এমনকি সীমান্ত চুক্তি থাকার পরেও। অনেকেরই পরিবার-পরিজন দুইদিকেই আছে, কর্মসংস্থান দুইদিকে। তারা অনেকসময় মরিয়া হয়ে আসা-যাওয়ার চেষ্টা করে। বিজেপির দিক থেকে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা আরও কঠোর করা হলে নিগৃহীত হওয়ার আশঙ্কাও বাড়বে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির এই উত্থান এবং কট্টর হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির প্রচার দুই দেশের মানুষের মধ্যে বিভাজন বাড়িয়ে দিতে পারে। যদি ওপারে ধর্মীয় পরিচয় বা খাদ্যাভ্যাসের কারণে সংখ্যালঘুরা নতুন করে চাপের মুখে পড়ে, তবে তার প্রতিক্রিয়া এপারেও উগ্রপন্থী শক্তিগুলোকে উসকে দেওয়ার আশঙ্কা থাকে।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ে একদিকে যেমন তিস্তার পানির ন্যায্য অধিকার আদায়ের পথ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ ও পুশ-ইন আতঙ্কে সীমান্তের স্থিতিশীলতা নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ঢাকা ও দিল্লির কেন্দ্রীয় সরকারের কূটনৈতিক বোঝাপড়াই নির্ধারণ করবে আগামীর দিনগুলোতে এই প্রভাব কতটা গভীর হবে।
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats