জলবায়ু পরিবর্তন, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদার প্রেক্ষাপটে বিশ্বজুড়ে আবারও গুরুত্ব পাচ্ছে পারমাণবিক শক্তি। দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তা ঝুঁকি ও ব্যয় নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, কার্বন নিঃসরণ কমাতে পারমাণবিক বিদ্যুৎ এখন অনেক দেশের জন্য অপরিহার্য বিকল্প হয়ে উঠছে।
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সর্বশেষ তথ্য বলছে, বিশ্বে পারমাণবিক শক্তির এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে—যেখানে পুরনো শক্তিধর দেশগুলোর পাশাপাশি নতুন দেশগুলোও দ্রুত এগিয়ে আসছে।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের হিসেবে বিশ্বের ৩১টি দেশে প্রায় ৪১৬–৪১৭টি পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর চালু রয়েছে, যার মোট উৎপাদনক্ষমতা প্রায় ৩৭০ গিগাওয়াটের বেশি। একইসঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আরও ৬০টির বেশি রিঅ্যাক্টর নির্মাণাধীন রয়েছে।
অন্যদিকে ওয়ার্ল্ড নিউক্লিয়ার এসোসিয়েশনের (ডব্লিউএনএ) হিসাব বলছে, বিশ্বের মোট বিদ্যুতের প্রায় ৯–১০ শতাংশ আসে পারমাণবিক শক্তি থেকে। উন্নত দেশগুলোতে এই হার অনেক বেশি—বিশেষ করে ইউরোপের কিছু দেশে।
আইএইএ মনে করছে, ২০৫০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন দ্বিগুণ পর্যন্ত হতে পারে, যদি দেশগুলো তাদের ঘোষিত জলবায়ু লক্ষ্য বাস্তবায়নে এগিয়ে যায়।
শীর্ষ উৎপাদক দেশ
বিশ্বে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়েকটি দেশ দীর্ঘদিন ধরে নেতৃত্ব দিচ্ছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, চীন, রাশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া মিলেই বৈশ্বিক উৎপাদনের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে।
যুক্তরাষ্ট্র
বিশ্বের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদক যুক্তরাষ্ট্র। দেশটিতে বর্তমানে ৯৪টি কার্যকর রিঅ্যাক্টর রয়েছে, যেগুলো বছরে প্রায় ৭৮০ হাজার গিগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে।
ইউএস এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ইআইএ) তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের মোট বিদ্যুতের প্রায় ১৮–১৯ শতাংশ পারমাণবিক শক্তি থেকে আসে। যদিও নতুন কেন্দ্র নির্মাণের গতি ধীর, তবে বিদ্যমান কেন্দ্রগুলোর দক্ষতা অত্যন্ত বেশি।
ফ্রান্স
পারমাণবিক বিদ্যুতের ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল দেশগুলোর একটি ফ্রান্স। দেশটির ৫৬টির বেশি রিঅ্যাক্টর থেকে মোট বিদ্যুতের প্রায় ৬৫–৭০ শতাংশ উৎপাদিত হয়। এটি বিশ্বে সর্বোচ্চ পারমাণবিক নির্ভরতার উদাহরণ। ফ্রান্স দীর্ঘদিন ধরে শক্তি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে এই নীতি অনুসরণ করছে।
চীন
বর্তমানে পারমাণবিক খাতে সবচেয়ে দ্রুত এগিয়ে চলা দেশ চীন। দেশটিতে ৫০টির বেশি রিঅ্যাক্টর চালু রয়েছে এবং আরও বহু রিঅ্যাক্টর নির্মাণাধীন। চীনের বার্ষিক উৎপাদন ইতোমধ্যে ৪০০ হাজার গিগাওয়াট ছাড়িয়েছে এবং আগামী দশকে এটি যুক্তরাষ্ট্রের কাছাকাছি পৌঁছে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আইইএ বলছে, বর্তমানে নির্মাণাধীন রিঅ্যাক্টরের প্রায় অর্ধেকই চীনে।
রাশিয়া
রাশিয়ার প্রায় ৩৭টি রিঅ্যাক্টর রয়েছে এবং উৎপাদন প্রায় ২০০ হাজার গিগাওয়াট। রাশিয়া শুধু নিজ দেশে নয়, বিদেশেও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশ, ভারত ও তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশে রাশিয়ার প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।
দক্ষিণ কোরিয়া
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রায় ২৫–২৬টি রিঅ্যাক্টর রয়েছে। দেশটি উচ্চ দক্ষতা ও কম খরচে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য পরিচিত। এ ছাড়া, দক্ষিণ কোরিয়া আন্তর্জাতিক বাজারেও পারমাণবিক প্রযুক্তি রপ্তানি করছে।
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দেশ
জাপান
জাপানে ২০১১ সালের ফুকুশিমা দাইইচি পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিস্ফোরণের পর অধিকাংশ রিঅ্যাক্টর বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে ধীরে ধীরে পুনরায় চালু করা হচ্ছে, তবে আগের অবস্থানে ফিরতে সময় লাগছে।
ভারত
ভারতে বর্তমানে ২০টির বেশি রিঅ্যাক্টর চালু রয়েছে এবং আরও কয়েকটি নির্মাণাধীন। দেশটি নিজস্ব প্রযুক্তির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে এই খাত সম্প্রসারণ করছে।
কানাডা ও যুক্তরাজ্য
কানাডা কানডু (কানাডা ডিউটেরিয়াম ইউরেনিয়াম) প্রযুক্তির জন্য পরিচিত এবং দেশটির বিদ্যুৎ উৎপাদনে পারমাণবিক শক্তির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যে পুরনো কেন্দ্রগুলো ধীরে ধীরে বন্ধ হলেও নতুন প্রজন্মের কেন্দ্র নির্মাণ চলছে।
পারমাণবিক শক্তির গুরুত্ব
ডব্লিউএনএ বলছে, পারমাণবিক শক্তি বর্তমানে বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম নিম্ন-কার্বন বিদ্যুতের উৎস। এটি সৌর ও বায়ুশক্তির মতো নবায়নযোগ্য উৎসের তুলনায় অনেক বেশি স্থিতিশীল।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর উচ্চ ক্যাপাসিটি ফ্যাক্টর (৮০–৯০ শতাংশ), যা নির্দেশ করে যে পারমাণবিক কেন্দ্রগুলো প্রায় সারাবছর পূর্ণ ক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে। আইইএ বলছে, ২০২৫–২০২৬ সালে বৈশ্বিক পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন নতুন রেকর্ডে পৌঁছাতে পারে।
ছোট রিঅ্যাক্টর ও ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি
বর্তমানে পারমাণবিক খাতে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো স্মল মডিউলার রিয়েক্টর (এসএমআর)। এগুলো ছোট আকারের, তুলনামূলক কম ব্যয়বহুল এবং দ্রুত নির্মাণযোগ্য। অনেক দেশ ইতোমধ্যে এসএমআর প্রকল্পে বিনিয়োগ শুরু করেছে, যা ভবিষ্যতে পারমাণবিক শক্তিকে আরও বিস্তৃত করতে পারে।
আঞ্চলিক চিত্র
বিশ্বে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বেশিরভাগই তিন অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত। যেমন: ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও পূর্ব এশিয়া। তবে নতুন করে মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকার কিছু দেশ এই খাতে প্রবেশ করছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। রাশিয়ার সহযোগিতায় নির্মিত এই প্রকল্প পুরোদমে চালু হলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে একটি বড় পরিবর্তন আসবে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই কেন্দ্রের মোট উৎপাদন ক্ষমতা ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। এটি ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের দুটি ইউনিটের সমন্বয়ে গঠিত, যা দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১০ শতাংশ পূরণ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্বে পারমাণবিক শক্তি এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে নিরাপত্তা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও উচ্চ ব্যয়ের মতো চ্যালেঞ্জ রয়েছে; অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে এর বিকল্পও সীমিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দশকে বিশেষ করে এশিয়া অঞ্চলে পারমাণবিক বিদ্যুতের বিস্তার আরও দ্রুত হবে। ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি রাজনীতিতে পারমাণবিক শক্তির প্রভাব আরও গভীর হতে যাচ্ছে।
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats