সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুকে, এক ধরনের সরলীকৃত রাজনৈতিক বিশ্লেষণ খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। কেউ কেউ দাবি করছেন—যেহেতু কোনো নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ৪০ শতাংশ কমেছে, তাই সেই ৪০ শতাংশই একটি নির্দিষ্ট দলের ভোট। এই যুক্তি আপাতদৃষ্টিতে সহজ ও আকর্ষণীয় মনে হলেও, বাস্তবতা এবং পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণের আলোকে এটি অত্যন্ত দুর্বল ও অনুমাননির্ভর।
প্রথমত, বাংলাদেশে কখনোই কোনো নির্বাচনে ১০০ শতাংশ ভোটার উপস্থিতি দেখা যায়নি। ইতিহাসের অন্যতম উচ্চ ভোটার উপস্থিতির উদাহরণ হলো বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০০৮, যেখানে প্রায় ৮৩ শতাংশ ভোট পড়েছিল। সেটি ছিল একটি তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও বহুল আলোচিত নির্বাচন। কিন্তু ৮৩ শতাংশও ১০০ নয়। অর্থাৎ, স্বাভাবিকভাবেই একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সব সময় ভোট দেয় না। এই অনুপস্থিতির পেছনে নানা কারণ থাকে—অসুস্থতা, প্রবাসে অবস্থান, কর্মস্থলের দায়িত্ব, রাজনৈতিক অনাগ্রহ, নিরাপত্তা সংশয় কিংবা স্রেফ ব্যক্তিগত অনীহা।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি বিশেষ বাস্তবতাও রয়েছে। নির্বাচনকালীন সময়ে বিপুলসংখ্যক সরকারি কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য এবং অন্যান্য দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকেন। তাঁদের অনেকেই নিজ নিজ কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে পারেন না। ফলে একটি স্থায়ী অংশ কাঠামোগত কারণেই ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে বঞ্চিত হন। কাজেই ২০ থেকে ৩০ শতাংশ অনুপস্থিতি কোনো অস্বাভাবিক বা ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়।
দ্বিতীয়ত, “যারা ভোট দেয়নি, তারা অমুক দলের সমর্থক”—এই সিদ্ধান্ত টানতে হলে শক্ত প্রমাণ দরকার। ভোটার অনুপস্থিতি একমুখী রাজনৈতিক আচরণ নয়। কেউ প্রতিবাদ হিসেবে ভোট দেয় না, কেউ মনে করে তার ভোট ফলাফলে প্রভাব ফেলবে না, কেউ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থাহীন, আবার কেউ বাস্তব সীমাবদ্ধতায় কেন্দ্রে যেতে পারে না। এই বৈচিত্র্যময় গোষ্ঠীকে একটি নির্দিষ্ট দলের ভোটার ধরে নিয়ে তার প্রচারণা কোনো পরিণত রাজনৈতিক আচরণ নয়।
তৃতীয়ত, উচ্চ ভোটার উপস্থিতি সবসময়ই স্বতঃসিদ্ধভাবে গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের নিখুঁত প্রতিফলন—এমন ধারণাও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। যদি কোথাও অনুপস্থিত ভোটারের নামে ভোট পড়ে থাকে, তাহলে তা কৃত্রিমভাবে টার্নআউট বাড়ায়। সেক্ষেত্রে পরবর্তী কোনো নির্বাচনে জাল ভোট বা অনিয়ম কম হলে টার্নআউট তুলনামূলক কম দেখাতেই পারে।
চতুর্থত, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেখায় যে গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে ৬০ থেকে ৭৫ শতাংশ ভোটার উপস্থিতি খুবই সাধারণ, স্বাভাবিকও। ৮০ শতাংশের বেশি উপস্থিতি সাধারণত বিশেষ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেখা যায়—যেমন বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রত্যাশা, তীব্র মেরুকরণ বা ঐতিহাসিক কোনো মোড় ঘোরানোর মুহূর্তে। সুতরাং ৬০ শতাংশ ভোটার উপস্থিতি একটি নির্দিষ্ট দল না থাকার কারণেহয়েছে—এমন সরল সমীকরণ বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খায় না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ভোটের হার কমেছে মানেই একটি দলের ভোট কেন্দ্রেআসেনি—এই সিদ্ধান্ত টানতে হলে অঞ্চলভিত্তিক ফলাফল, আগের নির্বাচনের তুলনামূলক ডেটা, ভোটার তালিকার পরিবর্তন, নতুন ভোটারের সংযোজন বা প্রবাসী ভোটারের হার—এসব উপাত্ত বিশ্লেষণ করতে হয়। পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণ ছাড়া কেবল একটি সংখ্যার ওপর দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক উপসংহার টানা বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে দুর্বল অবস্থান।

গণতন্ত্রে মতপার্থক্য থাকবে, বিতর্ক থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই বিতর্ক যদি তথ্য, প্রেক্ষাপট ও যুক্তির ভিত্তিতে না হয়, বরং আবেগ ও দলীয় অবস্থান থেকে পরিচালিত হয়, তাহলে তা জনপরিসরের বুদ্ধিবৃত্তিক মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ভোটার উপস্থিতি একটি জটিল সামাজিক-রাজনৈতিক সূচক; এটিকে এক লাইনের তত্ত্বে ব্যাখ্যা করা যায় না।
অতএব, ৪০ শতাংশ কম ভোট পড়েছে মানেই সেই ৪০ শতাংশ একটি নির্দিষ্ট দলের—এই দাবি রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় হলেও বিশ্লেষণাত্মকভাবে টেকসই নয়। বাস্তবতা সবসময়ই বেশ জটিল, এবং গণতান্ত্রিক আলোচনায় সেই জটিলতাকে স্বীকার করাই পরিণত রাজনৈতিক চর্চার লক্ষণ।
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats