দর্শনে জ্ঞান অর্জনের একটি প্রচলিত পদ্ধতি হলো কিছু মৌলিক অনুমান (axiom) বা ধ্রুব সত্য ধরে নিয়ে সেখান থেকে যৌক্তিকভাবে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো। ধর্মেও একই রকম কাঠামো দেখা যায়—কিছু চূড়ান্ত সত্য অগ্রিম স্বীকৃত, এবং সেগুলোর আলোকে নৈতিকতা, সমাজ ও রাষ্ট্রের ব্যাখ্যা নির্মিত হয়।
কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় যখন এই পদ্ধতি—যা মূলত মেটাফিজিক্স বা ধর্মতত্ত্বের জন্য উপযোগী—রাজনীতিতে প্রয়োগ করা হয়। তখন রাজনীতি আর সমঝোতা ও প্রেক্ষিতনির্ভর বাস্তবতার ক্ষেত্র থাকে না; বরং তা বিশ্বাস, পবিত্রতা ও চূড়ান্ত সত্যের ক্ষেত্রে রূপ নেয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা এই তাত্ত্বিক সমস্যার একটি স্পষ্ট উদাহরণ।
১. পদ্ধতিগত অনুমান ও বন্ধ চিন্তাপদ্ধতি
দর্শনে একটি “ডিডাক্টিভ” পদ্ধতি আছে: প্রথমে ধ্রুব নীতি স্থাপন, তারপর সেখান থেকে যুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত।
উদাহরণস্বরূপ, Plato তাঁর আদিরূপ (Forms) তত্ত্বে ধরে নেন যে একটি চিরন্তন ন্যায়ের আদর্শ আছে। সেই অনুমান থেকে তিনি ন্যায়রাষ্ট্রের ধারণা দাঁড় করান। এখানে রাষ্ট্র একটি নৈতিক আদর্শের বাস্তব রূপ।
ধর্মে একইভাবে, একটি ঐশী সত্য অগ্রিম স্বীকৃত। এরপর সামাজিক ও রাজনৈতিক নির্দেশনা সেই সত্য থেকে উদ্ভূত হয়।
এই কাঠামোকে তাত্ত্বিকভাবে “বন্ধ চিন্তাপদ্ধতি” (closed system of thought) বলা যায়—কারণ এর ভেতরে প্রশ্ন তোলা যায়, কিন্তু মূল অনুমান প্রশ্নাতীত।

২. উন্মুক্ত সমাজ বনাম বন্ধ সমাজ
Karl Popper তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ The Open Society and Its Enemies-এ দেখান যে যখন সমাজ কোনো চূড়ান্ত ঐতিহাসিক বা নৈতিক সত্যকে অচল ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে, তখন তা “বন্ধ সমাজে” রূপ নেয়।
বন্ধ সমাজে:
মতভেদকে শত্রুতা হিসেবে দেখা হয়
রাজনৈতিক সমালোচনা নৈতিক বিচ্যুতি বলে বিবেচিত হয়
নেতৃত্ব প্রায় পবিত্র মর্যাদা পায়
বিপরীতে, উন্মুক্ত সমাজে:
সত্য আংশিক ও সংশোধনযোগ্য
নীতি পরিবর্তনযোগ্য
ক্ষমতা প্রশ্নাতীত নয়
রাজনীতি মূলত উন্মুক্ত সমাজের যুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে। কারণ রাজনীতি হলো ভুল সংশোধনের ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।
রাজনীতির ধর্মায়ন ঘটে যখন:
1. একটি ঐতিহাসিক ঘটনা বা মতাদর্শকে চূড়ান্ত সত্য ধরা হয়
2. সেই সত্যের প্রতিনিধিত্ব দাবি করে একটি দল
3. বিরোধিতাকে নৈতিক অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়
এটি মূলত “ক্যাটেগরি মিসটেক”—ধর্মীয় সত্যের কাঠামোকে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রয়োগ।
Hannah Arendt দেখিয়েছেন, টোটালিটারিয়ান রাজনীতিতে মতাদর্শ বাস্তবতার ওপর প্রাধান্য পায়। বাস্তবতা বদলালেও মতাদর্শ বদলায় না; বরং বাস্তবতাকে মতাদর্শের সঙ্গে মানানসই করে ব্যাখ্যা করা হয়।
৪. বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
(ক) মুক্তিযুদ্ধের চেতনার রাজনৈতিক একচেটিয়াকরণ
বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তি। এটি ইতিহাসগতভাবে একটি মুক্তির সংগ্রাম।
কিন্তু যখন কোনো রাজনৈতিক শক্তি—যেমন আওয়ামিলীগ—নিজেদের সেই চেতনার একমাত্র ধারক হিসেবে উপস্থাপন করে, তখন রাজনৈতিক বিরোধিতা নৈতিক বিচ্যুতি হিসেবে চিত্রিত হয়। ফলে রাজনীতি হয়ে যায় নৈতিক বিশুদ্ধতার প্রতিযোগিতা।
এখানে সমস্যা চেতনার অস্তিত্বে নয়; সমস্যা একচেটিয়াকরণে।
(খ) ইসলামি রাজনৈতিক বয়ান
অন্যদিকে, Jamaat-e-Islami Bangladesh-এর মতো দল রাজনীতিকে শরিয়াহভিত্তিক নৈতিক আদর্শ বাস্তবায়নের ক্ষেত্র হিসেবে দেখে।
যদি কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি ঐশী সত্যের সম্প্রসারণ হিসেবে উপস্থাপিত হয়, তবে তার বিরোধিতা কেবল রাজনৈতিক মতভেদ নয়—ধর্মীয় বিচ্যুতি হিসেবেও দেখা হতে পারে।
এতে রাজনীতির আপসের জায়গা সংকুচিত হয়।
(গ) ব্যক্তিপূজা ও রাজনৈতিক পবিত্রতা
Sheikh Mujibur Rahman এবং Ziaur Rahman—উভয়েই ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু যখন রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নেতা সমালোচনাতীত প্রতীকে রূপ নেন, তখন দলীয় আনুগত্য বিশ্বাসের মতো হয়ে যায়। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত তখন নীতির ভিত্তিতে নয়, পরিচয়ের ভিত্তিতে গৃহীত হয়।

৫. ফলাফল: গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির সংকট
রাজনীতির ধর্মায়নের ফলাফল:
আপসকে দুর্বলতা হিসেবে দেখা
নির্বাচনকে অস্তিত্বের লড়াই বানানো
বিরোধী পক্ষকে “দেশদ্রোহী” বা “অধার্মিক” আখ্যা দেওয়া
সহিংসতার নৈতিকীকরণ
এটি গণতন্ত্রের মৌলিক শর্ত—সহাবস্থান—ক্ষতিগ্রস্ত করে।
গণতন্ত্রের মূল শক্তি হলো:
“আমি তোমার মতের বিরোধিতা করি, কিন্তু তোমার মত প্রকাশের অধিকার স্বীকার করি।”
যখন রাজনীতি ধর্মীয় পবিত্রতার স্তরে ওঠে, তখন এই স্বীকৃতি ভেঙে পড়ে।
ধর্ম ও দর্শনের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সত্য ধরে জ্ঞান নির্মাণ বৈধ। কিন্তু রাজনীতি সেই প্রকৃতির নয়।
রাজনীতি হলো সংশোধনযোগ্য সিদ্ধান্তের ক্ষেত্র—যেখানে সত্য আংশিক, নীতি পরিবর্তনযোগ্য, এবং ক্ষমতা প্রশ্নযোগ্য।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বড় সংকট কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়; এটি বুদ্ধিবৃত্তিক সংকট। রাজনীতিকে যদি আমরা ধর্মীয় সত্যের স্তরে উন্নীত করি, তবে তা সহনশীলতা নষ্ট করবে।
কিন্তু যদি রাজনীতিকে দেখি মানবিক সীমাবদ্ধতার ব্যবস্থাপনা হিসেবে—তবে মতভেদ থাকবে, সমালোচনা থাকবে, আপস থাকবে—এবং সেখানেই সুস্থ গণতন্ত্রের সম্ভাবনা নিহিত।
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats