প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আলী রীয়াজ। - ফাইল ছবি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী। জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে প্রতিনিধিদের নির্বাচিত করেছেন। এই প্রেক্ষাপটে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আলী রীয়াজ মন্তব্য করেছেন যে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা দুই ধরনের শপথ নেবেন—একটি জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে, অন্যটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে। প্রশ্ন হলো, এই সংবিধান সংস্কার পরিষদের সাংবিধানিক ভিত্তি কোথায়?
১. তফসিল ও সাংবিধানিক বৈধতার প্রশ্ন
নির্বাচন কমিশন যে তফসিল ঘোষণা করেছিল, তা ছিল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। কোথাও “সংবিধান সংস্কার পরিষদ” নামে পৃথক কোনো প্রতিষ্ঠানের কথা উল্লেখ ছিল না। ভোটাররা ভোট দিয়েছেন সংসদ সদস্য নির্বাচনের জন্য—কোনো দ্বৈত কাঠামোর প্রতিনিধিত্বের জন্য নয়।
সুতরাং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ওপর অতিরিক্ত একটি পরিচয় বা দায়িত্ব আরোপ করা হলে তা জনগণের ম্যান্ডেটের সীমা অতিক্রম করে না?
২. সংসদ সর্বময় আইনপ্রণেতা প্রতিষ্ঠান
বাংলাদেশের সাংবিধানিক কাঠামো অনুযায়ী জাতীয় সংসদই আইন প্রণয়ন ও সংবিধান সংশোধনের একমাত্র বৈধ ক্ষেত্র। সংসদ গঠিত হওয়ার পর, সংবিধান সংস্কার প্রয়োজন হলে তা সংসদের ভেতরেই হতে পারে—সরকার ও বিরোধীদলের অংশগ্রহণে, সাংবিধানিক বিধান অনুসরণ করে। যদি নতুন সংসদে শক্তিশালী বিরোধীদল থাকে, তাহলে বিতর্ক, প্রস্তাব, সংশোধনী—সবই সংসদীয় পদ্ধতিতেই হওয়া উচিত। বাইরের কোনো সমান্তরাল কাঠামো তৈরির যুক্তি নিতান্তই দুর্বল।
৩. অন্তর্বর্তী কাঠামোর প্রাসঙ্গিকতা
অন্তর্বর্তী সরকার বা তার অধীন গঠিত কোনো সংস্কার পরিষদ রাজনৈতিক সঙ্কটের সময় একটি অস্থায়ী সমাধান হতে পারে। কিন্তু নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের রায় পাওয়ার পর সেই অস্থায়ী কাঠামোর অস্তিত্ব ও ভূমিকা পুনর্মূল্যায়ন জরুরি। গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট ফিরে এলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রবিন্দু সংসদেই ফিরে আসা উচিত।
৪. ‘জুলাই সনদ’ প্রসঙ্গ
রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচিত ‘জুলাই সনদ’ যদি সরকার ও বিরোধীদল উভয়ের সমর্থনে প্রণীত হয়ে থাকে, তবে তার বাস্তবায়নের দায়ও সংসদের ভেতরেই নির্ধারিত হওয়া উচিত। বাইরে থেকে কারও তত্ত্বাবধান বা নির্দেশনার প্রয়োজনীয়তা তখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
যদি কোনো দলের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমত নিয়ে বিতর্ক থাকে, সেটিও সংসদীয় আলোচনার বিষয় হওয়া উচিত—ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিতর্কে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় সমাধান খোঁজা অধিক গ্রহণযোগ্য।
৫. বিশৃঙ্খলা নাকি নীতিগত অবস্থান?
কেউ সংবিধান সংস্কারের পক্ষে মত দিলেই তাকে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযুক্ত করা যায় না—এ কথাও সত্য। তবে সংস্কারের প্রক্রিয়া যদি নির্বাচনী ম্যান্ডেট, সাংবিধানিক সীমা ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে গড়ে ওঠে, তাহলে তা রাজনৈতিক অস্থিরতার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সুতরাং প্রশ্নটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক না হয়ে প্রক্রিয়াকেন্দ্রিক হওয়া জরুরি:
সংবিধান সংস্কারের ক্ষমতা কার?
জনগণ কী ম্যান্ডেট দিয়েছে?
সংসদের বাইরে সমান্তরাল কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা কতটুকু?
গণতন্ত্রে চূড়ান্ত নির্ণায়ক জনগণের ভোটে গঠিত সংসদ। সংস্কার, সংশোধন বা পুনর্গঠন—সবকিছুই সংসদীয় পদ্ধতিতে, প্রকাশ্য বিতর্ক ও সাংবিধানিক সীমারেখার ভেতরেই হওয়া উচিত। অন্যথায় যে কোনো সদিচ্ছাকেও সন্দেহের চোখে দেখা হবে। দেখাই উচিত।
এ মুহূর্তে সবচেয়ে প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও সাংবিধানিক শুদ্ধতা নিশ্চিত করা। গণতন্ত্রে টেকসই স্থিতিশীলতা আসে প্রক্রিয়ার বৈধতা থেকে—ব্যক্তির ইচ্ছায় নয়।
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats