প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইরানে সামরিক হামলার সম্ভাব্য বিকল্পগুলো জানানো হয়েছে। এটি শুধু তেহরানের শাসকদের উদ্দেশে বার্তা নয়, এটি সবার জন্য একটি সংকেত। ট্রাম্প বোঝাতে চাইছেন, তিনি ইরানের বিক্ষোভকারীদের উদ্ধারে এগোতে চান। ইরানের চলমান বিক্ষোভ নিয়ে ট্রাম্প ক্রমেই আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছেন।
তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র লকড অ্যান্ড লোডেড, মানে হামলার জন্য প্রস্তুত। শাসকগোষ্ঠী যদি বিক্ষোভকারীদের হত্যা চালিয়ে যায়, তাহলে আমেরিকা তাদের উদ্ধার করতে আসবে।
বড় বড় হুমকি ট্রাম্প প্রায়ই নীতির জায়গায় দাঁড় করান। তবে বিষয়টি এখানেই শেষ নয়। ট্রাম্প তাঁর পূর্বসূরিদের থেকে আলাদা হতে চান। ওবামা আলোচনা করে পিছু হটেছিলেন। বাইডেন সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগেছেন। ট্রাম্প নিজেকে সেই প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেখতে চান, যিনি শেষ পর্যন্ত কাজটি করে দেখিয়েছেন।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, ট্রাম্পের সামনে আসলে ভালো কোনো পথ নেই। এমনকি মোটামুটি গ্রহণযোগ্য কোনো বিকল্পও নেই। তাঁর সামনে যে তিনটি রাস্তা খোলা আছে, তার প্রতিটিই আগেরটির চেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
ট্রাম্পের হাতে থাকা প্রথম পথটি হলো প্রতীকী হামলা। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের কিছু ব্যারাকে আঘাত হানা কিংবা কোনো একটি নৌঘাঁটি ধ্বংস করা। এমন মাত্রার হামলা করা, যাতে বলা যায় যে কিছু একটা করা হয়েছে, কিন্তু যুদ্ধ যেন শুরু না হয়ে যায়। তবে বাস্তবে এগুলো খুব কমই কোনো ফল আনে।
কয়েকটি ভবন ধ্বংস হলে বাসিজ বাহিনী তরুণীদের ধরে ভ্যানে তোলা বন্ধ করবে না। বিক্ষোভের পর যে ফাঁসি দেওয়া হয়, তা–ও থামবে না। আলী খামেনি এর চেয়েও ভয়াবহ পরিস্থিতিতে টিকে গেছেন। মার্কিন বিমান হামলা তাঁর জন্য নতুন কিছু নয়।
এর চেয়েও বড় সমস্যা হলো, ইরানি শাসকগোষ্ঠী এ হামলাকে বিদেশি ষড়যন্ত্রের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরে। এতে তাদের সমর্থকেরা আরও সংগঠিত হয় এবং দমন–পীড়ন আরও কঠোর হয়। ইতিহাস বলে, এই কৌশল সাধারণত বিক্ষোভকারীদের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনে না।
এ ছাড়া একটি বাস্তব সীমাবদ্ধতাও আছে। আগের মতো এখন পারস্য উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরি বহর মোতায়েন নেই। ফলে যেকোনো অভিযানে নির্ভর করতে হবে দূরপাল্লার সামরিক সক্ষমতা কিংবা সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত বা কাতারের ঘাঁটির ওপর।
কিন্তু আল উদেইদ বিমানঘাঁটিতে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার অভিজ্ঞতার পর এসব মিত্রদেশ ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়াতে আগ্রহী নয়। এতে তাদের শহর, তেল অবকাঠামো এবং পুরো অর্থনীতি ঝুঁকির মুখে পড়ে যাবে।
ট্রাম্পের হাতে থাকা দ্বিতীয় পথটি হলো ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে দেওয়া। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও বিপ্লবী গার্ডের শীর্ষ কমান্ডারদের লক্ষ্য করে হামলা চালানো। শাসক সরিয়ে দেওয়া, ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি করা এবং তারপর গণতন্ত্র আপনাতেই বিকশিত হতে দেওয়া। শুনতে এটি আকর্ষণীয়। কিন্তু বাস্তবে এ ধরনের কৌশল খুব কম ক্ষেত্রেই কাজে দেয়।
বিক্ষোভকারীরা ইরানে সবচেয়ে সংগঠিত ও সবচেয়ে সশস্ত্র শক্তি নয়; বরং সেটি হলো ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর। এই বাহিনীতে আনুমানিক ১ লাখ ৯০ হাজার সদস্য রয়েছেন। নেতৃত্বে আঘাত হানলে এই বাহিনী বিলুপ্ত হয়ে যাবে না। বরং একটি ক্ষমতার লড়াই শুরু হবে, যেখানে জেতার সবচেয়ে ভালো অবস্থানে থাকবে এই গার্ডরাই।
সবচেয়ে সম্ভাব্য পরিণতি হলো একটি সামরিক জান্তা, যারা ক্ষমতা দৃঢ়ভাবে কুক্ষিগত করবে, প্রতিদ্বন্দ্বীদের নির্মূল করবে এবং নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনায় বসবে। বিক্ষোভকারীদের জন্য তা হবে এক নির্মম বিদ্রূপ।
তাদের উদ্ধারেই যে হস্তক্ষেপ করা হলো, তার ফল হিসেবে দাঁড়াবে এমন এক শাসনব্যবস্থা, যা আগের ধর্মতান্ত্রিক ব্যবস্থার চেয়েও নিষ্ঠুর এবং দমনে আরও দক্ষ।
ট্রাম্পের হাতে থাকা তৃতীয় পথটি হলো দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান। পরিকল্পিত আকাশপথের হামলার মাধ্যমে ইরানের নিরাপত্তাকাঠামো ধীরে ধীরে দুর্বল করে দেওয়া। কমান্ড সেন্টার, অস্ত্রের গুদাম ও যোগাযোগব্যবস্থা ধ্বংস করে দমন–পীড়ন চালানোকে কঠিন করে তোলাই এর লক্ষ্য। এতে স্থলবাহিনী পাঠাতে হয় না, তাই বাইরে থেকে এটি নিয়ন্ত্রিত ও পরিমিত মনে হতে পারে। কিন্তু এতে যত বেশি সফলতা আসবে, ততই বিশৃঙ্খলার ঝুঁকি বাড়বে।
রাষ্ট্রের কাঠামো যদি ব্যাপকভাবে ভেঙে দেওয়া হয়, তাহলে ফল হিসেবে সাধারণত স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক রূপান্তর আসে না। রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়। সেই শূন্যতা কোনো সংগঠিত গণতান্ত্রিক শক্তি পূরণ করতে পারে না। ইতিহাস বলে, এমন পরিস্থিতি অনেক সময় লিবিয়া বা ইয়েমেনের মতো পরিণতির দিকে গড়ায়।
এ ধরনের ক্ষেত্রে বড় জনসংখ্যার একটি দেশ জাতিগত, গোত্রভিত্তিক কিংবা আঞ্চলিক বিভাজনে খণ্ডিত হয়ে পড়ে। জাতীয় পর্যায়ে শাসন করার মতো কোনো ঐক্যবদ্ধ বিরোধী নেতৃত্ব তখন আর থাকে না। এর পরিবর্তে নানা সশস্ত্র গোষ্ঠী ও ক্ষমতাকেন্দ্র নিজেদের প্রভাব বাড়াতে প্রতিযোগিতায় নামে। তখন রাজনীতি চলে অস্ত্রের শক্তিতে, জনমতের ভিত্তিতে নয়।
বছরের পর বছর দমন–পীড়নের ফলে ইরানের রাজনৈতিক দল, শ্রমিক সংগঠন ও নাগরিক সমাজ ভেতর থেকে ফাঁপা হয়ে গেছে। সাহসের অভাব নেই, কিন্তু রাষ্ট্র চালানোর মতো প্রস্তুত কাঠামোও নেই। অনেকে ইরানি শাসকগোষ্ঠীকে ঘৃণা করলেও ইরাক, সিরিয়া বা লিবিয়ায় রাষ্ট্র ভেঙে পড়ার পর কী হয়েছিল, তা তাঁরা ভুলে যাননি। বিশৃঙ্খলার মূল্য কতটা ভয়াবহ, তাঁরা জানেন।
অলংকারপূর্ণ ভাষা সরিয়ে দিলে বাস্তবতা খুব সহজ। ট্রাম্প যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তা পূরণ করার মতো কোনো কার্যকর সামরিক বিকল্প নেই। প্রতীকী হামলা খুবই দুর্বল। শীর্ষ নেতৃত্বে আঘাত সামরিক জান্তা কায়েমের ঝুঁকি তৈরি করে। আর দীর্ঘমেয়াদি অভিযান রাষ্ট্র ভেঙে পড়া ও আঞ্চলিক যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়ায়।
এর মানে এই নয় যে ট্রাম্প পদক্ষেপ নেবেন না। রাজনৈতিক চাপ ও নিজের দেওয়া প্রতিশ্রুতির যুক্তিই তাঁকে সামরিক পথে ঠেলে দিতে পারে। কিন্তু যাঁরা আকাশ থেকে নামা মুক্তির স্বপ্ন দেখছেন, তাঁরা হতাশ হবেন।
ইরানের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে ইরানিদের হাতেই। সাহস ও সহনশীলতার এক দীর্ঘ লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে। কোনো বাইরের শক্তি সেই লড়াই শর্টকাটে শেষ করে দিতে পারে না। ওয়াশিংটন সীমিতভাবে সহায়তা করতে পারে। কিন্তু ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে স্বাধীনতা এনে দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়।
ববি ঘোষ, টাইম ম্যাগাজিনের সাবেক আন্তর্জাতিক সম্পাদক
টাইম থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত
প্রথম আলোর সৌজন্যে
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats