বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রের রাজনীতিকরণ কোনো আকস্মিক বিচ্যুতি নয়; এটি কয়েক দশক ধরে গড়ে ওঠা একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। ক্ষমতার পালাবদল, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত মিলিয়ে এই প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। আজকের বাস্তবতা বুঝতে হলে আমাদের এই ধারার ঐতিহাসিক বিকাশ, রাজনৈতিক প্রণোদনা এবং আমলাতন্ত্রের নিজস্ব ভূমিকা—সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে।
স্বাধীনতার পর প্রথম বিসিএস—মুক্তিযোদ্ধা ব্যাচ—একটি আবেগঘন ও নৈতিক প্রেক্ষাপটে গঠিত হয়। সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রে মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসন ও মর্যাদা দেওয়া ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু সেই সময়ে যদি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় মেধা ও প্রতিযোগিতার মানদণ্ড আংশিকভাবে শিথিল হয়ে থাকে, তবে তা ভবিষ্যতের জন্য একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। প্রশাসনের ভিত্তি যদি শুরু থেকেই সম্পূর্ণ নিরপেক্ষতার বদলে আংশিক রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রভাবিত হয়, তাহলে পরবর্তী সময়ে সেটিই রেফারেন্স পয়েন্টে পরিণত হয়।
পরবর্তীকালে জিয়াউর রহমান প্রশাসনে পেশাদারিত্ব ও প্রতিযোগিতামূলক মানদণ্ড পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন—এমন মূল্যায়ন অনেক বিশ্লেষকের। কিন্তু সেই ধারা স্থায়ী হয়নি। হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ-এর আমলে বৃহৎ আকারে নিয়োগের মাধ্যমে প্রশাসন সংখ্যাগতভাবে সম্প্রসারিত হয়। দ্রুত সম্প্রসারণের ফলে পদোন্নতির কাঠামোতে চাপ সৃষ্টি হয়, এবং উচ্চপদে সীমিত সুযোগকে ঘিরে অসুস্থ প্রতিযোগিতা বাড়ে। এই পর্যায়ে পেশাগত দক্ষতার পাশাপাশি—কখনও কখনও তার চেয়েও বেশি—রাজনৈতিক সংযোগ ও আনুগত্য গুরুত্ব পেতে শুরু করে।
গণতান্ত্রিক রাজনীতির পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর দলীয় প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হয়। প্রশাসনের ভেতরে প্রভাববলয় গড়ে তোলা রাজনৈতিক কৌশলের অংশে পরিণত হয়। বিশেষত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ঐতিহাসিক ও আদর্শিক ঘনিষ্ঠতার ভিত্তিতে প্রশাসনের একটি অংশকে সংগঠিত করতে সক্ষম হয়েছে—এমন ধারণা জনপরিসরে প্রচলিত। ফলে দলটি ক্ষমতায় থাকাকালে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে একটি সহায়ক বলয় পেয়েছে, যার সুবিধা দলটি নিয়েছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) অতীতে প্রশাসনে একই মাত্রার সংগঠিত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পারেনি—এমন অভিজ্ঞতা থেকে তাদের মধ্যে ক্ষতির বোধ তৈরি হতেই পারে। ক্ষমতায় এসে প্রশাসনিক প্রতিরোধ বা ধীরগতির মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা একটি দলকে স্বাভাবিকভাবেই প্রলুব্ধ করতে পারে “নিজেদের লোক” তৈরির পথে হাঁটতে। কিন্তু এখানেই মূল দ্বন্দ্ব—এই পথ স্বল্পমেয়াদে সুবিধা দিলেও দীর্ঘমেয়াদে রাজনীতিকরণের চক্রকে আরও গভীর করে।
গত দেড় দশকে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। একবার প্রশাসন গভীরভাবে দলীয় বলয়ে আবদ্ধ হয়ে পড়লে, সেটি থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন। নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে যদি ব্যাপক বদলি ও প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ নেয়, তাহলে অস্থিরতা বাড়ে; আর যদি কিছুই না করে, তাহলে পূর্ববর্তী প্রভাববলয় অটুট থাকে। ফলে রাষ্ট্রযন্ত্র এক ধরনের স্থায়ী রাজনৈতিক দোলাচলে পড়ে।
তবে এই আলোচনায় শুধু রাজনৈতিক দলগুলোকে দায়ী করলে চিত্রটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। আমলাতন্ত্র নিজেও দায়মুক্ত নয়। একজন সিভিল সার্ভেন্টের আনুগত্য সরকার নয়, রাষ্ট্র ও সংবিধানের প্রতি। সরকার পরিবর্তিত হয়; প্রশাসন স্থায়ী। যদি কোনো কর্মকর্তা স্বেচ্ছায় দলীয় আনুগত্যের বিনিময়ে ব্যক্তিগত সুবিধা নেন, তবে তিনি শুধু নিজের পেশাগত নৈতিকতা লঙ্ঘন করেন না—প্রতিষ্ঠানকেও দুর্বল করেন। রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও আমলার পারস্পরিক সুবিধাবাদী সম্পর্কই রাজনীতিকরণের চক্রকে টিকিয়ে রাখে।
অবশ্য বাস্তব সীমাবদ্ধতাও আছে। বদলি, পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ পদায়নের ওপর রাজনৈতিক নির্বাহীর নিয়ন্ত্রণ থাকলে ব্যক্তিগত নৈতিক সাহসের সীমা থাকে। তাই সমাধান কেবল নৈতিক আহ্বানে নয়; প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে।
সম্ভাব্য পথগুলো কিন্তু স্পষ্ট:
প্রথমত, নিয়োগ ও পদোন্নতিতে স্বচ্ছ, যাচাইযোগ্য এবং কর্মদক্ষতাভিত্তিক মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, নির্দিষ্ট মেয়াদের পদায়ন ও বদলি নীতিমালা নিশ্চিত করে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সুযোগ সীমিত করতে হবে।
তৃতীয়ত, পাবলিক সার্ভিস কমিশন ও প্রশাসনিক মূল্যায়ন ব্যবস্থাকে কার্যকর ও স্বাধীন করতে হবে।
চতুর্থত, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি ন্যূনতম ঐকমত্য গড়ে তোলা প্রয়োজন—যে প্রশাসনকে দলীয়করণ করা হবে না। একইসাথে রাজনীতির কাছে আমলাতন্ত্রের শুদ্ধ জবাবদিহিতার পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
পঞ্চমত, আমলাতন্ত্রের ভেতর থেকেই পেশাগত নৈতিকতা ও নিরপেক্ষতার সংস্কৃতি শক্তিশালী করতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, “নিজেদের লোক” তৈরি করা কোনো দলের জন্যই টেকসই সমাধান নয়। আজ যে দল প্রশাসনে প্রভাববলয় গড়ে তোলে, আগামীকাল ক্ষমতার পালাবদলে সেই বলয়ই প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা ও জনসেবা।
অতএব, প্রশ্নটি কেবল কে কতটা প্রভাব বিস্তার করেছে—সেটি নয়। প্রশ্নটি হলো: বাংলাদেশ কি একটি পেশাদার, নিরপেক্ষ ও দায়িত্বশীল আমলাতন্ত্র গড়ে তুলতে পারবে, যা যে কোনো নির্বাচিত সরকারের অধীনে সমান দক্ষতায় কাজ করবে?
এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে রাজনৈতিক নেতৃত্বের আত্মসংযম, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের সাহস এবং আমলাতন্ত্রের নিজস্ব নৈতিক অবস্থানের ওপর। তিনটির সমন্বয় ছাড়া রাজনীতিকরণের এই চক্র ভাঙা সম্ভব নয়।
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats