বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকবে। বহু আলোচনার পর চূড়ান্ত হওয়া জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত সংস্কার প্রস্তাবগুলোর ওপর সরাসরি জনসমর্থন জানতে আয়োজিত হয় বহুল আলোচিত গণভোট। দীর্ঘ বিরতির পর জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিগত প্রশ্ন নির্ধারণের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক ছিল। কিন্তু ফলাফল ঘোষণার পর একটি অদৃশ্য অস্বস্তি জেগে উঠেছে, খুব প্রকাশ্যে নয়, তবু স্পষ্ট। প্রশ্ন উঠছে: এই বিজয় কি সত্যিই সর্বসম্মত জনরায়, নাকি কেবল কাঠামোগত সাফল্য?
সরকারি তথ্যানুযায়ী, প্রায় ১২.৭ কোটি নিবন্ধিত ভোটারের মধ্যে ভোট দিয়েছেন ৭.৭ কোটি—অর্থাৎ ৬০ শতাংশ উপস্থিতি। তাদের মধ্যে ৬৮ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন। কিন্তু সমগ্র ভোটারসংখ্যার সঙ্গে তুলনা করলে চিত্রটি ভিন্ন। মোট ভোটারের মাত্র প্রায় ৩৮ শতাংশ সরাসরি এই সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছেন। অর্থাৎ ৬২ শতাংশ ভোটার হয় বিরোধিতা করেছেন, নয়তো ভোটদানে বিরত থেকেছেন বা তাদের ভোট বাতিল হয়েছে। গণতান্ত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটিকে নিরঙ্কুশ জনসমর্থন বলা কঠিন।
গণভোটের কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন ছিল শুরু থেকেই। প্রায় ৫০টি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব একত্রে রেখে একটি মাত্র ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বিকল্প দেওয়া হয়। অনেক ভোটারের মত, তারা হয়তো কিছু প্রস্তাবে একমত ছিলেন, কিন্তু সবগুলোতে নয়। ফলে সম্মিলিত অনুমোদন দেওয়া তাদের কাছে বিভ্রান্তিকর মনে হয়েছে। গণতান্ত্রিক চর্চায় বিষয়ভিত্তিক সিদ্ধান্তের সুযোগ না থাকলে মতামতের সূক্ষ্মতা হারিয়ে যায়—এই বাস্তবতাই এখানে সামনে এসেছে।
শুরু থেকেই আপত্তি জানিয়েছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। যেসব বিষয়ে তাদের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ ছিল, সেগুলোর আলাদা প্রতিফলন না থাকায় তারা প্রক্রিয়াটিকে প্রশ্নবিদ্ধ বলে মনে করে। ফলে দলটি প্রচারণায় উচ্চকিত অবস্থান নেয়নি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, বিএনপির একটি বড় অংশের সমর্থক ভোটদানে অনাগ্রহী ছিলেন। এই বাস্তবতা অনুধাবনে ব্যর্থতা বা তা উপেক্ষা—উভয়ই অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য কৌশলগত ভুল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
তবে একটি ইতিবাচক দিক হলো—বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন ফলাফল ঘোষণায় কোনো দৃশ্যমান কারচুপির আশ্রয় নেয়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু অসামঞ্জস্যতার অভিযোগ উঠলেও সেগুলোর সুস্পষ্ট প্রমাণ এখনো প্রতিষ্ঠিত নয়। তবু প্রক্রিয়াগত বিতর্ক পুরো আয়োজনের গ্রহণযোগ্যতায় ছায়া ফেলেছে।
আন্তর্জাতিক চর্চায় দেখা যায়, সংবিধান সংশোধন বা মৌলিক কাঠামোগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অনেক দেশ কঠোর মানদণ্ড অনুসরণ করে। যুক্তরাষ্ট্র-এ সরাসরি জাতীয় গণভোটের বিধান নেই; সংবিধান সংশোধনের জন্য কংগ্রেসের দুই-তৃতীয়াংশ এবং অঙ্গরাজ্যগুলোর তিন-চতুর্থাংশ সমর্থন প্রয়োজন—একটি সুস্পষ্ট ‘সুপার-মেজরিটি’। ইতালি বা হাঙ্গেরি-র মতো দেশে নির্দিষ্ট অংশগ্রহণের সীমা পূরণ না হলে গণভোট বাতিল বলে গণ্য হয়। অর্থাৎ, শুধু উপস্থিতদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নয়—মোট ভোটারের বড় অংশের সক্রিয় অংশগ্রহণকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ২০২৬ সালের গণভোটে মোট ভোটারের মাত্র ৩৮ শতাংশের সমর্থন আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে একটি তুলনামূলকভাবে দুর্বল ম্যান্ডেট হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। যারা ভোট দেননি, তাদের নীরবতাকে সরাসরি সমর্থন ধরা কঠিন। আইনি বৈধতা অর্জন করা এক বিষয়; কিন্তু নৈতিক ও রাজনৈতিক স্থায়িত্ব অর্জনের জন্য প্রয়োজন বিস্তৃত সামাজিক ঐকমত্য।
অবশ্যই, এই গণভোট ছিল জনগণের দ্বারস্থ হওয়ার একটি সাহসী উদ্যোগ। তবে প্রক্রিয়াগত সীমাবদ্ধতা এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার আলোকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে—গণতন্ত্র কেবল সংখ্যার খেলা নয়। ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হয়েছে, কিন্তু বিতর্কও রয়ে গেছে। সংবিধান যদি সত্যিই জাতির অভিন্ন আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হতে চায়, তবে সেখানে ৩৮ শতাংশের সীমা অতিক্রম করে আরও বিস্তৃত সম্মতির ভিত্তি গড়ে তোলা জরুরি।
ইতিহাস শেষ পর্যন্ত সংখ্যার হিসাব নয়, প্রজ্ঞার প্রমাণ খোঁজে। জুলাই সনদের গণভোট সেই প্রজ্ঞার পরীক্ষায় কতটা উত্তীর্ণ হলো—তার উত্তর সময়ই দেবে।
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats