বাংলাদেশের রাজনীতি আবারও এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও আন্দোলনের পর জনমনে যখন একটি কার্যকর ও অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের প্রত্যাশা জেগেছিল, তখন নতুন মন্ত্রিসভার গঠন এবং কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্ত সেই আশার ভিতরে সংশয়ের রেখা টেনে দিয়েছে। “সবার আগে দেশ”—এই উচ্চারণ শুধু একটি স্লোগান নয়, এটি ছিল প্রত্যাশার প্রতিশ্রুতি। তাই শাসনের শুরুতেই যদি নীতি ও অবস্থানের প্রশ্ন ওঠে, তা নাগরিক সমাজে আলোড়ন তুলবেই।
১। অভ্যন্তরীণ রাজনীতি: আনুগত্য, তারুণ্য ও রাষ্ট্রপরিচালনার বাস্তবতা
বর্তমান মন্ত্রিসভায় তারুণ্যের উপস্থিতি এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কর্মীদের মূল্যায়ন স্পষ্ট। রাজপথের ত্যাগ ও আনুগত্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার মধ্যে রাজনৈতিক ন্যায্যতা আছে। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনা কেবল আবেগ বা আনুগত্যের উপর দাঁড়িয়ে থাকে না; এর জন্য প্রয়োজন অভিজ্ঞতা, প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা এবং কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সামর্থ্য।
মন্ত্রিসভার বড় অংশ প্রথমবারের মতো প্রশাসনিক দায়িত্ব পেয়েছেন। উদ্যম ও সততা থাকলেও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, ব্যাংক খাত সংস্কার, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কিংবা বৈদেশিক বিনিয়োগ টিকিয়ে রাখার মতো চ্যালেঞ্জে অভিজ্ঞতার অভাব দৃশ্যমান হয়ে উঠতে পারে। এমন বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী গুরুত্বপূর্ণ কিছু মন্ত্রণালয় নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন—এটিকে কেউ দেখছেন নেতৃত্বের দৃঢ়তা হিসেবে, আবার কেউ দেখছেন ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের লক্ষণ হিসেবে।
উপদেষ্টা পরিষদ গঠন নিয়েও মতভেদ রয়েছে। প্রবীণ ও নির্দলীয় ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তি একদিকে অভিজ্ঞতার ঘাটতি পূরণের প্রয়াস হতে পারে, অন্যদিকে এটি রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার কৌশলও হতে পারে। তবে যদি এসব পদায়ন কেবল দলীয় সমীকরণ মেটানোর প্রয়াস হয়, তাহলে তা সরকারের নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করবে। জনগণের প্রত্যাশা এখন স্পষ্ট—যোগ্যতা ও জবাবদিহিই হবে নিয়োগের প্রধান মানদণ্ড।
এখানে একটি আশার জায়গা রয়েছে: তারুণ্যকে সুযোগ দেওয়া যেমন ইতিবাচক, তেমনি ব্যর্থতার ক্ষেত্রে আপসহীন জবাবদিহি নিশ্চিত করা আরও গুরুত্বপূর্ণ। যদি নেতৃত্ব দক্ষতা ও দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করে, তবে এই পরীক্ষা উত্তীর্ণ হওয়া অসম্ভব নয়।
২।। পররাষ্ট্রনীতি ও বৈশ্বিক চাপ: সার্বভৌমত্বের নতুন সমীকরণ
বর্তমান সরকারের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্ব। খলিলুর রহমানকে এ দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
প্রথমত, অতীতে যার ভূমিকার সমালোচনা করা হয়েছে, তাকে এখন দায়িত্ব দেওয়া—এটি রাজনৈতিক অবস্থানের ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। নীতির পরিবর্তন অবশ্যই সম্ভব, কিন্তু তার যুক্তি ও ব্যাখ্যা জনসমক্ষে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক বাস্তবতা অস্বীকার করা যায় না। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক নির্ভরতা, ঋণ ও কূটনৈতিক সমীকরণ—সব মিলিয়ে একটি সরকারকে অনেক সময় কৌশলী সমন্বয় করতে হয়। ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রভাবশালী শক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষা করা সহজ নয়। এখানে টেকনোক্র্যাট নেতৃত্ব কখনও সুবিধা এনে দিতে পারে, আবার রাজনৈতিক দৃঢ়তার ঘাটতি থাকলে তা দুর্বলতাও হয়ে উঠতে পারে।
তৃতীয়ত, আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটও জটিল। পতিত রাজনৈতিক শক্তিগুলোর পুনর্গঠন, প্রতিবেশী দেশের ভূমিকাকে ঘিরে বিতর্ক, প্রবাসী রাজনৈতিক তৎপরতা—সব মিলিয়ে পররাষ্ট্রনীতি এখন শুধু কূটনৈতিক কাগজপত্রের বিষয় নয়; এটি নিরাপত্তা ও জাতীয় মর্যাদার প্রশ্নও।
তবে সন্দেহকে ধ্রুব সত্য হিসেবে ধরে নেওয়াও সমান ঝুঁকিপূর্ণ। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন, অর্থনৈতিক স্থিতি ফিরিয়ে আনা এবং কূটনৈতিক অচলাবস্থা ভাঙতে যদি এই সিদ্ধান্ত কার্যকর প্রমাণিত হয়, তবে তা নেতৃত্বের দূরদর্শিতার প্রমাণ হিসেবেই বিবেচিত হবে। কিন্তু যদি এর ফলে জাতীয় স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয় বা সিদ্ধান্তগুলো বহির্বিশ্বনির্ভর বলে প্রতীয়মান হয়, তাহলে জনগণের আস্থা দ্রুত ক্ষয়ে যেতে পারে।
৩।। গণতন্ত্রের মাপকাঠি: স্লোগান না সাহস?
গণতন্ত্র কেবল নির্বাচনী প্রক্রিয়া নয়; এটি নীতি, স্বচ্ছতা ও সার্বভৌম সিদ্ধান্তগ্রহণের সমন্বিত রূপ। দীর্ঘ স্বৈরশাসনের অবসানের পর জনগণ বিশ্বাস করেছিল—এবার রাষ্ট্র পরিচালনায় জাতীয় স্বার্থই হবে একমাত্র মানদণ্ড। তাই শাসনের শুরুতেই আপসের আভাস পাওয়া গেলে সেটি আস্থার সংকট তৈরি করে।
এখন প্রশ্ন একটাই—নেতৃত্ব কি পরিস্থিতির চাপে আপস করবে, নাকি জনগণের প্রত্যাশাকে শক্তি হিসেবে গ্রহণ করবে?
তারেক রহমান–এর সামনে চ্যালেঞ্জ দ্বিমুখী: একদিকে প্রশাসনিক দক্ষতা প্রমাণ, অন্যদিকে বৈশ্বিক চাপের মধ্যেও সার্বভৌম অবস্থান বজায় রাখা। যদি তিনি নীতি ও জবাবদিহিকে অগ্রাধিকার দেন, তবে সংশয়ের মেঘ কাটতে পারে। আর যদি সিদ্ধান্তগুলো অস্পষ্টতা ও নির্ভরতাকে পুষ্ট করে, তবে গণতান্ত্রিক পুনর্জাগরণের স্বপ্ন আবারও প্রশ্নের মুখে পড়বে।
ইতিহাস অপেক্ষা করছে—এই সময়কে কি দৃঢ় নেতৃত্বের অধ্যায় হিসেবে লেখা হবে, নাকি অপূর্ণ সম্ভাবনার আরেকটি গল্প হিসেবে।
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats