ভূরাজনীতির দাবা খেলায় ‘শিয়া ক্রিসেন্ট’ বা শিয়া বলয় একসময় তেহরানের অদম্য প্রভাব বিস্তারের এক দুর্ভেদ্য করিডোর হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু যুদ্ধের ঝোড়ো হাওয়া, সামরিক চাপ এবং পরিবর্তিত আঞ্চলিক সমীকরণে সেই চেনা রূপটি আজ আর নেই। এটি এখন আর কোনো নিখুঁত আদর্শিক অক্ষ বা সুসংহত জোট নয়; বরং কঠিন বাস্তবতার মুখে অভিযোজনক্ষম এক জটিল ‘ব্যবস্থা’। লেভান্ট থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা এই নেটওয়ার্ক আজ সম্প্রসারণের বদলে টিকে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত। প্রশ্ন হলো—চলমান ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং অসম্পূর্ণ উত্তেজনা প্রশমনের খেলায় তেহরান কি এই নেটওয়ার্ককে একটি সহনশীল অবকাঠামোতে রূপ দিতে পারবে, নাকি ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে এটি তার কার্যকারিতা হারাতে বসবে?
দীর্ঘদিন ধরে, "শিয়া ক্রিসেন্ট" (Shiite Crescent)-কে প্রভাব বিস্তারের একটি অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল বলয় হিসেবে বিবেচনা করা হতো; যা মিত্রশক্তি, মিলিশিয়া গোষ্ঠী এবং চলাচলের করিডোর বা পথের মাধ্যমে তেহরানকে লেভান্ট অঞ্চলের সাথে সংযুক্ত করত।
বর্তমানে সেই ধারণাটি আর যথেষ্ট নয়। সেই নেটওয়ার্কটি এখনও বিদ্যমান, তবে এর কার্যপদ্ধতি বদলে গেছে: এটি এখন আর একটি সুসংহত বা নিরেট জোট হিসেবে কাজ করে না, বরং একটি অভিযোজনক্ষম ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে। এটি একই সাথে নানামুখী চাপের মুখে থেকেও প্রতিরোধ ক্ষমতা (deterrence) তৈরি, চলাচলের পথ বজায় রাখা এবং দরকষাকষির সক্ষমতা ধরে রাখার মতো বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে সক্ষম।
প্রশ্নটি এটা নয় যে ইরানের কোনো আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক আছে কি না। বরং প্রশ্ন হলো—মাসব্যাপী যুদ্ধ, সামরিক চাপ এবং উত্তেজনা প্রশমনের অসম্পূর্ণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সেই নেটওয়ার্কটি এখন কেমন রূপ নিয়েছে।
"শিয়া ক্রিসেন্ট"-এর ধারণাটি তখনই কেবল কার্যকর হতে পারে, যখন এর আদি ও কঠোর সংজ্ঞার গণ্ডি থেকে একে মুক্ত করা হয়। এটি এখন আর কোনো অবিচ্ছিন্ন আদর্শিক অক্ষ নয়; বরং এটি ইরান, ইরাক, সিরিয়া, লেবানন এবং ইয়েমেনকে সংযুক্তকারী একগুচ্ছ অসম বা ভিন্নধর্মী সম্পর্কের সমষ্টি। এই সম্পর্কগুলো কোনো একক কমান্ড বা নির্দেশনার শৃঙ্খলে আবদ্ধ নয়, বরং রাজনৈতিক সখ্যতা, সামরিক নির্ভরশীলতা, কৌশলগত চলাচলের সুবিধা এবং কৌশলগত অভিন্ন লক্ষ্যের সমন্বয়ে গঠিত।
এই কাঠামোর মধ্যে ইরানের লক্ষ্য কেবল প্রভাব বিস্তার করা নয়, বরং নিজের অবস্থানের গভীরতা ও স্থায়িত্ব বৃদ্ধি করা। এই নেটওয়ার্কটি প্রতিরোধ ক্ষমতাকে বাইরের দিকে প্রসারিত করতে, ইরানের সীমান্তের ওপর চাপ কমাতে, লেভান্ট ও লোহিত সাগরের দিকে চলাচলের পথ বজায় রাখতে এবং যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও তাদের আঞ্চলিক সহযোগীদের বিরুদ্ধে পরোক্ষভাবে সংঘাত বা উত্তেজনা বাড়ানোর সক্ষমতা ধরে রাখতে সহায়তা করে।
এ কারণেই, এই 'ক্রিসেন্ট' বা বলয়টিকে কেবল একটি ভৌগোলিক ভূখণ্ড হিসেবে না দেখে বরং একটি 'ব্যবস্থা' বা 'সিস্টেম' হিসেবে অনেকে দেখে থাকেন। এর কৌশলগত গুরুত্ব নিখুঁত ভৌগোলিক ধারাবাহিকতার ওপর যতটা না নির্ভর করে, তার চেয়ে বেশি নির্ভর করে বিভিন্ন পর্যায়ে ও ভিন্ন ভিন্ন সময়ে এর বিভিন্ন উপাদান বা 'নোড'গুলোকে—যেমন হিজবুল্লাহ, ইরাকি মিলিশিয়া, সিরীয় করিডোর ও আনসারুল্লাহ—সক্রিয় করার সক্ষমতার ওপর।
সাম্প্রতিক ঘটনাবলি এই ব্যবস্থাকে পুরোপুরি ভেঙে না দিয়েও এতে পরিবর্তন এনেছে। তুরস্ক ও মিশরের সম্পৃক্ততায় পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে যুদ্ধবিরতি হয়েছে, তা উত্তেজনা হ্রাসের প্রথম সুনির্দিষ্ট লক্ষণ। তবে এই প্রক্রিয়াটি এখনো আংশিক ও ভঙ্গুর; এছাড়া হরমুজ প্রণালী, নিষেধাজ্ঞা, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক কাঠামোর মতো বিষয়গুলো নিয়ে এখনো আলোচনার অবকাশ রয়েছে।
তেহরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, এই আলোচনা কেবল সংকীর্ণ অর্থে ‘ইরান-কেন্দ্রিক’ কোনো বিষয় বা নথির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আলোচনার বিষয়বস্তুর মধ্যে ‘অ্যাক্সিস অফ রেজিস্ট্যান্স’ বা ‘প্রতিরোধ অক্ষ’-এর বিভিন্ন অংশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালী ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। পাশাপাশি, আলোচনার দরকষাকষিতে বাড়তি সুবিধা আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে এই আঞ্চলিক নেটওয়ার্কের ভূমিকাটিও—প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে—বিবেচ্য হচ্ছে।
এর ফলে ইরানের অবস্থানে পরিবর্তন আসছে। তেহরান এখন আর তার এই নেটওয়ার্ককে কেবল আদর্শিক বা সামরিক চাপের সাধারণ হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করতে পারে না; বরং একে এমন এক কৌশলগত সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করতে হবে যা রক্ষা করা, যার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা এবং যার কার্যক্রম আংশিকভাবে যৌক্তিক বা সুবিন্যস্ত করা প্রয়োজন। অন্য কথায়, এই নেটওয়ার্কটি এখন আর কেবল একমুখী সম্প্রসারণের হাতিয়ার নয়, বরং এটি প্রভাব বিস্তারের এমন এক ভাণ্ডারে পরিণত হয়েছে যা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে কাজে লাগাতে হবে।
একই সাথে, এই নেটওয়ার্কটি চাপের মুখেও রয়েছে। লেবাননে যুদ্ধবিরতির কাঠামো আনুষ্ঠানিকভাবে বহাল থাকা সত্ত্বেও হিজবুল্লাহকে ইসরায়েলি সামরিক চাপের মোকাবিলা করে যেতে হচ্ছে। অন্যদিকে ইরাকের ক্ষেত্রেও বৃহত্তর যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়ে গেছে, কারণ ইরানের কৌশলগত করিডোর বা সংযোগপথগুলোর মধ্যে দেশটির অবস্থান অত্যন্ত কেন্দ্রীয়। ইয়েমেন থেকে পাওয়া সংকেতগুলোও ইঙ্গিত দেয় যে, আঞ্চলিক কূটনীতির সাথে সমন্বয় করে চাপের কৌশল হিসেবে সামুদ্রিক হুমকি ব্যবহারের সক্ষমতা হুথিদের এখনো বজায় রয়েছে।
মূল পরিবর্তনটি শিয়া ক্রিসেন্টের বিলুপ্তি নয়, বরং এর একটি সম্প্রসারণমূলক কাঠামো থেকে ক্ষতিপূরণমূলক নেটওয়ার্কে রূপান্তর। বছরের পর বছর ধরে এই ব্যবস্থাটি ইরানকে একটি অপেক্ষাকৃত সুসংহত ভূখণ্ড জুড়ে প্রভাব ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা বিস্তারের সুযোগ দিলেও, আজ এর প্রধান কাজ হলো ধাক্কা সামলানো, প্রবেশাধিকার বজায় রাখা এবং দ্রুত কৌশলগত পশ্চাদপসরণ রোধ করা।
এর অর্থ হলো আঞ্চলিকীকরণের একটি আরও বাছাইকৃত রূপ। ইরানের স্বার্থ রয়েছে এই নেটওয়ার্কের অপরিহার্য কেন্দ্রগুলো রক্ষা করার, কিন্তু একই সাথে চলমান আলোচনা পর্বে সেগুলোর অকাল অবসান এড়ানোরও।
তাই বর্তমান এই উভয়সংকট: নেটওয়ার্কটিকে ইরানের অবস্থান শক্তিশালী করার জন্য যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য থাকতে হবে, কিন্তু এতটাও সক্রিয় থাকা চলবে না যে এটি উত্তেজনা প্রশমনের পথগুলোকে ব্যাহত করে।
এই পর্যায়ে, কথার চেয়ে প্রভাবের করিডোরগুলো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ইরাক ও সিরিয়া ভূখণ্ডগত এবং রসদ সরবরাহের ধারাবাহিকতার কেন্দ্রীয় অংশ হিসেবে রয়ে গেছে; লেবানন ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সম্মুখ প্রতিরোধ ব্যবস্থা হিসেবে তার গুরুত্ব ধরে রেখেছে; ইয়েমেন লোহিত সাগরের উপর একটি পরোক্ষ সামুদ্রিক প্রভাব এবং এর মাধ্যমে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের সুযোগ করে দেয়। সব মিলিয়ে, এটি চিরায়ত অর্থে একটি সংহত গোষ্ঠী নয়।
অনেক পর্যবেক্ষক শিয়া বলয়ের সম্ভাব্য পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন।
প্রথমত, সবচেয়ে সম্ভাব্য পরিস্থিতি হলো প্রকৃত স্বাভাবিকীকরণ ছাড়াই কৌশলগত স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। তেহরান যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার মাধ্যমে একটি কার্যকর কূটনৈতিক পরিসর ধরে রাখতে আগ্রহী; তারা এই নেটওয়ার্কটিকে পুরোপুরি ভেঙে না দিয়ে বরং এর সক্রিয়তাকে সীমিত বা নিয়ন্ত্রিত রাখতে চায়।
দ্বিতীয়ত, 'শিয়া ক্রিসেন্ট' বা শিয়া বলয়টি এমন এক কাঠামোয় পুনর্গঠিত হবে যা অধিকতর সতর্ক ও কম ঝুঁকিপূর্ণ; এর লক্ষ্য হবে নেটওয়ার্কের সম্প্রসারণের চেয়ে বরং এর মূল কেন্দ্রবিন্দু বা 'নোড'গুলোকে (nodes) রক্ষা করা।
তৃতীয়ত,উত্তেজনা প্রশমন প্রক্রিয়াটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে | আলোচনা চলতে থাকবে, কিন্তু ইসরায়েল হিজবুল্লাহ, সিরিয়া বা নেটওয়ার্কের অন্যান্য অংশের ওপর বাছাইকৃতভাবে হামলা চালাতে থাকবে। ফলে যুদ্ধবিরতিটি একটি স্থিতিশীল ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় উন্নীত হতে পারবে না।
ভূরাজনীতির আলোচনায় অনেক জিজ্ঞাসা রয়েছে।মূল প্রশ্নটি এটা নয় যে 'শিয়া ক্রিসেন্ট'-এর অস্তিত্ব আদৌ আছে কি না। এর অস্তিত্ব অবশ্যই আছে, তবে তা এখন এমন এক রূপে বিদ্যমান যা অধিকতর গতিশীল, অধিকতর ঝুঁকিপূর্ণ এবং যার স্থায়িত্ব বা কার্যকারিতা অনেক ক্ষেত্রে সমঝোতা-নির্ভর। আসল প্রশ্ন হলো, ইরান কি এই নেটওয়ার্কটিকে সম্প্রসারণের হাতিয়ার থেকে বদলে একটি 'সহনশীল ও স্থিতিস্থাপক অবকাঠামো'য় (infrastructure of resilience) রূপান্তর করতে সফল হবে? নাকি ইসরায়েলের চাপ, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরোধমূলক অবস্থান (deterrence) এবং আঞ্চলিক কেন্দ্রগুলোর ভঙ্গুরতার সম্মিলিত প্রভাবে এর কৌশলগত কার্যকারিতা এমন এক মুহূর্তে কমে যাবে—যখন তেহরানের জন্য এর প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি?
দুলাল আহমদ চৌধুরী, সম্পাদক ও প্রকাশক, News Diplomats
www.newsdiplomats.com
ইমেইল: [email protected]
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats