এক মুহূর্তের জন্য মনে হতে পারত, এটা বেইজিং নয়- মস্কো। ভ্লাদিমির পুতিন ও শি জিনপিং যখন লাল গালিচা ধরে গ্রেট হল অব দ্য পিপলের দিকে হাঁটছিলেন, তখন চীনা সামরিক ব্যান্ড বাজাচ্ছিল জনপ্রিয় রুশ রোমান্টিক গান মস্কো নাইটস। গানের একটি লাইন এমন: ‘যদি তুমি জানতে, এই মস্কোর রাতগুলো আমার কাছে কত প্রিয়।’
সুরের ভেতরে কি লুকিয়ে ছিল কোনো রাজনৈতিক রোমান্সের ইঙ্গিত? হয়তো এক ধরনের ‘ব্রোম্যান্স’ও।
‘আমার প্রিয় বন্ধু,’ শিকে বললেন পুতিন।
‘আমার পুরোনো বন্ধু,’ পুতিনকে জবাব দিলেন শি।
এ যেন দুই নেতার ভাষা, যারা বিশ্বকে দেখাতে চান যে তাদের মধ্যে বিশেষ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। সময়ও তারা কম পাননি। বছরের পর বছর ধরে ৪০ বারের বেশি সাক্ষাৎ করেছেন তারা।
সর্বসমক্ষে দেয়া বক্তব্যে তারা দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত সহযোগিতা, অংশীদারত্ব, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বন্ধুত্ব ও বিশ্বাসের কথা বলেছেন। একসঙ্গে তারা যুক্তরাষ্ট্রের ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ পারমাণবিক নীতির সমালোচনা করেন এবং ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ‘গোল্ডেন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার নিন্দা জানান।
সফরের আগের দিন রাশিয়ার সরকারি সংবাদপত্র প্রথম পাতায় দুটি বড় ছবি ছাপায়। একটিতে দেখা যায়, গত সপ্তাহে চীন সফর শেষে একা একা এয়ার ফোর্স ওয়ানের সিঁড়ি বেয়ে উঠছেন ট্রাম্প। অন্য ছবিতে পাশাপাশি হাঁটছেন পুতিন ও শি।
বার্তাটি ছিল স্পষ্ট- বিশ্বমঞ্চে রাশিয়া ও চীন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
কিন্তু এটি প্রেমের গান, রোমান্স বা ব্রোম্যান্সের জগৎ নয়।
এটি ভূরাজনীতির দুনিয়া।
আর ভূরাজনীতির সম্পর্কে ভালোবাসা বা আবেগ খুব কমই মূল বিষয় হয়। এখানে স্বার্থই আসল। শি-পুতিন বৈঠকে সেটিই আবার স্পষ্ট হয়ে উঠেছে- এই ‘ভালোবাসার’ও সীমা আছে।
রাশিয়া নতুন গ্যাস পাইপলাইন ‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া-২’ প্রকল্প দ্রুত এগিয়ে নিতে চায় এবং বেইজিং সফরে এ নিয়ে অগ্রগতির আশা করেছিল। এই পাইপলাইন পশ্চিম সাইবেরিয়া থেকে মঙ্গোলিয়া হয়ে উত্তর চীনে অতিরিক্ত রুশ গ্যাস সরবরাহ করবে। ইউরোপীয় বাজার হারানোর পর মস্কোর জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গত বছর রাশিয়া ও চীন এ প্রকল্প নিয়ে একটি সমঝোতা স্মারকে সই করে। কিন্তু বেইজিং এখনো চূড়ান্ত চুক্তিতে তাড়াহুড়ো করছে না। দামের বিষয় ছাড়াও বিশ্লেষকদের ধারণা, রাশিয়ার জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়তে চায় না চীন।
বুধবার ক্রেমলিন জানিয়েছে, প্রকল্পটির মূল কাঠামো নিয়ে দুই দেশ একটি সাধারণ সমঝোতায় পৌঁছেছে। তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত চুক্তির ইঙ্গিত নেই। এতে রুশ কর্মকর্তারা হতাশ হবেন। তবে বিস্মিত হবেন না। রাশিয়ার সরকারি সংবাদপত্র নিজেই লিখেছে- রাশিয়া ও চীনের অবস্থান এক নয়। তাদের স্বার্থও সবসময় মিলে যায় না।
এই মন্তব্যটি সেই একই সংস্করণে ছাপা হয়েছে, যেখানে পুতিন ও শির পাশাপাশি হাঁটার ছবিও প্রকাশিত হয়েছে। পত্রিকাটি আরও লিখেছে, এত বড় দুটি দেশ, যাদের উভয়ের মধ্যেই মহাশক্তির মানসিকতা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এর চেয়ে ভিন্ন কিছু হওয়ার কথা নয়।
খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, ‘ব্রোম্যান্স’ শব্দটি আরেক জুটির ক্ষেত্রেও ব্যবহার হচ্ছিল- পুতিন ও ট্রাম্প। রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র যখন সম্পর্ক উষ্ণ করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছিল, তখন এই শব্দটি বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। গত গ্রীষ্মে আলাস্কায় দুই প্রেসিডেন্টের বৈঠকের পর রুশ কর্মকর্তারা ‘স্পিরিট অব অ্যাঙ্করেজ’-এর কথা বলতে শুরু করেন। তারা ইঙ্গিত দেন, ইউক্রেন যুদ্ধ কীভাবে শেষ হবে তা নিয়ে মস্কো ও ওয়াশিংটনের মধ্যে এক ধরনের বোঝাপড়া হয়েছে, অবশ্যই রাশিয়ার গ্রহণযোগ্য শর্তে।
কিন্তু যুদ্ধ শেষ হয়নি।
আর আজ ‘স্পিরিট অব অ্যাঙ্করেজ’ প্রায় হারিয়েই গেছে।
পুতিনের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা ইউরি উশাকভ বেইজিং সম্মেলনের ফাঁকে সাংবাদিকদের বলেন, ‘স্পিরিট অব বেইজিং আছে।’
তারপর যোগ করেন, কিন্তু স্পিরিট অব অ্যাঙ্করেজ? আমি তো কখনো ওই শব্দ ব্যবহারই করিনি।
(স্টিভ রোজেনবার্গ বিবিসির রাশিয়া বিষয়ক সম্পাদক। তার এ লেখাটি বিবিসি থেকে অনুবাদ)
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats