বিশ্ববাজারে স্বর্ণ শুধু অলংকার বা বিনিয়োগের মাধ্যম নয়, মূল্যবান এই ধাতু এখন অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক শক্তির গুরুত্বপূর্ণ সূচক। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর রিজার্ভ বাড়ানো ও নিরাপদ সম্পদ হিসেবে চাহিদা বৃদ্ধির কারণে এই ধাতুর গুরুত্ব দিনকে দিন বাড়ছে।
বিশ্বের স্বর্ণ উৎপাদন এখনো মূলত কয়েকটি শক্তিধর দেশের হাতে কেন্দ্রীভূত। ২০২৪ সালে সবচেয়ে বেশি স্বর্ণ উৎপাদনকারী দেশের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে চীন। এরপরেই রয়েছে রাশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে আফ্রিকার দেশগুলোও বৈশ্বিক স্বর্ণবাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে। ঘানা, মালি ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশগুলো এখন বিশ্বের মোট স্বর্ণ উৎপাদনে বড় অবদান রাখছে।
চীন শুধু বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্বর্ণ উৎপাদকই নয়, একই সঙ্গে অন্যতম বড় ভোক্তা দেশও। ফলে খনি, পরিশোধন, গয়নার চাহিদা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ—সব মিলিয়ে বৈশ্বিক স্বর্ণবাজারে দেশটির প্রভাব ব্যাপক ও গভীর। দেখে নেওয়া যাক, বিশ্বের শীর্ষ ১০ স্বর্ণ উৎপাদনকারী দেশ কোনগুলো:
বিশ্ববাজারে স্বর্ণের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর রিজার্ভ বাড়ানো এবং নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের চাহিদা বৃদ্ধির কারণে উৎপাদনকারী দেশগুলোর ভূমিকাও আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ২০২৫ সালে বিশ্ববাজারে সোনার দাম বেড়েছে ৭০ শতাংশের বেশি।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্যভিত্তিক ভিজ্যুয়াল ক্যাপিটালিস্টের এক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে বিশ্বের শীর্ষ ১০ স্বর্ণ উৎপাদনকারী দেশের তালিকা। তালিকায় শীর্ষে আছে চীন। এরপর রয়েছে রাশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে আফ্রিকার কয়েকটি দেশও দ্রুত বৈশ্বিক স্বর্ণবাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে। ২০২৪ সালের উৎপাদনের ভিত্তিতে এ তালিকা করা হয়েছে।
উজবেকিস্তান, উৎপাদন ১২৯.১ টন
মধ্য এশিয়ার দেশ উজবেকিস্তান বিশ্বের ১০ নম্বর স্বর্ণ উৎপাদক। দেশটির মুরুনতাউ খনি বিশ্বের বৃহত্তম স্বর্ণখনিগুলোর একটি। মধ্য এশিয়ার এ দেশ স্বর্ণ রপ্তানি থেকে বিপুল পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খনি খাতে আধুনিকায়ন ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে তাশখন্দ। ফলে আন্তর্জাতিক স্বর্ণবাজারে উজবেকিস্তানের গুরুত্বও বাড়ছে।
পেরু, ১৩৬.৯ টন
লাতিন আমেরিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খনিজ অর্থনীতি হলো পেরু। দেশটির আন্দিজ পর্বতমালা অঞ্চলে বড় বড় স্বর্ণখনি আছে। স্বর্ণ রপ্তানি দেশটির অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ চালিকা শক্তি। রাজনৈতিক অস্থিরতা, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আন্দোলন ও পরিবেশগত বিরোধের কারণে খনিশিল্প প্রায়ই চাপের মুখে পড়ে। তারপরও বৈশ্বিক স্বর্ণ সরবরাহে পেরুর অবস্থান শক্তিশালী।
ইন্দোনেশিয়া, ১৪০.১ টন
স্বর্ণ উৎপাদনের শীর্ষ তালিকায় চীনের পর এশিয়ার দ্বিতীয় দেশ হিসেবে আছে ইন্দোনেশিয়া। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ স্বর্ণখনি গ্রাসবার্গ খনি দেশটির উৎপাদনের বড় উৎস। খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ এ দেশ তামা ও স্বর্ণ—উভয় ক্ষেত্রেই বড় উৎপাদক। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় খনিশিল্পের কেন্দ্র হিসেবে ইন্দোনেশিয়ার গুরুত্ব বাড়ছে। তবে পরিবেশের ক্ষতি, বন উজাড় ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে বিতর্ক দেশটির খনি খাতকে ঘিরে রেখেছে।
মেক্সিকো, ১৪০.৩ টন
স্বর্ণ উৎপাদনে মেক্সিকোর অবস্থান বিশ্বে সপ্তম। দেশটির খনিশিল্প দীর্ঘদিনের পুরোনো এবং রুপা ও স্বর্ণ—উভয় ক্ষেত্রেই মেক্সিকো গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের খনি অঞ্চলগুলো উৎপাদনের কেন্দ্র। বৈদেশিক বিনিয়োগ ও খনিজ সম্পদের প্রাচুর্যের কারণে দেশটির খনিশিল্প শক্তিশালী হয়েছে। তবে নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও অপরাধ চক্রের প্রভাবে কিছু অঞ্চলে বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
ঘানা, ১৪০.৬ টন
আফ্রিকার শীর্ষ স্বর্ণ উৎপাদক ঘানা বৈশ্বিকভাবে ষষ্ঠ স্থানে আছে। স্বর্ণ রপ্তানি দেশটির বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। আন্তর্জাতিক খনি কোম্পানিগুলোর বড় বিনিয়োগের কারণে গত এক দশকে ঘানার উৎপাদন দ্রুত বেড়েছে। আফ্রিকার স্বর্ণবাজারে ঘানার অবস্থান তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে অবৈধ খনি কার্যক্রম ও পরিবেশগত ক্ষতি দেশটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
যুক্তরাষ্ট্র, ১৫৮ টন
স্বর্ণ উৎপাদনে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পঞ্চম। নেভাডা, আলাস্কা ও কলোরাডো দেশটির প্রধান স্বর্ণখনি অঞ্চল। দেশটির উৎপাদন আগের তুলনায় কমেছে, তবু বিশ্ববাজারে তারা এখনো বড় শক্তি। পরিবেশগত বিধিনিষেধ, খনির উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও কিছু বড় খনি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উৎপাদনে চাপ তৈরি হয়েছে। তারপরও যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক স্বর্ণবাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
কানাডা, ২০২.১ টন
কানাডা বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম স্বর্ণ উৎপাদক। অন্টারিও, কুইবেক ও ব্রিটিশ কলাম্বিয়া অঞ্চলে দেশটির বড় বড় খনি আছে। গত এক দশকে কানাডার স্বর্ণ উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। উন্নত প্রযুক্তি, পরিবেশগত মান বজায় রেখে খনিশিল্প পরিচালনা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ—এসব কারণে দেশটির উৎপাদন বেড়েছে। উত্তর আমেরিকার সবচেয়ে বড় স্বর্ণ উৎপাদক দেশগুলোর একটি এখন কানাডা।
অস্ট্রেলিয়া, ২৮৪ টন
বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম স্বর্ণ উৎপাদক অস্ট্রেলিয়া। পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার কালগুর্লি অঞ্চলসহ কয়েকটি বড় খনিকেন্দ্র দেশটির উৎপাদনের মূল ভিত্তি। বস্তুত বলা যায়, অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতিতে খনিজাত পণ্যের অবদানই বেশি। বিপুল খনিজ সম্পদ, উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর খনি ব্যবস্থাপনা ও স্থিতিশীল নীতিকাঠামোর কারণে অস্ট্রেলিয়া বৈশ্বিক খনিশিল্পে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রেখেছে। চীন ও অন্যান্য এশীয় দেশের বাজারে স্বর্ণ রপ্তানিও দেশটির অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।
রাশিয়া, উৎপাদন: ৩৩০ টন
স্বর্ণ উৎপাদনে রাশিয়ার অবস্থান দ্বিতীয়। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেও দেশটি উৎপাদন সক্ষমতা ধরে রেখেছে। সাইবেরিয়া ও দূরপ্রাচ্যের বিস্তৃত খনি অঞ্চল রাশিয়ার প্রধান উৎপাদনকেন্দ্র। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্বর্ণকে কৌশলগত রিজার্ভ হিসেবে গুরুত্ব দিয়েছে মস্কো। আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার চাপ মোকাবিলায় স্বর্ণ রাশিয়ার অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অংশ হয়ে উঠেছে।
চীন, উৎপাদন: ৩৮০.২ টন
২০২৪ সালে ৩৮০ দশমিক ২ টন স্বর্ণ উৎপাদন করে বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্বর্ণ উৎপাদক দেশ হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে চীন। এক দশকের বেশি সময় ধরে দেশটি শীর্ষ অবস্থানে আছে। বিস্তৃত খনিশিল্প, রাষ্ট্রীয় সহায়তা ও পরিশোধন সক্ষমতার কারণে বৈশ্বিক বাজারে চীন অত্যন্ত শক্তিশালী। দেশটি শুধু বড় উৎপাদকই নয়, একই সঙ্গে বিশ্বের অন্যতম বড় স্বর্ণ ভোক্তাও। গয়নাশিল্প, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ ও বিনিয়োগ চাহিদা—সব মিলিয়ে বৈশ্বিক স্বর্ণবাজারে চীনের ভূমিকা অতিগুরুত্বপূর্ণ।
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats