বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক নৌপথ মালাক্কা প্রণালি আবারও আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যের হরমুজ প্রণালি ঘিরে চলমান উত্তেজনা ও জাহাজ চলাচলে বিঘ্নের প্রেক্ষাপটে এবার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই প্রণালি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি ইন্দোনেশিয়ার অর্থমন্ত্রী পুরবায়া ইউধি সাদেওয়া মালাক্কা প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজের কাছ থেকে ফি বা টোল আদায়ের ধারণা তুলে ধরেন। যদিও পরে তিনি বক্তব্য থেকে সরে আসেন, তবুও বিষয়টি আন্তর্জাতিক শিপিং শিল্প, আঞ্চলিক কূটনীতি এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য নিরাপত্তা নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
মালাক্কা প্রণালি কোথায়?
মালাক্কা প্রণালি হলো ভারত মহাসাগর ও দক্ষিণ চীন সাগরের মধ্যকার একটি সংকীর্ণ কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ। এটি উত্তর-পূর্বে মালয় উপদ্বীপ এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপের মাঝখানে অবস্থিত। এর দক্ষিণ প্রান্তে রয়েছে সিঙ্গাপুর।
দ্য স্ট্রেইট টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ৮০০ থেকে ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রণালির সবচেয়ে সরু অংশের প্রস্থ মাত্র প্রায় ২ দশমিক ৭ কিলোমিটার। এই সংকীর্ণতাই একে একইসঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ ‘চোকপয়েন্টে’পরিণত করেছে।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য মালাক্কা প্রণালির গুরুত্ব বিশাল। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিচালিত বাণিজ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত এই পথ দিয়ে হয়। একইসঙ্গে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এই রুট ব্যবহার করে পূর্ব এশিয়ায় পৌঁছে।
বিশেষ করে চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনীতিগুলো মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি আমদানির জন্য এই রুটের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস বলছে, মালাক্কা প্রণালি ব্যবহার না করলে জাহাজগুলোকে পুরো ইন্দোনেশীয় দ্বীপপুঞ্জ ঘুরে যেতে হবে, যা হাজার হাজার নটিক্যাল মাইল অতিরিক্ত পথ এবং অনেক বেশি সময় ও ব্যয় সৃষ্টি করবে। কিছু ক্ষেত্রে অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ দিক ঘুরে যেতে হতে পারে, যা অধিকাংশ বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য বাস্তবসম্মত নয়।
হরমুজ সংকটের প্রভাব
মালাক্কা প্রণালি নিয়ে নতুন উদ্বেগের পেছনে বড় কারণ হলো হরমুজ প্রণালিতে সাম্প্রতিক উত্তেজনা। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতের জেরে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলেশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে এবং বেশ কিছু জাহাজে হামলার ঘটনাও ঘটেছে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, বীমা ব্যয় ও শিপিং খরচ বেড়ে গেছে বলে জানিয়েছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম।
এবিসি নিউজ জানিয়েছে, এই পরিস্থিতির মধ্যেই ইন্দোনেশিয়ার অর্থমন্ত্রী পুরবায়া ইউধি সাদেওয়া এক সেমিনারে বলেন, মালাক্কা প্রণালির ভৌগোলিক অবস্থান থেকেও আর্থিক সুবিধা নেওয়া সম্ভব হতে পারে। তিনি ইঙ্গিত দেন, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর যৌথভাবে জাহাজের ওপর টোল আরোপ করতে পারে।
যদিও পরে মন্তব্যটিকে ‘কাল্পনিক’ বলে ব্যাখ্যা করেন তিনি এবং দ্রুত পিছু হটেন।
মালয়েশিয়ার পশ্চিম উপকূলসংলগ্ন মালাক্কা প্রণালিতে জলদস্যুদের তৎপরতার আশঙ্কায় ছোট মাছ ধরার ট্রলার পর্যবেক্ষণ করছেন একটি জাহাজের ক্রু সদস্য। ছবি: রয়টার্স
কেন এত প্রতিক্রিয়া?
ইন্দোনেশিয়ার এই ধারণা সামনে আসার পরপরই ব্যাপক প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। কারণ, মালাক্কা প্রণালি আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল এলাকা এবং এখানে অবাধ যাতায়াতকে বৈশ্বিক বাণিজ্যের মৌলিক শর্ত হিসেবে দেখা হয়।
আরব নিউজ জানিয়েছে, এ ঘটনায় সিঙ্গাপুর সবচেয়ে জোরালো প্রতিক্রিয়া জানায়। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান বালাকৃষ্ণান স্পষ্টভাবে বলেন, তাদের অঞ্চলজুড়ে ‘কোনো ধরনের বন্ধ, বাধা বা টোল আরোপের প্রচেষ্টায়’ সিঙ্গাপুর অংশ নেবে না।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক আইনে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে।
মালয়েশিয়াও জানায়, মালাক্কা প্রণালি নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত একতরফাভাবে নেওয়া যাবে না। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট উপকূলীয় দেশগুলোর সমন্বিত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।
অস্ট্রেলিয়াসহ অন্যান্য দেশও ‘ফ্রিডম অব নেভিগেশন’ বা অবাধ নৌ চলাচলের গুরুত্বের ওপর জোর দেয়।
আন্তর্জাতিক আইন কী বলে?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন অনুযায়ী মালাক্কা প্রণালিতে একতরফাভাবে টোল আরোপ করা আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
জাতিসংঘের সমুদ্র আইন সনদ (ইউএনসিএলওএস) অনুযায়ী আন্তর্জাতিক নৌপথে ‘ট্রানজিট প্যাসেজ’ বা অবাধ চলাচলের অধিকার রয়েছে। সেই কারণে জাহাজের কাছ থেকে কেবল চলাচলের জন্য অর্থ আদায় আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে বলে মত বিশ্লেষকদের।
ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুজিওনো পরে বলেন, মালাক্কা প্রণালিতে টোল আরোপ আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না এবং ইন্দোনেশিয়া নৌ চলাচলের স্বাধীনতার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালির সংকট বিশ্বকে বুঝিয়ে দিয়েছে যে সামুদ্রিক ‘চোকপয়েন্ট’গুলো কতটা কৌশলগত শক্তির উৎস হতে পারে। ফলে মালাক্কা প্রণালির ভূরাজনৈতিক গুরুত্বও নতুন করে সামনে এসেছে।
বিশেষ করে চীনের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশটির বিপুল জ্বালানি আমদানি এই রুটের ওপর নির্ভরশীল। দীর্ঘদিন ধরেই বেইজিং ‘মালাক্কা ডিলেমা’ নিয়ে উদ্বিগ্ন। অর্থাৎ কোনো সংঘাত বা অবরোধে এই পথ বন্ধ হয়ে গেলে চীনের অর্থনীতি বড় সংকটে পড়তে পারে।
এদিকে থাইল্যান্ড আবার মালাক্কা প্রণালির বিকল্প হিসেবে নিজেদের ‘ল্যান্ড ব্রিজ’ প্রকল্প সামনে আনার চেষ্টা করছে, যাতে ভারত মহাসাগর ও থাইল্যান্ড উপসাগরের মধ্যে স্থলভিত্তিক সংযোগ গড়ে তোলা যায় বলে জানিয়েছে কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস।
ভবিষ্যৎ কী?
ইন্দোনেশিয়া যদিও টোল আরোপের ধারণা থেকে আপাতত সরে এসেছে, তবুও এই বিতর্ক দেখিয়ে দিয়েছে যে অল্প কয়েকটি সামুদ্রিক পথের ওপর বিশ্ব অর্থনীতি কতটা নির্ভরশীল।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ ও মালাক্কা—উভয় প্রণালির সাম্প্রতিক পরিস্থিতি ভবিষ্যতে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন নিয়ে আরও বড় ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats