বেইজিংয়ে বৈঠকের পর রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ছবি: এএফপি
বিশ্ব আবারও ‘জঙ্গলের আইনের’ দিকে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে সতর্ক করেছে রাশিয়া ও চীন। আজ বুধবার দুই দেশের নেতাদের বৈঠকের পর প্রকাশিত এক যৌথ ঘোষণায় এ সতর্কবার্তা দেওয়া হয় বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠকের পর প্রকাশিত ঘোষণায় বলা হয়, ঔপনিবেশিক যুগের মানসিকতা নিয়ে কিছু দেশের বিশ্ব নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিভক্ত হয়ে পড়া এবং ‘জঙ্গলের আইন’ ফিরে আসার ঝুঁকি বাড়ছে।
ক্রেমলিন প্রকাশিত রুশ ভাষার ওই ঘোষণায় বলা হয়, ‘বিশ্ব পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। বৈশ্বিক শান্তি ও উন্নয়নের এজেন্ডা নতুন ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিভাজন এবং “জঙ্গলের আইন”-এ ফিরে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।’
ঘোষণায় আরও বলা হয়, ‘কিছু রাষ্ট্র একতরফাভাবে বিশ্বব্যবস্থা পরিচালনা, নিজেদের স্বার্থ পুরো বিশ্বের ওপর চাপিয়ে দেওয়া এবং অন্য দেশগুলোর সার্বভৌম উন্নয়ন সীমিত করার যে চেষ্টা করেছে, তা ঔপনিবেশিক যুগের মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ—আর সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।’
যৌথ ঘোষণায় কোনো দেশের নাম উল্লেখ করা হয়নি। তবে অতীতে চীন ও রাশিয়া উভয়ই অভিযোগ করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের ওপর আধিপত্য বজায় রাখতে নেতৃত্বাধীন একটি বৈশ্বিক ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
‘অটুট’ সম্পর্কের প্রশংসায় পুতিন-শি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেইজিং সফরের কয়েক দিনের মাথায় এই বৈঠক করলেন পুতিন ও শি। বৈঠকে দুই নেতা নিজেদের সম্পর্ককে ‘অটুট’ ও ‘অভূতপূর্ব’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
এএফপি জানিয়েছে, ইউক্রেনে ২০২২ সালে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর থেকে মস্কো ও বেইজিংয়ের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। বিশেষ করে রাশিয়ার জ্বালানি রপ্তানির বড় ক্রেতা হিসেবে চীন এখন দেশটির প্রধান ভরসা।
আজ বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে পুতিনকে আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা জানান শি জিনপিং। গত সপ্তাহে ট্রাম্পকে যেভাবে স্বাগত জানানো হয়েছিল, পুতিনকেও প্রায় একই ধরনের সামরিক কুচকাওয়াজ ও শিশুদের স্লোগানের মধ্য দিয়ে বরণ করা হয়।
তবে বৈঠকের ভাষা ছিল অনেক বেশি উষ্ণ। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাতে জানা যায়, শি পুতিনকে বলেন, ‘চীন ও রাশিয়া রাজনৈতিক পারস্পরিক আস্থা এবং কৌশলগত সমন্বয়কে ধারাবাহিকভাবে আরও গভীর করেছে, যার দৃঢ়তা অটুট রয়েছে।’
দুই নেতা বৈঠকের শুরুতেই দুই দেশের ‘বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা’ চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর ঘোষণা দেন।
একদিন দেখা না হলে মনে হয় তিনটি শরৎ কেটে গেছে: শি-কে পুতিন
রুশ সংবাদমাধ্যমের ভিডিও ফুটেজ অনুযায়ী, চীনা একটি প্রবাদ উদ্ধৃত করে পুতিন শি-কে বলেন, ‘একদিন দেখা না হলে মনে হয় তিনটি শরৎ কেটে গেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বৈরী বহিরাগত পরিস্থিতি সত্ত্বেও’ দুই দেশের সম্পর্ক এখন ‘অভূতপূর্ব উচ্চতায়’ পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্রকে ইঙ্গিত করে শি জিনপিং বিশ্বে ‘একতরফা ও আধিপত্যবাদী প্রবণতা’ বাড়ছে বলেও সতর্ক করেন।
গত সপ্তাহে ট্রাম্পের সফরে বড় কোনো তাৎক্ষণিক চুক্তি হয়নি। তবে আজ পুতিন ও শি বাণিজ্য, জ্বালানি ও গণমাধ্যম খাতে একাধিক চুক্তিতে সই করেছেন।
রুশ প্রেসিডেন্টের পররাষ্ট্রনীতি–বিষয়ক সহকারী ইউরি উশাকভ জানান, পরে দুই নেতা চা–আড্ডায় ইরান, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন।
জ্বালানি ও ‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া ২’
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, পুতিনের এই সফরের অন্যতম লক্ষ্য ছিল ‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া ২’ গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্পে অগ্রগতি আনা। এই পাইপলাইন মঙ্গোলিয়া হয়ে রাশিয়া থেকে চীনে গ্যাস সরবরাহ করবে।
তবে ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ আজ বলেন, প্রকল্পের রুট ও নির্মাণপদ্ধতি নিয়ে ‘মৌলিক সমঝোতা’ হলেও এখনো কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি ঠিক হয়নি এবং কিছু বিষয় চূড়ান্ত করা বাকি।
ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল ও গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে রাশিয়া নিজেদের জ্বালানিকে বিকল্প উৎস হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে।
পুতিন বলেন, ‘রাশিয়া ও চীন জ্বালানি খাতে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করছে। দ্রুত বর্ধনশীল চীনা বাজারে আমরা নির্ভরযোগ্যভাবে সব ধরনের জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত রাখতে প্রস্তুত।’তবে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি নিয়ে দুই দেশের অগ্রাধিকার এক নয় বলেও ধারণা করা হচ্ছে। চীন দ্রুত সংঘাতের অবসান চায়।
শি জিনপিং বলেন, ‘সর্বাত্মক যুদ্ধবিরতি এখন সবচেয়ে জরুরি। পুনরায় সংঘাত শুরু করা আরও অনুচিত, আর আলোচনা অব্যাহত রাখাও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।’
‘স্বাধীন ও সার্বভৌম পররাষ্ট্রনীতি’
বিশ্ব রাজনীতিতে ট্রাম্প প্রশাসনের অনিশ্চয়তার মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে শি জিনপিং একের পর এক বিশ্বনেতাকে বেইজিংয়ে স্বাগত জানাচ্ছেন। অনেক দেশই চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদারে আগ্রহী হয়ে উঠেছে।
অনেক নেতা শি-কে ইউক্রেন ও ইরান ইস্যুতে রাশিয়ার ওপর প্রভাব খাটিয়ে সংঘাত নিরসনে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।
ভলোদিমির জেলেনস্কি ট্রাম্পকে অনুরোধ করেছিলেন, তার চীন সফরে যেন শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান নিয়ে আলোচনা করেন। যদিও সে আলোচনায় বড় কোনো অগ্রগতি হয়নি।
চীন নিয়মিত ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে আলোচনার আহ্বান জানালেও রাশিয়ার আগ্রাসনের নিন্দা করেনি। বরং তারা নিজেদের ‘নিরপেক্ষ পক্ষ’ হিসেবে তুলে ধরে আসছে।
আজ পুতিন বলেন, ‘রাশিয়া ও চীন স্বাধীন ও সার্বভৌম পররাষ্ট্রনীতিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা ঘনিষ্ঠ কৌশলগত সহযোগিতার মাধ্যমে বৈশ্বিক অঙ্গনে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছি।’
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats