গত সপ্তাহে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের নির্বাচনের ফলাফলে ১৫ বছর ধরে রাজ্য বিধানসভার ক্ষমতায় থাকা অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেসের (এআইটিসি) নাটকীয় পরাজয় দেখা গেছে। অবশ্য তৃণমূল কংগ্রেস নামেই দলটির বেশি পরিচিতি। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এবং আরও বেশ কয়েকটি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ক্ষমতায় থাকা হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এবার পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি ভেঙে দিতে সক্ষম হয়েছে।
নির্বাচনে প্রায় ৪৬ শতাংশ ভোট পেয়ে বিজেপি বিধানসভায় ২০৭টি আসন জিতেছে। আর তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছে ৪১ শতাংশ ভোট ও ৮০টি আসন। এর মধ্য দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘদিনের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেও ক্ষমতা থেকে বিদায় নিতে হয়েছে।
এখন প্রশ্ন হলো, নিজস্ব আঞ্চলিক রাজনৈতিক পরিচয় ও স্বাতন্ত্র্যবোধের জন্য পরিচিত এই রাজ্যটিতে হিন্দুত্ববাদী বিজেপির চমকপ্রদ বিজয়ের পেছনে কী কারণ কাজ করেছে?
বিশ্লেষকেরা বলছেন, বিজেপির এই সাফল্যের পেছনে একাধিক ‘কারণ’ কাজ করেছে। নিঃসন্দেহে তৃণমূল কংগ্রেস সরকারবিরোধী জনমতের মুখে পড়েছিল। ক্ষমতায় থাকার সময় তৃণমূল কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গে উল্লেখযোগ্য বড় অর্থনৈতিক বিনিয়োগ আনতে ব্যর্থ হওয়ায় এ জনরোষ তৈরি হয়েছিল।
রাজ্যের উৎপাদন খাতে ভালো বেতনের চাকরির সুযোগও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্থবির হয়ে পড়েছিল। পর্যাপ্ত কাজের সুযোগ না থাকায় বহু তরুণ-তরুণী উন্নত ভবিষ্যতের খোঁজে পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে ভারতের অন্য রাজ্যে চলে গেছেন। এসব কারণ মিলিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন সরকারকে নিয়ে জনগণের মধ্যে একধরনের হতাশা তৈরি হয়েছে। আর সে হতাশাই নির্বাচনের ফলাফলের ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অভিবাসনের বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের মধ্যে যে উদ্বেগ আছে, সেটাকে কাজে লাগিয়েছে বিজেপি। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতাকেও কাজে লাগিয়েছে দলটি।
২০২৪ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর একাধিক হামলার ঘটনা ঘটেছে অভিযোগ তুলে বিজেপি নানা অপপ্রচার চালিয়েছিল। এর মধ্য দিয়ে হিন্দু ভোটগুলোকে একত্র করতে সক্ষম হয়েছে তারা। বিজেপি ধারাবাহিকভাবে এ ধরনের আতঙ্কমূলক প্রচার চালিয়ে গেছে, যা পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘদিনের ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক ঐতিহ্যকে পাশ কাটিয়ে যেতে বিজেপিকে সাহায্য করেছে।
বিতর্ক উপেক্ষা করে বিজেপির নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা সংশোধন করে। এর নাম দেওয়া হয়, ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ বা ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন। এটি অক্টোবর মাসে সারা দেশে চালু করা হয়। বলা হয়, ভুয়া ভোটারদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার জন্য এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
হিন্দুত্ববাদী দলটি আরও একটি ইস্যুতে জোর দিয়েছে। তা হলো মুসলিম ভোটারের ওপর তৃণমূল কংগ্রেসের নির্ভরতা। দলটি মুসলিম সম্প্রদায়ের কিছু কট্টর অংশকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ তুলেছিল বিজেপি। এমন গল্প সাজিয়ে বিজেপি অনেক ভোটারকে আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়েছে। সেখানে তারা তৃণমূলকে হিন্দুবিরোধী দল হিসেবে উপস্থাপন করেছে।
বিতর্ক উপেক্ষা করে বিজেপির নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা সংশোধন করে। এর নাম দেওয়া হয়, ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ বা ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন (এসআইআর)। এটি অক্টোবর মাসে সারা দেশে চালু করা হয়। বলা হয় ভুয়া ভোটারদের তালিকা থেকে বাদ দিতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
তবে বাস্তবে দেখা গেছে, এই প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখাতে না পারার কারণে পশ্চিমবঙ্গে ৯০ লাখের বেশি মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। এদের বেশির ভাগই এমন আসনের ভোটার, যেখানে বিজেপি আগে কখনো জেতেনি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে মুসলিম ও সংখ্যালঘু ভোটাররা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। প্রায় ২৭ লাখ মানুষ নিজেদের নাম বাদ দেওয়ার বিরুদ্ধে আপত্তি জানান।
কিছু নাম যদিও সঠিকভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে, তবে নির্বাচনের ঠিক আগে এত বিপুলসংখ্যক মানুষের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ায় নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে।
পশ্চিমবঙ্গের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৭ শতাংশ মুসলিম এবং তাদের বেশির ভাগই দরিদ্র। ফলে তারা ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে সহজ নিশানা হয়ে উঠেছিল। ভারতের অনেক দরিদ্র মানুষের জন্মসনদ নেই। আবার পাসপোর্টের মতো অন্য পরিচয়পত্রও নেই।
বিরোধী নেতারা এবং অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক অভিযোগ করেছেন, ভারতে যে নির্বাচন কমিশনকে দীর্ঘদিন নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখা হতো, সে কমিশন ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার মধ্য দিয়ে নেতিবাচক ভূমিকা পালন করেছে। তাঁদের মতে, নির্বাচন কমিশন ছোটখাটো কারণ দেখিয়ে বড় সংখ্যায় ভোটার বাদ দিতে এসআইআর প্রক্রিয়াকে ব্যবহার করেছে।
অবশ্য নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা যাচাই করার আইনগত ক্ষমতা রয়েছে এবং এটাও সম্ভব যে এই প্রক্রিয়া ছাড়াও হয়তো বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে জিততে পারত।
নির্বাচনের পর তৃণমূল কংগ্রেস এই ইস্যুতে বিজেপির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আনুষ্ঠানিকভাবে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে পদত্যাগ করতে অস্বীকৃতি জানান। এর মধ্যেই বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী ৯ মে পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।
এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় সর্বোচ্চ মানের কূটনীতি আরও বেশি জরুরি হয়ে উঠেছে।
পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসকে ক্ষমতা থেকে সরাতে বিজেপি যে কৌশল নিয়েছে এবং অন্য রাজ্যগুলোতেও যেভাবে শক্ত অবস্থান দেখিয়েছে, তা ভারতের সাংবিধানিক গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
মমতার দীর্ঘদিনের নেতৃত্বে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নানা সীমাবদ্ধতা ছিল, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভোটারদের কাছে বড় ইস্যু হয়ে উঠেছিল। কমিউনিস্ট শাসনের পতনের পর ক্ষমতায় আসা মমতা ‘পরিবর্তন’-এর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তবে বাস্তবে তিনি পর্যাপ্ত বিনিয়োগ আনতে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে কিংবা কর্মসংস্থান তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছেন। এসব ব্যর্থতা মানুষের মধ্যে ক্রমাগত অসন্তোষ তৈরি করে এবং শেষ পর্যন্ত তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে জনরোষ বাড়িয়ে তোলে।
চলতি মাসে বিধানসভা নির্বাচনের ফল নির্ধারণে আরও অন্তত দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রথমত, তৃণমূল কংগ্রেসে এমন বিপুলসংখ্যক দলীয় কর্মী ছিলেন, যাঁদের বিরুদ্ধে রাজ্যজুড়ে চাঁদাবাজি চক্র পরিচালনার অভিযোগ ছিল। সাধারণ মানুষের অভিযোগ, তৃণমূলের কর্মীরা নিজেদের প্রভাব ব্যবহার করে মানুষকে ভয় দেখাত এবং সরকারি সাধারণ সেবা পেতেও অর্থ দিতে বাধ্য করত।
বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের দুর্নীতি ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে রাজ্যের ভোটারদের বড় অংশ তৃণমূল থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল। এ ছাড়া তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে আরও নানা দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। এর মধ্যে সরকারি স্কুলে শিক্ষক নিয়োগে ঘুষ কেলেঙ্কারির ঘটনা বিশেষভাবে আলোচিত ছিল।
দ্বিতীয়ত, তৃণমূল কংগ্রেস নারী ভোটারদের মধ্যেও সমর্থন হারাতে শুরু করেছে। অথচ বহু বছর ধরে এই নারী ভোটারদের সমর্থন ধরে রেখেছিল দলটি।
২০২৪ সালে কলকাতার এক হাসপাতালে এক নারী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার পর শহরের নারীরা ক্ষুব্ধ হন। এরপর দুর্গাপুরে আরেকটি ধর্ষণের ঘটনার পর মমতা বলেন, আবাসিক কলেজগুলোতে তরুণ শিক্ষার্থীদের রাতে বাইরে যেতে দেওয়া উচিত নয়। এতে রাজ্যের শহরাঞ্চলে বসবাসকারী নারী ভোটাররা আরও ক্ষুব্ধ হন।
গ্রামীণ নারীরাও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিলেন। এর কারণগুলো জটিল। তবে এ ক্ষেত্রেও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয়টি একটি কারণ ছিল।
শুধু পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনেই বিজেপি সফল হয়নি। দলটি পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য গুজরাটেও সহজেই ক্ষমতা ধরে রেখেছে। এমনকি কেরালাতেও তারা কিছুটা অগ্রগতি অর্জন করেছে। এ রাজ্যে শক্ত অবস্থান গড়তে দীর্ঘদিন ধরেই বিজেপি সংগ্রাম করছিল।
সব মিলিয়ে এই ফলাফল ইঙ্গিত দেয়, হিন্দু ভোট একত্র করা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি কল্যাণমূলক সুবিধার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিজেপি হয়তো সারা দেশে একটি শক্তিশালী মতাদর্শিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে পেরেছে।
অন্যান্য রাজ্যে বিজেপির সাফল্যের মধ্য দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতি মানুষের অসন্তোষের বিষয়টিও সামনে এসেছে। যদিও ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া নিয়ে নানা সন্দেহ ও বিতর্ক ছিল।
তবে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসকে ক্ষমতা থেকে সরাতে বিজেপি যে কৌশল নিয়েছে এবং অন্য রাজ্যগুলোতেও যেভাবে শক্ত অবস্থান দেখিয়েছে, তা ভারতের সাংবিধানিক গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
মুসলিমদের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচার থেকে শুরু করে নির্বাচনের ঠিক আগে ভোটার তালিকা তৈরিতে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা পর্যন্ত—পশ্চিমবঙ্গে যা ঘটেছে, তা ভবিষ্যতে ভারতে রাজ্য ও জাতীয় পর্যায়ে নির্বাচনী ব্যবস্থার জন্য উদ্বেগজনক ইঙ্গিত হতে পারে।
(নিবন্ধটি লিখেছেন, সুমিত গাঙ্গুলি ও শিবাশীষ চ্যাটার্জি। সুমিত স্টানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের হুভার ইনস্টিটিউশনের জ্যেষ্ঠ ফেলো ও ফরেন পলিসির কলাম লেখক। আর শিবাশীষ কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক)
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats