মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে নতুন দফা আলোচনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিনিধিদল পাকিস্তানে যাবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে ট্রাম্প বলেন, তাঁর প্রতিনিধিরা সোমবার সন্ধ্যায় ইসলামাবাদে পৌঁছাবেন।
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র যে পরস্পরবিরোধী সংকেত দিচ্ছে সেগুলো এলোমেলো বিভ্রান্তিকর কোনো সিদ্ধান্তের ফল নয়, বরং প্রতিটি পদক্ষেপই হিসাব করে নেওয়া কৌশল। এই অবস্থায় বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি স্থায়ী চুক্তি হওয়ার পরিবর্তে ফের যুদ্ধ শুরু হওয়ার শঙ্কাই বেশি।
এর কিছুক্ষণ পর হোয়াইট হাউস জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এই প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বিবিসিকে নিশ্চিত করেছেন যে, এই প্রতিনিধিদলে ট্রাম্পের উপদেষ্টা স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারও থাকবেন। তাঁরা আগের দফার আলোচনাতেও উপস্থিত ছিলেন।
তেহরান এখনো আলোচনায় অংশগ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করেনি। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ বহাল থাকা অবস্থায় ইরানি কর্মকর্তারা আলোচনায় অংশ নেবেন না।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, ‘এ মুহূর্তে…পরবর্তী দফা আলোচনার কোনো পরিকল্পনা আমাদের নেই এবং এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়নি।’ এর আগে অনুষ্ঠিত প্রথম দফা আলোচনা প্রায় ২১ ঘণ্টা ধরে চলে। তবে কোনো শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানো যায়নি। পারমাণবিক কর্মসূচিসহ গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে ওয়াশিংটন ও তেহরানের অবস্থান তখনো অনেক দূরে ছিল। যুক্তরাষ্ট্র নিজের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র। তিনি বলেন, আর এই শিক্ষা না নেওয়ায় কখনোই ভালো ফল আসবে না।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যদি নতুন করে আগ্রাসন শুরু করতে চায়, তবে আমাদের সশস্ত্র বাহিনী সে অনুযায়ী জবাব দেবে।’
ওমান উপসাগরে মার্কিন সামরিক জাহাজে ইরানের ‘ড্রোন হামলা’
ওমান উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক জাহাজ নিশানা করে ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিমের খবরে এই দাবি করা হয়। এর আগে একই এলাকায় ইরানি পতাকাবাহী একটি কনটেইনার জাহাজ জব্দ করে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী।
মার্কিন সামরিক জাহাজ নিশানা করে ইরানের চালানো ‘ড্রোন হামলায়’ কোনো ধরনের ক্ষয়ক্ষতির তথ্য এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। ইরানি জাহাজ জব্দের পর দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, এই কাজের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর এই সশস্ত্র জলদস্যুতার জবাব ইরান দেবে।
চুক্তি নয়, যুদ্ধ ফের শুরুর আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার স্বল্পস্থায়ী যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামীকাল মঙ্গলবার। তবে আজ সোমবার পর্যন্ত কোনো চুক্তি পৌঁছাতে পারেনি বিবদমান পক্ষগুলো। এই অবস্থায় বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র যে পরস্পরবিরোধী সংকেত দিচ্ছে সেগুলো এলোমেলো বিভ্রান্তিকর কোনো সিদ্ধান্তের ফল নয়, বরং প্রতিটি পদক্ষেপই হিসাব করে নেওয়া কৌশল। এই অবস্থায় বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি স্থায়ী চুক্তি হওয়ার পরিবর্তে ফের যুদ্ধ শুরু হওয়ার শঙ্কাই বেশি।
তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা বিষয়ক গবেষক মোহাম্মদ এসলামি মনে করেন, ‘ইরানের হরমুজ প্রণালি নিয়ে পরস্পরবিরোধী সংকেতগুলো বিভ্রান্তির ফল নয়, বরং হিসাব করে নেওয়া কৌশল।’ কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘ইরান প্রণালিটি বন্ধ করেছে সেটি আবার খোলার জন্যই। এটি মূলত একটি দর-কষাকষির কৌশল।’
ইরানি কার্গো জাহাজ জব্দের ঘটনায় তেহরান ভুল হিসাব করেছে—এমন ধারণা নাকচ করে দেন এসলামি। তাঁর ভাষায়, ‘ইরানের দৃষ্টিকোণ থেকে আমেরিকানরাই নিজেদের মুখ রক্ষার পথ খুঁজছে, আর ইরানি জাহাজ জব্দ করা সেই প্রচেষ্টারই অংশ।’ তিনি আরও বলেন, ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসিএর পাল্টা হামলার খবর ইঙ্গিত দেয়, ইরান কোনোভাবেই পিছু হটছে না।
এসলামি বলেন, ‘এই যুদ্ধ শুরু করার সময় যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সুস্পষ্ট কৌশল ছিল না। আলোচনার ব্যাপারে আমি খুব আশাবাদী নই। যদি কোনো সমঝোতা না হয়, তাহলে যুদ্ধ আবার শুরু হবে।’
এদিকে, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাঈল বাঘাই অভিযোগ করেছেন—যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর দোষ চাপানোর খেলায় মেতেছে। তিনি বলেন, ‘তারা ইতিবাচক ভূমিকা নেওয়ার বদলে এই খেলাই চালিয়ে যাচ্ছে। তবে আমেরিকানদের কাছ থেকে সত্য কথা আশা করা যায় না, তারা সব সময়ই আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘দেখে মনে হচ্ছে, আমেরিকা মোটেও সিরিয়াস নয়।’
অপরদিকে, হরমুজে মার্কিন বাহিনীর ইরানি জাহাজ দখলের বিষয়টি দুই দেশের মধ্যে সংঘাত বৃদ্ধির কারণ হতে পারে বলে মনে করেন অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আমিন সাইক্যাল। তিনি মনে করেন, পারস্য উপসাগরে ইরানি কার্গো জাহাজ জব্দের ঘটনা ইসলামাবাদে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার আগে পরিস্থিতিকে আরও উসকে দিতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির এই অধ্যাপক আল জাজিরাকে বলেন, ‘এ ধরনের পদক্ষেপ সহজেই উত্তেজনা বাড়িয়ে দিতে পারে’ এবং এটি ইসলামাবাদের আলোচনায় একটি যৌক্তিক ফলাফলের সম্ভাবনাকে ‘নস্যাৎ করে দিতে পারে’ বলেও তিনি সতর্ক করেন। তিনি বলেন, ‘এখন সময় এসেছে, উভয় পক্ষই যেন এমন কোনো পদক্ষেপ না নেয় যা উত্তেজনা বাড়াতে পারে—বিশেষ করে যদি তারা সত্যিই একটি স্থায়ী সমাধানে পৌঁছাতে চায়।’
ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান প্রসঙ্গে সাইক্যাল বলেন, প্রেসিডেন্ট একসঙ্গে দুই ধরনের কৌশল প্রয়োগ করছেন। তাঁর মতে, ট্রাম্প ‘একদিকে সংকটের সমাধান চান বলে বলছেন, অন্যদিকে ইরানের বিরুদ্ধে হুমকি দিচ্ছেন—যা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলছে।’ যুদ্ধবিরতির সময়সীমা ঘনিয়ে আসার প্রেক্ষাপটে সাইক্যাল বলেন, উভয় পক্ষই ‘ভীষণ চাপের মধ্যে’ রয়েছে। তবে তিনি উল্লেখ করেন, ‘হরমুজ প্রণালি এখন ইরানের জন্য একটি নতুন প্রতিরোধমূলক হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।’
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats