কেবল পরিসংখ্যানের বিবেচনা করলে রুবেল হোসেন ছিলেন একজন চলনসই ফাস্ট বোলার। ২০০৯ থেকে ২০২১ সালের মধ্যকার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে ১৯৩টি উইকেট, যা দাপুটে না হলেও তাকে প্রাসঙ্গিক রাখার জন্য যথেষ্ট ছিল। তবে তার ক্যারিয়ার ধারাবাহিকতার চেয়ে বরং ধারাল, আকস্মিক ও মাঝেমধ্যে এলোমেলো কিন্তু কার্যকর প্রভাবের কারণেই বেশি পরিচিতি পেয়েছে।
তার গল্পের শুরুটা ছিল অনেকটা সিনেমার মতো। বাগেরহাটের এক তরুণ— পেসার হান্ট কর্মসূচির মাধ্যমে যাকে খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল এবং যার বলের গতি নির্বাচকদের নজর কেড়েছিল। বাংলাদেশ যেখানে দীর্ঘকাল মিডিয়াম পেস ও স্পিনের ওপর নির্ভরশীল ছিল, সেখানে রুবেল নিয়ে এলেন চাবুকের মতো ক্ষীপ্র স্লিঙ্গিং অ্যাকশনের দুর্দান্ত গতি।
'আজ আমি যে অবস্থানে আছি, তার পেছনে রয়েছেন আমার শ্রদ্ধেয় কোচ সারোয়ার ইমরান স্যার। তিনি আমাকে পেসার হান্ট থেকে তুলে এনেছিলেন এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ দেখিয়েছেন। সারাজীবন আমি তার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকব,' সোমবার মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে কথাগুলো বলছিলেন রুবেল। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে সম্প্রতি অবসর নেওয়ায় নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে দ্বিতীয় ওয়ানডের আগে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) তাকে বিশেষ সম্মাননা প্রদান করে।
এই আয়োজন নিয়ে রুবেল যোগ করেন, 'এটি এমন কিছু, যা আমাকে অত্যন্ত গর্বিত ও আনন্দিত করেছে। এমন সুন্দর আয়োজনের জন্য আমি বিসিবি ও (বোর্ডের অ্যাডহক কমিটির প্রধান) তামিম ইকবালকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।'
রুবেল দেশের প্রথম ফাস্ট বোলার ছিলেন না, কিন্তু তার মাঝে ভিন্ন কিছু ছিল— আগের পেসারদের চেয়ে দ্রুতগতির, আক্রমণাত্মক ও বেপরোয়া। অনেক দিক থেকেই তিনি ছিলেন বাংলাদেশের সীমিত ওভারের পেসারদের আদর্শ রূপ বা— পিচ থেকে গতি তোলা, সজোরে বল করা এবং যখন স্নায়ুর চাপ বাড়ে তখন অর্থাৎ ডেথ ওভারে আক্রমণে ফিরে আসা। মোস্তাফিজুর রহমান যদি কাটারে নিপুণ কারিগর হন, তবে রুবেল ছিলেন অনেকটা ভোঁতা অস্ত্রের মতো— সূক্ষ্মতা কম, কিন্তু শক্তিতে ভরপুর।
২০১৫ সালে অনুষ্ঠিত আইসিসি বিশ্বকাপ ছিল তার পেশাদার খেলোয়াড়ি জীবনের সফলতার চূড়া। অ্যাডিলেডে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তার সেই ম্যাচজয়ী পারফরম্যান্স— দুই ব্যাটিং স্তম্ভ ইয়ান বেল ও অধিনায়ক ওয়েন মরগ্যানকে ফিরিয়ে দেওয়া এবং শেষদিকে স্টুয়ার্ট ব্রড ও জেমস অ্যান্ডারসনকে আউট করার মাধ্যমে বাংলাদেশকে কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে দেওয়া। বাংলাদেশের বিপক্ষে এই হারটি ইংল্যান্ডের জন্য বড় পরিবর্তনের প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছিল, যা তাদের ক্রিকেটে আমূল সংস্কার নিয়ে আসে এবং শেষ পর্যন্ত পরবর্তী অর্থাৎ ২০১৯ সালের বিশ্বকাপ জয়ের পেছনে বড় ভূমিকা রাখে।
তবে এই চিত্তাকর্ষক গল্পের সাথে কিছু জটিলতাও জড়িয়ে ছিল। ওই বিশ্বকাপের ঠিক আগেই নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে গ্রেফতার হয়েছিলেন রুবেল। তার বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছিল। জামিন পেয়ে তিনি অস্ট্রেলিয়া যান এবং সেই অবিস্মরণীয় নৈপুণ্য উপহার দেন। মাঠের বাইরের ঘটনা এবং মাঠের ভেতরের সফলতার বৈপরীত্য এড়িয়ে যাওয়া কঠিন ছিল, যদিও সময়ের সাথে সেই মামলাটি সংবাদের শিরোনাম থেকে হারিয়ে যায়।
রুবেলের ক্যারিয়ারে আরও ছন্দপতন ঘটেছিল— বোর্ডের সাথে ঝামেলা, কেন্দ্রীয় চুক্তি থেকে বাদ পড়া, শৃঙ্খলা ও পুনর্বাসন নিয়ে প্রশ্ন। তার ক্যারিয়ার অনেক সময়ই অগোছালো মনে হয়েছে, যেন একজন বোলার ছন্দ খুঁজে ফিরছেন। তার মাঠের পারফরম্যান্সেও ছিল বিস্তর ব্যবধান। ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টিতে কার্যকর ছিলেন— নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক, ৫০ ওভারের ক্রিকেটে বাংলাদেশের সেরা বোলিং ফিগারগুলোর মধ্যে একটি (সেই একই ম্যাচে ২৬ রানে ৬ উইকেট) কিংবা বোলিং রসদে রিভার্স সুইং থাকা। কিন্তু টেস্ট ক্রিকেটে ৭০-এর ওপর গড় আর উইকেটের দীর্ঘ খরা বুঝিয়ে দিয়েছিল যে, এই ফরম্যাটের সাথে তার ঠিক মানিয়ে নেওয়া হয়নি।
তবে অধিনায়করা প্রায়ই রুবেলকে 'ফায়ারফাইটার' বা ত্রাণকর্তা হিসেবে বিশ্বাস করতেন। যখন কোনো ম্যাচে কঠিন চাপের পরিস্থিতি তৈরি হতো, তখন রুবেলই হতেন বল হাতে প্রথম পছন্দ— যিনি ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখতেন। এটিই আসলে তাকে বোঝার সবচেয়ে সহজ উপায়। তিনি দীর্ঘ ও ধারাবাহিক স্পেলের চেয়ে বরং স্বল্প সময়ের বিধ্বংসী আক্রমণে দক্ষ একজন পেসার ছিলেন।
দীর্ঘদিন জাতীয় দলের বাইরে থাকায় তার ক্যারিয়ারের আলো যখন নিভে আসছিল, তখন অনেকেই হয়তো আক্ষেপ করেছেন— যদি আরও একটু ধারাবাহিকতা থাকত এবং পথটা আরও মসৃণ হতো। তবুও তার ছাপ রয়ে গেছে অন্য কোথাও। বাংলাদেশের মানুষের সুখকর সেই স্মৃতিতে এবং ইংল্যান্ডের জন্য সেই অস্বস্তিকর স্মৃতিতে রুবেলের ছবিটা অমলিন হয়ে থাকবে— তিনি সজোরে দৌড়ে আসছেন, স্টাম্প ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছেন এবং সতীর্থরা তাকে ঘিরে উল্লাসে মেতে উঠছেন। ক্যারিয়ারের ইতি টানার সময় খুব কম ক্রিকেটারই এমন গভীর ছাপ রেখে যেতে পারেন।
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats