আলোচনায় একটি যৌথ কাঠামোতে পৌঁছাতে লিখিত বার্তা বিনিময় করেছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। শনিবার পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে অবস্থানরত প্রতিনিধিদের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে ইরানের আধা-সরকারি বার্তাসংস্থা তাসনিম। সংস্থাটি আরও জানায়, আলোচনা চলছে। তবে হরমুজ প্রণালির বিষয়টি গুরুতর মতবিরোধের মধ্যে থাকা অন্যতম ইস্যু।
এদিকে, আল জাজিরা জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধবিরতি আলোচনার প্রথম ধাপ পাকিস্তানের রাজধানীতে শেষ হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, উভয়পক্ষ লিখিত বার্তা বিনিময় করছে, যাতে ইসলামাবাদে হওয়া সমঝোতাগুলোতে তারা একই অবস্থানে আছে কি না, তা নিশ্চিত করা যায়। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে এটি প্রথম সরাসরি আলোচনা।

আলোচনা রোববার পর্যন্ত গড়াতে পারে
পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনা শনিবার গভীর রাত পর্যন্ত চলবে। এটি সম্ভবত রোববার পর্যন্ত গড়াতে পারে। শনিবার পাকিস্তানের একটি সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে সিএনএন। সূত্রটি আরও জানায়, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ ও সেনাপ্রধান আসিম মুনিরও আলোচনাকক্ষে আছেন।
এদিকে, ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভি জানিয়েছে, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, ইসলামাবাদে থাকা ইরানি প্রতিনিধিদল পাকিস্তানের কাছে তেহরানের ১০ দফা প্রস্তাবের অধীনে তাদের শর্তগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করেছে।
ইসলামাবাদে ইরানি আলোচক দলের অংশ হিসেবে থাকা বাঘাই সাংবাদিকদের বলেন, ইরান শুরু থেকেই স্পষ্ট করে জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি অবশ্যই বাস্তব হতে হবে এবং শব্দের প্রকৃত অর্থে তা বাস্তবায়িত হতে হবে। তিনি বলেন, ইরান ও পাকিস্তান পক্ষের মধ্যে আলোচনা ২ থেকে আড়াই ঘণ্টা হয়েছে। এর আগে শনিবার সন্ধ্যায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়।
ফারস ও তাসনিম সংবাদ সংস্থা জানায়, ‘প্রাথমিক আলোচনায় অগ্রগতি এবং লেবাননের দক্ষিণ বৈরুতে জায়নিস্ট শাসনের হামলা কমে যাওয়ার’ পরিপ্রেক্ষিতে আলোচনা শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এখানে ‘জায়নিস্ট শাসন’ বলতে ইসরায়েলকে বোঝানো হয়েছে।
এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের দপ্তর জানিয়েছে, শান্তি আলোচনা ‘শুরু হয়েছে’। এর পরপরই ইরানি সংবাদ সংস্থা মেহর ও ইসনাও আলোচনার সূচনার কথা জানায়।

কোন দেশে ইরানের কত সম্পদ ‘জব্দ’
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত থামাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোর একটি হলো—বিদেশে জব্দ থাকা ইরানের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সম্পদ মুক্ত করে দেওয়া। ইসলামাবাদে আলোচনা শুরুর আগে বিভিন্ন গণমাধ্যমে ‘জব্দ থাকা ইরানের সম্পদ ছেড়ে দিতে যুক্তরাষ্ট্র রাজি হয়েছে’—এমন প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও হোয়াইট হাউস এর সত্যতা অস্বীকার করেছে।
বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করেন, এই জব্দকৃত অর্থই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি শান্তিচুক্তির মূল চাবিকাঠি কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার পথ। কিন্তু ইরানের জব্দকৃত সম্পদের পরিমাণ আসলে কত, কোন কোন দেশে আছে এসব সম্পদ এবং এর শুরু কখন ও কীভাবে?
ইউরো নিউজ, ওয়াশিংটন পোস্টসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এ সম্পর্কে বেশকিছু তথ্য পাওয়া গেছে।
ইরানের সম্পদ ছাড়ের বিষয়ে রাজি যুক্তরাষ্ট্র
ইরানের প্রতিনিধিদলের ঘনিষ্ঠ সূত্রের বরাত দিয়ে আল–জাজিরা জানিয়েছে, ইরানের স্থগিত সম্পদ ছাড় দিতে রাজি হয়েছে। সূত্র জানিয়েছে, সম্পদ ছাড়ের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হওয়ার পর ইরান আলোচনায় অংশ নিয়েছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র এই বিষয়ে সম্মত হয়েছে কিনা তা জানায়নি।
ইসলামাবাদ আলোচনা শুরু হওয়ার আগে বার্তা সংস্থা রয়টার্স ইরানের একটি সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছিল, কাতার এবং অন্যান্য বিদেশি ব্যাংকে জব্দ ইরানের সম্পদ ছাড় করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র সম্মত হয়েছে। তবে বিষয়টি নজরে আসার পর তখন মার্কিন প্রেসিডেন্টের দপ্তর হোয়াইট হাউস বিষয়টি অস্বীকার করে। উল্লেখ্য, আলোচনার আগে তেহরানের পক্ষ থেকে দেওয়া ১০ দফার মধ্যে ইরানের সম্পদ ছাড়ের বিষয়টিও যুক্ত ছিল।
ইরানের কত সম্পদ আটকে আছে?
ঠিক কত সম্পদ আটকে আছে তার সুনির্দিষ্ট পরিমাণ স্পষ্ট নয়। তবে বিভিন্ন সময়ের চুক্তি ও গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী—২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তির পর প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদ ইরান ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছিল, যা ২০১৮ সালে ট্রাম্প পুনরায় জব্দ করেন।
২০১৪ সালে পরমাণু ইস্যুতে অন্তর্বর্তী চুক্তির পর ৪ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার ফেরত পেয়েছিল ইরান।এছাড়া ২০২৩ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় আটকে থাকা প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার কাতারে স্থানান্তর করা হয়। ইউরো নিউজের তথ্যমতে, ইরানের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের বড় অংশ এখনো বিভিন্ন দেশে আংশিক বা পুরোপুরি অচল অবস্থায় রয়েছে।
কোন কোন দেশে আছে এই সম্পদ
কয়েক দশকের নিষেধাজ্ঞা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তির পরিপ্রেক্ষিতে ইরানের বিপুল পরিমাণ অর্থ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। এর মধ্যে রয়েছে—দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, চীন, জার্মানি, ভারত ও তুরস্ক। এছাড়া হংকংয়ের শেল কোম্পানির মাধ্যমেও কিছু অর্থ সংরক্ষিত আছে।
ইউরো নিউজ জানায়, ঐতিহাসিকভাবে ইরানের তেলের বড় গ্রাহক হওয়ায় দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে বড় একটি অংশ জমা আছে। তবে সব দেশের ক্ষেত্রে একই নিয়ম নেই—কোথাও পুরোটা জব্দ, কোথাও আংশিক, কোথাও সীমিত ব্যবহারের অনুমতি রয়েছে।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই অর্থ
যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের মুদ্রা (রিয়াল) ব্যাপকভাবে মূল্য হারিয়েছে। বিদেশি মুদ্রায় লেনদেনও (ইউরো, ইয়েন) প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে আমদানি–রপ্তানি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ফেব্রুয়ারিতে কংগ্রেসের একটি শুনানির সময় মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট স্বীকার করেছেন যে, বিক্ষোভ উসকে দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ইচ্ছাকৃতভাবে ইরানে ডলারের ঘাটতি তৈরি করেছিল।
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats