ইরানের হামলায় বিধ্বস্ত ভবন পরিদর্শন করছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু। ছবি: রয়টার্স
ইরানে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের পূর্ণ চিত্র। প্রায় ৪০ দিনের এই সংঘাতে ব্যাপক প্রাণহানি, ক্ষয়ক্ষতি এবং সামরিক অবকাঠামোর ধ্বংসের তথ্য সামনে এসেছে। টাইমস অব ইসরায়েলের প্রতিবেদনে এর বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।
ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ও বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি
যুদ্ধ চলাকালে ইরান ইসরায়েলের দিকে প্রায় ৬৫০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। এরমধ্যে অর্ধেকের বেশি ছিল ক্লাস্টার বোমা বহনকারী, যা বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে নির্বিচারে ক্ষতি সাধন করে। এই হামলায় ইসরায়েলে ২০ জন বেসামরিক নাগরিক ও বিদেশি নিহত হন এবং পশ্চিম তীরে আরও চার ফিলিস্তিনি প্রাণ হারান। আহত হয়েছেন সাত হাজারের বেশি মানুষ।

যুদ্ধের প্রথম দিনেই ইসরায়েলে প্রায় ৮০টি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে ইরান। পরদিন ৬০টি এবং তৃতীয় দিনে প্রায় ৩০টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। এরপরের দিনগুলোতে প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ২০টি করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। অনেক ক্ষেপণাস্ত্র সরাসরি জনবসতিপূর্ণ এলাকায় আঘাত হানে, যার ফলে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটে। প্রায় ৫০টি ঘটনায় ক্লাস্টার বোমা জনবসতিতে বিস্ফোরিত হয়।
ইসরায়েলের পাল্টা হামলা
ইসরায়েলি বিমানবাহিনী এই যুদ্ধে ইরানে ১৮ হাজারের বেশি বোমা ফেলে এবং ১ হাজারের বেশি দফায় হামলা চালায়। মোট ১০ হাজার ৮০০টিরও বেশি পৃথক হামলা পরিচালনা করা হয়, যা চার হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে। এই হামলাগুলোর লক্ষ্য ছিল ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র, অস্ত্র উৎপাদন কারখানা, পারমাণবিক স্থাপনা এবং সামরিক নেতৃত্ব। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীও পৃথকভাবে প্রায় ১৩ হাজার হামলা চালিয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
ইরানের সামরিক সক্ষমতায় আঘাত
ইসরায়েলের দাবি, তাদের হামলায় ইরানের প্রায় ৬০ শতাংশ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা ধ্বংস বা অকার্যকর হয়ে গেছে। প্রায় ২০০টি উৎক্ষেপণ কেন্দ্র ধ্বংস হয়েছে এবং আরও ৮০টি ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। যুদ্ধের শুরুতে ইরানের কাছে প্রায় ২ হাজার ৫০০ ক্ষেপণাস্ত্র ছিল বলে ধারণা করা হলেও এখন তা কমে প্রায় ১ হাজারে নেমে এসেছে।
এ ছাড়া, ইরানের প্রায় ৮৫ শতাংশ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা
যুদ্ধ চলাকালে ইরানের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালানো হয়। এরমধ্যে ছিল ইয়াজদের কাছাকাছি ইয়েলোকেক উৎপাদন কেন্দ্র, আরাকের হেভি ওয়াটার রিয়্যাক্টর, তেহরানের মালেক আস্তার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কেন্দ্র এবং পারচিন সামরিক কমপ্লেক্সের স্থাপনা।
যুক্তরাষ্ট্র বিশেষভাবে ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদকে লক্ষ্য করে অভিযান পরিচালনা করেছে বলেও জানা গেছে। সেন্ট্রাল ইসরায়েলের একটি আবাসিক এলাকায় ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার পর উদ্ধারকাজ পরিচালনা করছেন জরুরি সেবাকর্মীরা। ছবি: রয়টার্স
অর্থনৈতিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা
যুদ্ধের শেষ দিকে ইসরায়েল ইরানের অর্থনৈতিক অবকাঠামোতেও হামলা বাড়ায়। গ্যাস স্থাপনা, ইস্পাত কারখানা, পেট্রোকেমিক্যাল প্ল্যান্ট এবং গুরুত্বপূর্ণ রেললাইন ও সেতু লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। এতে ইরানের অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সামরিক নেতৃত্বে বড় ক্ষতি
যুদ্ধের শুরুতেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ শীর্ষ পর্যায়ের প্রায় ৪০ জন সামরিক কর্মকর্তা নিহত হন বলে দাবি করেছে ইসরায়েল। পরবর্তী সময়েও আরও অনেক শীর্ষ কমান্ডার নিহত হন। সব মিলিয়ে ইসরায়েলের হিসাব অনুযায়ী, এই সংঘাতে প্রায় ৫ হাজার ইরানি সেনা নিহত এবং কয়েক হাজার আহত হয়েছেন।
যুদ্ধের সামগ্রিক প্রভাব
এই যুদ্ধ শুধু সামরিক ক্ষেত্রেই নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও রাজনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলেছে। জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকট এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক উত্তেজনা, সব মিলিয়ে এর প্রভাব বহুমাত্রিক।
যদিও আপাতত যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে, তবে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা এখনো অনিশ্চিত। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সংঘাতের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিশ্ব রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে।
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats