ইসরায়েল ও দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সম্পর্কে মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে নেতিবাচক মনোভাব ক্রমে বাড়ছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি দেখা গেছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টারের চলতি সপ্তাহে প্রকাশিত এক জরিপে এই তথ্য উঠে এসেছে। সেখানে দেখা গেছে, ১০ জনে ৬ জন মার্কিন নাগরিক ইসরায়েল সম্পর্কে খুব বা কিছুটা নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন।
জরিপে আরও উঠে এসেছে, ৬০ শতাংশ মার্কিন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন, যা গত বছর ছিল ৫৩ শতাংশ। এই ৬০ শতাংশের মধ্যে প্রায় অর্ধেক বলেছেন, তাঁদের ইসরায়েল সম্পর্কে ‘খুবই নেতিবাচক’ ধারণা রয়েছে, যা গত চার বছরে তিন গুণ বেড়েছে। আর ৫৯ শতাংশ নাগরিক বিশ্ব রাজনীতিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে নেতানিয়াহুর ওপর খুব একটা আস্থা রাখতে পারছেন না। গত বছর এই হার ছিল ৫২ শতাংশ।
গত ২৩ থেকে ২৯ মার্চের মধ্যে ৩ হাজার ৫০৭ জন মার্কিন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের ওপর এই জরিপ চালানো হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ নেতৃত্বে ইরানে যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রায় এক মাস পর এই তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
জরিপটি দেখাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলবিরোধী মনোভাব বাড়ছে। এর আগে একাধিক জরিপেও দেখা গেছে যে, মার্কিনরা এখন ইহুদি রাষ্ট্রের চেয়ে ফিলিস্তিনিদের প্রতি বেশি সহানুভূতিশীল।
জরিপের এই ফলাফল এমন এক সময়ে এল, যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের নেতারাই ইসরায়েলে মার্কিন সাহায্য কমানো বা পুরোপুরি বন্ধ করার দাবি তুলছেন। পাশাপাশি ইসরায়েল-পন্থী লবি ‘আইপ্যাক’ বিশেষ করে ডেমোক্র্যাটদের কাছে কঠোর সমালোচনার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
ইসরায়েল সম্পর্কে মার্কিনদের দৃষ্টিভঙ্গি
প্রতি ১০ জন মার্কিন নাগরিকের মধ্যে ৬ জনই ইসরায়েল সম্পর্কে বর্তমানে ‘খুবই’ বা ‘কিছুটা’ নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন। গত বছরের তুলনায় এই হার ৭ শতাংশ এবং ২০২২ সালের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে। ইসরায়েল সম্পর্কে ‘খুবই নেতিবাচক’ ধারণা পোষণকারী নাগরিকের হার (২৮ শতাংশ) গত বছরের চেয়ে ৯ শতাংশ বেড়েছে, যা ২০২২ সালের (১০ শতাংশ) তুলনায় প্রায় তিন গুণ।
বর্তমানে ৮০ শতাংশ ডেমোক্র্যাট ও ডেমোক্র্যাটঘেঁষা স্বতন্ত্র নাগরিক ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা রাখেন। গত বছর এই হার ছিল ৬৯ শতাংশ এবং ২০২২ সালে ৫৩ শতাংশ। ৫০ বছরের কম বয়সী ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে বয়স্কদের তুলনায় ইসরায়েল সম্পর্কে অত্যন্ত নেতিবাচক মনোভাব বেশি দেখা গেছে (৪৭ শতাংশ বনাম ৩৯ শতাংশ)।
রিপাবলিকান ও রিপাবলিকানঘেঁষা নাগরিকদের মধ্যে নেতিবাচক মনোভাবের (৪১ শতাংশ) চেয়ে ইতিবাচক মনোভাবের (৫৮ শতাংশ) পাল্লা এখনো ভারী। তবে গত বছরের তুলনায় রিপাবলিকানদের মধ্যেও নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি কিছুটা বেড়েছে, যার মূলে রয়েছে ৫০ বছরের কম বয়সীরা। বর্তমানে ১৮ থেকে ৪৯ বছর বয়সী রিপাবলিকানদের ৫৭ শতাংশই ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন, যা গত বছর ছিল ৫০ শতাংশ। অবশ্য ৫০ বা তার বেশি বয়সী রিপাবলিকানদের বড় অংশ এখনো ইসরায়েলকে ইতিবাচকভাবে দেখেন।
ধর্মীয় গোষ্ঠীর ভিত্তিতেও ইসরায়েল সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় পার্থক্য দেখা গেছে। ইহুদি মার্কিন (৬৪ শতাংশ) এবং শ্বেতাঙ্গ ইভানজেলিক্যাল প্রোটেস্ট্যান্টদের (৬৫ শতাংশ) অধিকাংশের মনোভাব ইসরায়েলের প্রতি ইতিবাচক। অন্যদিকে শ্বেতাঙ্গ নন-ইভানজেলিক্যাল প্রোটেস্ট্যান্ট (৩৯ শতাংশ), ক্যাথলিক (৩৫ শতাংশ), কৃষ্ণাঙ্গ প্রোটেস্ট্যান্ট (৩৩ শতাংশ) এবং কোনো ধর্মের অনুসারী নন এমন ব্যক্তিদের (২২ শতাংশ) মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব অনেক কম। মুসলিম মার্কিনদের মাত্র ৪ শতাংশ ইসরায়েলকে ইতিবাচকভাবে দেখেন।
বিশ্ব রাজনীতিতে নেতানিয়াহুর ওপর আস্থা
প্রায় ৫৯ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন, বিশ্ব রাজনীতিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে নেতানিয়াহুর ওপর খুব একটা বা একদমই আস্থা রাখা যায় না। গত বছরের তুলনায় এই অনাস্থার হার ৭ শতাংশ এবং ২০২৩ সালের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোর মতো ডেমোক্র্যাটদের বড় একটি অংশ (৭৬ শতাংশ) ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর ওপর আস্থা রাখছেন না, যা গত বছরের তুলনায় ৬ শতাংশ বেশি। বর্তমানে ৫২ শতাংশ ডেমোক্র্যাট নেতানিয়াহুর ওপর ‘একেবারেই কোনো আস্থা নেই’ বলে জানিয়েছেন, গত বছর যা ছিল ৩৭ শতাংশ।
রিপাবলিকানদের মধ্যে নেতানিয়াহু সম্পর্কে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ৪৫ শতাংশ তাঁর ওপর আস্থা রাখলেও ৪৪ শতাংশ অনাস্থা প্রকাশ করেছেন। তবে বয়সের ভিত্তিতে এখানেও পার্থক্য স্পষ্ট। ৫০ বা তার বেশি বয়সী রিপাবলিকানরা তরুণদের তুলনায় নেতানিয়াহুর ওপর দ্বিগুণ আস্থা রাখেন (৫৮ শতাংশ বনাম ৩০ শতাংশ)।
ধর্মীয় বিচারে ৫২ শতাংশ শ্বেতাঙ্গ ইভানজেলিক্যাল প্রোটেস্ট্যান্ট নেতানিয়াহুর ওপর আস্থা প্রকাশ করেছেন। তবে ৫৬ শতাংশ ইহুদি মার্কিন এবং ৯১ শতাংশ মুসলিম মার্কিন তাঁর ওপর অনাস্থা প্রকাশ করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের ওপর আস্থা
অর্ধেকের বেশি মার্কিন নাগরিক (৫৫ শতাংশ) মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিষয়ে ভালো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর আস্থা রাখা যায় না। ২০২৫ সালের আগস্টের তুলনায় এই চিত্র খুব একটা বদলায়নি।
তবে ইরানের প্রতি মার্কিন নীতির (৩৫ শতাংশ আস্থা) চেয়ে ইসরায়েল নীতির ক্ষেত্রে ট্রাম্পের ওপর মার্কিনদের আস্থা সামান্য বেশি। প্রায় ৭৩ শতাংশ রিপাবলিকান ট্রাম্পের ওপর আস্থা রাখলেও ডেমোক্র্যাটদের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ১৬ শতাংশ। লক্ষণীয় যে,৩০ বছরের কম বয়সী রিপাবলিকানরা ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের তুলনায় ট্রাম্পের ইসরায়েল নীতির ওপর অনেক কম আস্থা রাখেন (৫২ শতাংশ বনাম ৯৩ শতাংশ)।
ইসরায়েল-হামাস সংঘাতের গুরুত্ব
৫৩ শতাংশ মার্কিন নাগরিক জানিয়েছেন, ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যকার সংঘাত তাঁদের কাছে ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত বা কিছুটা গুরুত্বপূর্ণ। এই হার গত বছরের তুলনায় প্রায় অপরিবর্তিত।
তবে ইসরায়েল-হামাস সংঘাতের চেয়ে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযানকে মার্কিনরা ব্যক্তিগতভাবে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন (৫৩ শতাংশ বনাম ৭৭ শতাংশ)।
ইহুদি মার্কিনদের ৯১ শতাংশ এবং মুসলিম মার্কিনদের ৭০ শতাংশ এই সংঘাতকে ব্যক্তিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। শ্বেতাঙ্গ ইভানজেলিক্যাল প্রোটেস্ট্যান্টদের ক্ষেত্রে এই হার ৬৫ শতাংশ। ইহুদি ও মুসলিম নাগরিকরা ইরানে মার্কিন অভিযান ও ইসরায়েল-হামাস সংঘাত—উভয়কেই সমান গুরুত্ব দিলেও ইভানজেলিক্যালরা ইসরায়েল-হামাস সংঘাতের চেয়ে ইরানের সামরিক অভিযানকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।
পিউ রিসার্চের এই জরিপ (যার ত্রুটির মাত্রা বা মার্জিন অব এরর ১.৯ শতাংশ) চলতি সপ্তাহে প্রকাশিত দ্বিতীয় জরিপ, যেখানে খোদ মার্কিন ইহুদিদের মধ্যে ইসরায়েলি সরকারের প্রতি বিরোধিতার চিত্র ফুটে উঠেছে। ‘জিউইশ ইলেকটরেট ইনস্টিটিউট’-এর একটি ছোট জরিপে দেখা গেছে, ৬৩ শতাংশ উত্তরদাতা নিজেদের ‘ইসরায়েল-পন্থী’ হিসেবে পরিচয় দিলেও একই সঙ্গে ইসরায়েলি সরকারের নীতির কড়া সমালোচক।
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats