বেইজিংয়ের ঝংনানহাই গার্ডেন পরিদর্শন শেষে বের হওয়ার সময় শি জিনপিংয়ের সঙ্গে কথা বলছেন ডোনাল্ড ট্�
ইরান যুদ্ধের মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন চীন সফরে যান, তখন ওয়াশিংটন ও বেইজিং—দুই রাজধানীতেই প্রত্যাশার পারদ ছিল আকাশচুম্বী। প্রায় এক দশক পর কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের বেইজিং সফর, সঙ্গে বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি, জ্বালানি, বিমান ও আর্থিক খাতের করপোরেট প্রধানদের বিশাল বহর—সব মিলিয়ে একে কেবল কূটনৈতিক সফর নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছিল।
অ্যাপল, এনভিডিয়া, বোয়িং, অ্যাক্সনমবিল, সিটিগ্রুপ, টেসলা, মেটা—এমন বহু প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহীরা ট্রাম্পের সফরসঙ্গী ছিলেন। সফরের আগে মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকেও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল যে, এটি ‘চীনকে আরও উন্মুক্ত করার’ একটি বড় সুযোগ হতে পারে।

কিন্তু সফর শেষে দেখা গেল, প্রত্যাশিত বড় কোনো বাণিজ্যচুক্তি হয়নি, নতুন শুল্ক সমঝোতা হয়নি, প্রযুক্তি নিষেধাজ্ঞা শিথিল হয়নি, এমনকি দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক কাঠামোগত বিরোধেরও দৃশ্যমান সমাধান আসেনি বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
ফলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের বড় একটি অংশ এখন প্রশ্ন তুলছে—ট্রাম্পের এই সফর কি শেষ পর্যন্ত ‘যত গর্জে তত বর্ষে না’-এর উদাহরণ হয়ে গেল?
বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে স্বাগত জানানোর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ, অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, এনভিডিয়ার প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াং, জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা স্টিফেন মিলার, টেসলা ও স্পেসএক্সের প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক এবং অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী টিম কুক। ছবি: এএফপি

তারকাখচিত সফর, কিন্তু ফল সীমিত
এই সফরের সবচেয়ে আলোচিত দিক ছিল মার্কিন করপোরেট জগতের মহারথীদের উপস্থিতি। ট্রাম্প প্রশাসন মূলত দেখাতে চেয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের বড় ব্যবসাগুলো এখনও চীনা বাজারে প্রবেশ ও সম্প্রসারণে আগ্রহী। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর, জ্বালানি, বিমান ও ভোক্তা প্রযুক্তি খাতে নতুন সুযোগ তৈরির আশা ছিল।
বিশ্লেষকদের ধারণা ছিল, সফরে অন্তত কয়েকটি বড় বিনিয়োগ চুক্তি বা বাজার উন্মুক্তকরণের ঘোষণা আসবে। চীন হয়তো মার্কিন কৃষিপণ্য, জ্বালানি বা বিমান কেনার প্রতিশ্রুতি দেবে। বাস্তবে সবচেয়ে বড় ঘোষণাটি ছিল চীনের সম্ভাব্য ২০০টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার আগ্রহ।
কিন্তু এটিও আনুষ্ঠানিক চূড়ান্ত চুক্তি হিসেবে উপস্থাপিত হয়নি। বরং বাজারে আগে যে ৫০০ বিমানের সম্ভাব্য অর্ডারের আলোচনা ছিল, তার তুলনায় এটি অনেক ছোট হয়ে গেছে। ফলে বোয়িং ও জিই অ্যারোস্পেসের শেয়ারদর পর্যন্ত পড়ে গেছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
অর্থাৎ, এই সফরের আগে যে ধরনের ‘মেগা ডিল’ নিয়ে আলোচনা চলছিল, বাস্তবে তার বড় অংশ অধরাই রয়ে গেল।

কেন বড় চুক্তি হলো না?
মার্কিন থিঙ্ক ট্যাঙ্ক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ বলছে, এজন্য কয়েকটি কারণকে সামনে এনেছেন বিশ্লেষকেরা।
যুক্তরাষ্ট্র ও পারস্পরিক অবিশ্বাস এখন অনেক গভীর চীনের
২০১৮ সালের বাণিজ্যযুদ্ধের পর থেকে দুই দেশের সম্পর্ক কেবল শুল্কবিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এখন এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ, সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, তাইওয়ান প্রশ্ন, দক্ষিণ চীন সাগর, সাইবার নিরাপত্তা এবং ভূরাজনৈতিক আধিপত্যের লড়াই।
চীন মনে করে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রযুক্তিগত উত্থান ঠেকাতে চায়। অন্যদিকে ওয়াশিংটনের অভিযোগ, চীন রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি, প্রযুক্তি চুরি এবং বাজার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অসম প্রতিযোগিতা তৈরি করছে। এই প্রেক্ষাপটে একটি সফরে গিয়ে বড় অর্থনৈতিক সমঝোতা করা রাজনৈতিকভাবে দুই পক্ষের জন্যই কঠিন।
ট্রাম্পের দর-কষাকষির অবস্থান আগের মতো শক্তিশালী নয়
রয়টার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ট্রাম্প এবার চীনে গেছেন তুলনামূলক দুর্বল অবস্থানে থেকে। যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, উৎপাদক মূল্য সূচক দ্রুত বাড়ছে, সুদের হার নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে এবং ইরান যুদ্ধ ঘিরে রাজনৈতিক চাপও বাড়ছে।

এ ছাড়া, ট্রাম্পের আগের শুল্কনীতি উল্টো যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি করেছে। বিশেষ করে বিরল খনিজ বা ‘রেয়ার আর্থ’ সরবরাহে চীনের পাল্টা কড়াকড়ি ওয়াশিংটনের দুর্বলতাও প্রকাশ করেছে।
ফলে এবার বেইজিং সফরে ট্রাম্পের মূল লক্ষ্য ছিল উত্তেজনা কমানো এবং অন্তত সীমিত অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। বিশ্লেষকদের মতে, এই বাস্তবতা চীন ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছে।
চীনের আগ্রহও ছিল সীমিত
অনেকে মনে করেছিলেন, অর্থনৈতিক ধীরগতির কারণে চীন এবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বড় চুক্তিতে আগ্রহী হবে। কিন্তু বাস্তবে বেইজিং অনেক বেশি সতর্ক অবস্থানে ছিল।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সফরের সময় ‘গঠনমূলক কৌশলগত স্থিতিশীলতা’র কথা বললেও তাইওয়ান প্রশ্নে কড়া বার্তা দেন। তিনি ট্রাম্পকে সতর্ক করেন, তাইওয়ান ইস্যু ভুলভাবে সামলানো হলে দুই দেশের মধ্যে সংঘাত বেঁধে যেতে পারে।
এতেই বোঝা যায়, চীন এখন অর্থনৈতিক আলোচনাকে নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক প্রশ্ন থেকে আলাদা করে দেখতে রাজি নয়।
চীন আরও বুঝতে পারছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থির। আগামী নির্বাচন, কংগ্রেসের চাপ এবং ট্রাম্প প্রশাসনের অনিশ্চিত নীতির কারণে বেইজিংও দীর্ঘমেয়াদি বড় প্রতিশ্রুতি দিতে গিয়ে সতর্ক থেকেছে।
সফরের কেন্দ্রবিন্দুতে ইরান যুদ্ধ
ট্রাম্পের সফরের আরেকটি বড় প্রেক্ষাপট ছিল ইরান সংকট। যুক্তরাষ্ট্র চাইছিল, চীন যেন তেহরানের ওপর প্রভাব খাটিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করতে সাহায্য করে।
কিন্তু বিশ্লেষকেরা বলছেন, চীন এ ক্ষেত্রে খুব সীমিত সহযোগিতা করতে চায়। কারণ ইরান মধ্যপ্রাচ্যে বেইজিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। চীন একদিকে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা চায়, অন্যদিকে তারা ইরানের সঙ্গে সম্পর্কও নষ্ট করতে চায় না। ফলে ইরান প্রশ্নেও এই সফর থেকে নাটকীয় কোনো অগ্রগতি আসেনি।

প্রতীকী কূটনীতি বেশি, বাস্তব অগ্রগতি কম
সফরের পুরো আয়োজন ছিল অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ। বেইজিংয়ে রাষ্ট্রীয় ভোজ, ঐতিহ্যবাহী আতিথেয়তা, লাল গালিচা, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা—সবকিছু দিয়ে চীন একটি ইতিবাচক পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করেছে। এমনকি ট্রাম্পের পছন্দ বিবেচনায় রেখে খাবারের মেন্যুও সাজানো হয়েছিল।
কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, এগুলো মূলত ‘সিম্বলিক ডিপ্লোম্যাসি’ বা প্রতীকী কূটনীতি।
বাস্তবে যেসব বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে গভীর বিরোধ রয়েছে—যেমন: প্রযুক্তি রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, সেমিকন্ডাক্টর নিষেধাজ্ঞা, তাইওয়ানে অস্ত্র বিক্রি, দক্ষিণ চীন সাগরে সামরিক উপস্থিতি—সেগুলোতে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।
বরং সফরের শেষে যে বিষয়টি সবচেয়ে স্পষ্ট হয়েছে, তা হলো—ওয়াশিংটন ও বেইজিং এখন সম্পর্ক ‘ম্যানেজ’ করতে চাইছে, কিন্তু ‘সমাধান’ করতে পারছে না।

তাহলে সফরের অর্জন কী?
তবুও ট্রাম্পের এই সফরকে পুরোপুরি ব্যর্থ বলা যাচ্ছে না। কয়েকটি ক্ষেত্রে সফরটি ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছে।
প্রথমত, দুই দেশ অন্তত সরাসরি সংলাপ চালিয়ে যেতে রাজি হয়েছে। দ্বিতীয়ত, বাণিজ্যযুদ্ধ আরও বড় সংঘাতে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি আপাতত কমেছে। তৃতীয়ত, ব্যবসায়ী মহলে একটি বার্তা গেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন পুরোপুরি অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতার পথে যাচ্ছে না।
এ ছাড়া, সম্ভাব্য জ্বালানি আমদানি, বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ ক্রয় এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ ফোরাম গঠনের আলোচনা ভবিষ্যতের জন্য একটি ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
‘যত গর্জে তত বর্ষে না’
সবকিছু মিলিয়ে বলা যায়, ট্রাম্পের চীন সফর প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম ফল দিয়েছে। সফরের আগে যে ধরনের বড় অর্থনৈতিক সমঝোতা, বাজার উন্মুক্তকরণ বা কৌশলগত পুনর্মিলনের আলোচনা চলছিল, বাস্তবে তার খুব অল্পই দৃশ্যমান হয়েছে।
বরং এই সফর দেখিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্ক এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে বড় করপোরেট প্রতিনিধিদল, জাঁকজমকপূর্ণ রাষ্ট্রীয় আয়োজন কিংবা ব্যক্তিগত কূটনৈতিক রসায়ন—কোনোটিই সহজে কাঠামোগত দ্বন্দ্ব দূর করতে পারছে না।
ফলে অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকের চোখে সফরটি শেষ পর্যন্ত আংশিক প্রতীকী সফলতা হলেও বাস্তব ফলাফলের বিচারে কিছুটা ‘যত গর্জে তত বর্ষে না’-এর মতোই হয়ে গেছে।
ডেইলি স্টার
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats