ইরানের রাজধানী তেহরানে গত ১০ দিনের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনী। সোমবার দিবাগত রাত থেকে শুরু হওয়া এই বোমাবর্ষণের তীব্রতা মঙ্গলবার রাতে আরো বেড়েছে বলে জানান তেহরানের বাসিন্দারা। প্রকম্পিত হয়ে উঠেছে পুরো শহর। তেহরানের বাসিন্দারা এ রাতটিকে যুদ্ধের শুরু থেকে এ পর্যন্ত 'সবচেয়ে ভয়াবহ রাত' হিসেবে বর্ণনা করেছেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, একের পর এক বিস্ফোরণে কেঁপে উঠছে ঘরবাড়ি, আর শহরের আকাশে নিচু দিয়ে উড়ে যাওয়া যুদ্ধবিমানের বিকট শব্দে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র। পূর্ব তেহরানের এক বাসিন্দা পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে বলেন, আকাশ থেকে বৃষ্টির মতো বোমা পড়ছে এবং চারদিকে আগুনের লেলিহান শিখা। অনেক নাগরিকের মতে, বর্তমান তেহরান যেন 'নরকদ্বারের শেষ প্রান্ত'। খবর দ্য গার্ডিয়ান।
ভয়াবহ এই হামলার মাঝে ওয়াশিংটন থেকে আসছে পরস্পরবিরোধী বার্তা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক সাক্ষাৎকারে যুদ্ধ 'প্রায় সমাপ্ত' বলে ইঙ্গিত দিলেও তার কয়েক ঘণ্টা পরেই ভিন্ন সুর শোনা গেছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী পিট হেগসেথের কণ্ঠে। হেগসেথ সতর্ক করে বলেছেন, শত্রুকে পুরোপুরি পরাজিত না করা পর্যন্ত হামলা থামবে না এবং মঙ্গলবার আরো তীব্র আক্রমণের পরিকল্পনা রয়েছে। এদিকে মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত ইরানের ৫ হাজারেরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে। এই অভিযানের মূল লক্ষ্য ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল ও ড্রোন সক্ষমতা ধ্বংস করা এবং হরমুজ প্রণালীকে পুনরায় উন্মুক্ত করতে ইরানি নৌবাহিনীকে দুর্বল করে দেয়া।
যুদ্ধের প্রভাব কেবল সামরিক স্থাপনাতেই সীমাবদ্ধ নেই; তেহরানে এখন আকাশ থেকে 'কালো বৃষ্টি' ঝরছে বলে খবর পাওয়া গেছে। তেল শোধনাগারগুলোয় হামলার ফলে সৃষ্ট ধোঁয়া ও রাসায়নিকের মিশ্রণে এই বিষাক্ত বৃষ্টি হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) নাগরিকদের ঘরের ভেতরে থাকার পরামর্শ দিয়েছে, কারণ এই বৃষ্টি ও দূষিত বাতাস শ্বাসকষ্টসহ গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। শহরের অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়েছে। পরিস্থিতির ভয়াবহতায় বহু মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামের দিকে পালানোর চেষ্টা করছেন। তবে বয়স্ক ও শারীরিকভাবে অক্ষম ব্যক্তিরা চরম ঝুঁকির মধ্যে আটকা পড়ে আছেন।
এদিকে ইরানও দমে না যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান আলী লারিজানি যুক্তরাষ্ট্রের হুমকিকে 'ফাঁকা বুলি' হিসেবে অভিহিত করে পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। ইরান তার রণকৌশল হিসেবে উপসাগরীয় দেশগুলো এবং ইসরায়েলের ওপর হামলা অব্যাহত রেখেছে, যাতে বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করে যুদ্ধের চড়া মূল্য আদায় করা যায়। এরইমধ্যে বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইরানি ড্রোন ও মিসাইল হামলায় হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। এই উত্তেজনার ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছে, যা জাগিয়ে তুলছে ১৯৭০-এর দশকের মতো বড় ধরনের জ্বালানি সংকটের শঙ্কা।
এমন সংকটের মুখে ইরানের ভেতরেও অস্থিরতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। তবে যেকোনো ধরনের সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে কঠোর অবস্থান নিয়েছে দেশটির পুলিশ বাহিনী। পুলিশ প্রধান আহমদ-রেজা রাদান রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, এই মুহূর্তে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করলে তাদের 'শত্রু' হিসেবে গণ্য করা হবে এবং তাদের বিরুদ্ধে মরণঘাতী শক্তি প্রয়োগ করা হতে পারে। অন্যদিকে লেবাননেও ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত রয়েছে, যার ফলে দক্ষিণ বৈরুত ও সীমান্ত এলাকায় চরমে পৌঁছেছে মানবিক বিপর্যয়। সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্য এখন এক অনিয়ন্ত্রিত যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে।
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats