পেশাদার কূটনীতিকদের পাশ কাটিয়ে একের পর এক সেনা কর্মকর্তাদের নিয়োগের অঘোষিত প্রথায় চাপা অসন্তোষ # সরকারের পছন্দে নিয়োগ দেয়া হয় ভিন্ন পেশার লোকদেরও
রাষ্ট্রদূত পদে পেশাদার কূটনীতিকদের পাশ কাটিয়ে সামরিক কর্মকর্তাদের নিয়োগের প্রবণতা বৃদ্ধি নিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরে দীর্ঘদিন ধরেই চাপা অসন্তোষ বিরাজ করছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ প্রবণতা যেন এক ধরনের অঘোষিত প্রথায় পরিণত হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে কার্যত সেনাবাহিনীর ‘ডাম্পিং স্টেশন’-এ পরিণত করা হয়েছে—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই ঘুরপাক খাচ্ছে নানা মহলে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে অন্তত পাঁচজন জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তা বিদেশে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তারা ইথিওপিয়া, ইরাক, কুয়েত, লিবিয়া এবং ওমানে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনের প্রধান হিসেবে কর্মরত আছেন। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেয়ার দুই সপ্তাহের মাথায় গত ৪ মার্চ আবারও একজন লেফটেন্যান্ট জেনারেল এবং দুইজন মেজর জেনারেলকে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগের জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়। তারা হলেন, লে. জেনারেল এস এম কামরুল হাসান, মেজর জেনারেল মো. নাসিম পারভেজ এবং মেজর জেনারেলে মো. জাহাংগীর আলম। এর মধ্যে বিগত অন্তর্বর্ত্তীকালীন সরকারের সময়ে সেনাপ্রধানকে পাশ কাটিয়ে লে. জেনারেল এস এম কামরুল হাসান বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে কাজ করা নিয়ে সেনাবাহিনীর শীর্ষ মহলে অসন্তোষ ও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক ছিলো।
পররাষ্ট্র ক্যাডারের কর্মকর্তাদের একটি অংশের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে সরকার বা সামরিক নেতৃত্বের অনাগ্রহের কারণে কিছু জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তাকে বিদেশে রাষ্ট্রদূত হিসেবে পাঠানো হয়। এতে করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কার্যত একটি “ডাম্পিং গ্রাউন্ড”-এ পরিণত হচ্ছে—এমন মন্তব্যও করছেন কেউ কেউ, যদিও প্রকাশ্যে এ বিষয়ে কথা বলতে চান না অধিকাংশ কর্মকর্তা।
এই প্রক্রিয়াকে ঘিরে পররাষ্ট্র ক্যাডারের পেশাদার কূটনীতিকদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে কূটনৈতিক পেশায় কাজ করা এবং প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা অর্জন করার পরও অনেক কর্মকর্তা রাষ্ট্রদূত হিসেবে পদায়নের অপেক্ষায় রয়েছেন। কিন্তু তাদের পাশ কাটিয়ে সামরিক কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়া হলে পেশাদার কূটনীতিকদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয় এবং তাদের ক্যারিয়ার অগ্রগতির সুযোগ কমে যায়। তারা নিজেদের দক্ষতা ও যোগ্যতার প্রমাণ দেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন।
শুধু সেনাকর্মকর্তাই নয়, রাজনৈতিক কিংবা অরাজনৈতিক সব সরকারের আমলেই বিভিন্ন পেশা এবং অন্য ক্যাডারের সিনিয়র বা অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কিংবা রাজনীতিককে রাষ্ট্রদূত কিংবা বিদেশ মিশনে বিভিন্ন পদে নিয়োগের নজির রয়েছে। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নিয়েই গত সপ্তাহে ড. ইউনূস সরকারের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া ৪ রাষ্ট্রদূতকে প্রত্যাহার করেছে। এরআগে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরপর সেসময়ে চুক্তিভিত্তিক সকল নিয়োগ অন্তর্বর্ত্তী সরকার বাতিল করেছে।
অনেক নিয়োগের ক্ষেত্রে নানা অসামঞ্জস্যও হয়েছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত, পেশাদার কূটনীতিক তারেক মো. আরিফুল ইসলাম গতবছরের সেপ্টেম্বর থেকে দায়িত্ব পালন করছেন। ওয়াশিংটনে রাষ্ট্রদূত হয়েও তাকে ‘এ গ্রেড’ দেয়নি অন্তর্বর্ত্তী সরকার। অথচ ওয়াশিংটন ডিসি মিশনে মিনিস্টার (প্রেস) গোলাম মোর্তোজাকে সিনিয়র সচিব মর্যাদা দিয়ে দুই বছরের জন্য চুক্তিতে নিয়োগ দেয়া হয়। বাংলাদেশ সরকারের কাছে রাষ্ট্রদূতের মর্যাদা অতিরিক্ত সচিব, আর মিনিস্টার (প্রেস) এর মর্যাদা সিনিয়র সচিব। এই নিয়ে তখন কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা হয়। কিন্তু সরকার প্রধানের ইচ্ছার সঙ্গে কেউ দ্বিমত করার সুযোগ পাননি। অধ্যাপক ইউনূস সরকার ওয়াশিংটন ডিসি, লন্ডন এবং নয়াদিল্লীতে নিয়োগ দেয়া ৩ প্রেস মিনিস্টার এখনও বহাল আছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, কূটনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিশেষ ধরনের দক্ষতা, অভিজ্ঞতা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। এসব বিষয় বিবেচনায় না এনে অন্য পেশার কর্মকর্তাদের বেশি সংখ্যায় রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দিলে কূটনৈতিক ব্যবস্থার পেশাদারিত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিভিন্ন সময়ে অপেশাদার যাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়েছে, দৈনন্দিন কার্যক্রমের বাহিরে তারা দেশের জন্য কূটনৈতিক দক্ষতায় ভালো কিছু করার খুব একটা নজির নেই। তারা পুরস্কার হিসাবে পাওয়া দায়িত্ব এনজয় করে কাটিয়েছেন।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের অনেক দেশেই সীমিত পরিসরে রাজনৈতিক বা অ-কূটনৈতিক ব্যক্তিদের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু তা সাধারণত ব্যতিক্রম হিসেবেই থাকে এবং সংখ্যায় খুব বেশি হয় না।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, রাষ্ট্রদূত পদে নিয়োগে পেশাদার কূটনীতিকদের অগ্রাধিকার দেওয়াই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত চর্চা। তবে বাংলাদেশে বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক বিবেচনায় এ নিয়মে বিগ্ন হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রদূত পদে অ-কূটনৈতিক পটভূমির ব্যক্তিদের নিয়োগ সম্পূর্ণ অস্বাভাবিক নয়; বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই রাজনৈতিক নিয়োগের নজির রয়েছে। তবে সেটি সীমিত পর্যায়ে থাকাই যুক্তিযুক্ত। অতিরিক্ত মাত্রায় এ ধরনের নিয়োগ কূটনৈতিক পেশাজীবীদের মনোবল ও ক্যারিয়ার অগ্রগতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
কূটনৈতিক মহলের মতে, রাষ্ট্রের স্বার্থে একটি শক্তিশালী ও পেশাদার কূটনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে হলে রাষ্ট্রদূত নিয়োগে স্বচ্ছতা ও পেশাগত যোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা বিতর্কিত প্রথা থেকে বেরিয়ে আসার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর রাষ্ট্রদূত নিয়োগের ক্ষেত্রে পেশাদার কূটনীতিকদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে—এমন প্রত্যাশা রয়েছে সংশ্লিষ্ট মহলে। তবে এখনো সেই প্রত্যাশার বড় কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নে একটি শক্তিশালী ও পেশাদার কূটনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে হলে রাষ্ট্রদূত নিয়োগে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং পেশাগত যোগ্যতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে প্রয়োজন কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান সম্পন্ন এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগে পারদর্শী ব্যক্তিত্ব।
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats